অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে ব্লু ইকোনমি

সাগরের নিজস্ব কোন রং নেই। কখনও নীল কখনও কালো। গভীরেও বর্ণময় বৈচিত্র্য। ডুব দিলেই অন্য জগত। সীমাহীন সম্পদ। শুধু আবিষ্কারের অপেক্ষা। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে পাওয়া গেছে বিপুল ঐশ্বর্যের সন্ধান। যা দিয়ে পাল্টানো যাবে আমাদের সামগ্রীক অর্থনীতির চেহারা। খনিজ, জ্বালানি সম্পদ কি নেই সেখানে। বিপুল সম্পদের ভা-ার এই বঙ্গোপসাগর। সেটা নাগালে আনাটাই কাজ। এরই নাম ব্লু ইকোনমি বা নীল সমুদ্রের অর্থনীতি। এই ধারনার জনক প্রফেসর গুন্টার পাউলির মতে,‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট বা টেকসই উন্নয়ন অর্জনের কর্মপরিকল্পনাই ব্লু ইকোনমি।’

সমুদ্র বক্ষে রয়েছে ইউরোনিয়াম, থোরিয়াম, ১৩টি জায়গায় সোনার চেয়ে দামী বালি। যাতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমানাইট, জিরকন, ম্যাগনেটাইট। সমুদ্রের অগভীরে জমে ‘ক্লে’। যার পরিমাণ হিমালয়কেও হার মানায়। যা দিয়ে তৈরি হয় সিমেন্ট। এই ‘ক্লে‘ সরবরাহ করতে পারলে সিমেন্ট কারখানাগুলো হবে লাভবান। কাঁচামালের জন্য বসে থাকতে হবে না। এছাড়া তেল-গ্যাসের যে সন্ধান মিলেছে তা সঠিক প্রযুক্তি দিয়ে নিখুতভাবে তুলে আনা প্রয়োজন। বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এই বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছেন- ‘সমুদ্রে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন, আহরণ বিশাল কারিগরি বিষয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাজটা করা জরুরী। ঠিকমতো অনুসন্ধান, জরিপ চালাতে না পারলে জাতীয় সম্পদের অপচয় মাত্রা ছাড়াবে। ২০১৯-এর মধ্যেই সমুদ্র অর্থনীতিতে বিপ্লব আনতে হবে। দেরি হলে চলবে না। এটাও ঠিক, সমুদ্র সম্পদ পাতকুয়ার জল নয়। দড়িতে বালতি বেঁধে অবলীলায় টেনে তোলা যায় না। কেরামতির দরকার। বিশেষজ্ঞরা সেটা বোঝে। পাশের দেশ মিয়ানমার বঙ্গোপসাগরে বড় গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। গ্যাস তোলাও চলছে নির্বিঘেœ। মিয়ানমার পারলে বাংলাদেশ পারবে না কেন।’

বঙ্গোপসাগর নামটার সাথে জড়িয়ে আছে বঙ্গ। ইংরেজীতে বললে ‘বে অব বেক্সগল’। তথাপি বঙ্গোপসাগর শুধু বাঙালির নয়। তাই বঙ্গোপসাগরের সীমানা নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার এই তিন দেশের মধ্যে বিরোধ ছিল। ২০১২-তে মিয়ানমার, ২০১৪-তে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর ভাগাভাগি সমস্যা মিটেছে। বাংলাদেশের ভাগে যা পড়েছে তা বিশাল। ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। হাতে আছে ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অধিকার। চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল মহীসোপানের তলদেশে সব ধরনের প্রাণিজ, অপ্রাণিজ সম্পদের সার্বভৌম কর্তৃত্ব। এটা আদায় করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্পদশালী হয়েও কূপম-ূক হওয়াটা ভাল নয়। অনতিবিলম্বে তুলতে হবে এই অনাস্বাদিত ঐশ্বর্য। যা বদলে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি।

পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেল ক্ষেত্র থেকে। তাই সমুদ্র সম্পদ ব্যবহারে দক্ষ জনবল তৈরিতে সমুদ্র বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষাদান প্রয়োজন। আশার খবর হলো-ইতোমধ্যে সরকার এ বিষয়ে ঢাকা ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শিক্ষাদান চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে সুদক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নে সমুদ্র অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সমুদ্র সম্পদকে উন্নয়নের নিয়ামক হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এক্ষেত্রে তিনি যথাযথ পরিকল্পনা, উপযুক্ত জ্ঞান ও প্রযুক্তি ঘাটতির কথাও স্বীকার করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, ভূ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি সমুদ্রভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকা- আমাদের সামনে খুলে দিতে পারে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত। এক্ষেত্রে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সহায়তায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। চীন ও জাপান এরইমধ্যে ব্লু ইকোনমিতে বাংলাদেশকে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সমগ্র বিশ্বে ক্রমশ ব্লু ইকোনমি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। বিগত বছরগুলোতে ব্লু ইকোনমিকে কেন্দ্র করে কয়েকবার আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০১২ তে রিও+২০, সমুদ্রবিষয়ক এশিয়া সম্মেলন, ২০১৩ সালে বালিতে অনুষ্ঠিত খাদ্য নিরাপত্তা এবং ব্লু গ্রোথ ইত্যাদি সম্মেলনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট-বড় দেশও ব্লু ইকোনমি নির্ভর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করছে। ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির অধিকাংশই সমুদ্রনির্ভর। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হলে সমুদ্র থেকে আহরিত সম্পদের মূল্যমান জাতীয় বাজেটের দশগুণ হবে। অপরদিকে সমুদ্রসম্পদ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে অস্ট্রেলিয়া। দেশটি ২০২৫ সাল নাগাদ এই আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ১০০ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে দেশ সামুদ্রিক অর্থনীতিকে যত বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, সে দেশের অর্থনীতি তত বেশি সমৃদ্ধ হয়েছে। বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে সমুদ্র পরিবহনের মাধ্যমে। সামুদ্রিক মৎস্য রফতানি করে অর্জন করা হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি মানুষের জীবনযাত্রা মাছ চাষ ও বাণিজ্যিক পরিবহনের মতো সমুদ্র অর্থনীতির কার্যক্রমের উপর নির্ভরশীল। বার্ষিক ৭ শতাংশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। এমতাবস্থায় ব্লু ইকোনমি যথাযথ কাজে লাগাতে পারলে দেশের অর্থনীতি হবে আরও সমৃদ্ধ ও বেগবান।