‘গরিবের হাসপাতালে’ ৮০ কোটি টাকার কর্মযজ্ঞ

চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার অন্তত দেড় কোটি মানুষ সুলভে চিকিৎসা সেবার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি এই চিকিৎসাকেন্দ্রটিকে তাই অনেকে ‘গরিবের হাসপাতাল’ বলেও অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যা ও সংকটে জর্জরিত চমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষে প্রতিদিন এই বিপুল পরিমাণ রোগীর চাপ সামালানোটা বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছিল। সে কথা বিবেচনায় নিয়ে অবশেষে ‘গরিবের হাসপাতাল’টিকে স্বাবলম্বী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে হাসপাতালের অবকাঠামো এবং সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায়ও আমূল পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে চমেক হাসপাতালে শিগগির শুরু হচ্ছে ৮০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ।

নতুন উদ্যোগের আওতায় হাসপাতালের পুরনো ছয়তলা ভবনটি সংস্কারের পাশাপাশি এটিকে ১০ তলা পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে। বসানো হবে অত্যাধুনিক নতুন মেশিন ও ৫০ গ্যালন পানি ধারণ ক্ষমতার দুটি গভীর নলকূপ। হাসপাতালের সামনের রাস্তা প্রশস্ত করার পাশাপাশি নতুন করে নির্মাণ করা হবে নতুন প্রাচীর, বসবে নতুন গেট। নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে আনসার বাহিনীর ১৮ সদস্যকেও। এ উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে এসব উন্নয়নের পর এই হাসপাতালটিকে আরও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলার ভাবনা রয়েছে সরকারের। এরই মধ্যে ৮০ কোটি টাকার বাজেটের প্রথম বরাদ্দ এসে পেঁৗছেছে হাসপাতালে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সমকালকে বলেন, ‘চমেক হাসপাতালে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন সমস্যা নিরসনে ৮০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এ বরাদ্দ দিয়ে হাসপাতালটি সম্প্রসারণ করাসহ সার্বিক কাজগুলো সম্পন্ন করা হবে। চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে যা করতে হবে তার সবটুকুই বর্তমান সরকার করছে। এরই মধ্যে এ হাসপাতালে ৩৭৮ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৪০ হাজার কর্মচারী নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছি আমরা। এর একটি অংশ এ হাসপাতালে দেওয়া হবে। পুরো হাসপাতালটি ঘিরে নানা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে চমেক হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন সমকালকে বলেন, ‘পুরনো চমেক হাসপাতালটি এ অঞ্চলের সিংহভাগ রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে যে সংখ্যক রোগী ভর্তি থাকে সে তুলনায় শয্যা নেই। যে কারণে প্রায়ই এখানে মেঝেতে শুয়ে অনেক কষ্ট করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয়। হাসপাতালটি এ অঞ্চলের চিকিৎসা সেবার চাহিদা পূরণ করলেও অনেক সংকট রয়েছে এখানে। এসব সংকট কমলে সেবার মান বাড়ার

পাশাপাশি আরও অনেক মানুষ এখান থেকে সেবা নিতে পারবে।’

হাসপাতালের দায়িত্বশীল একাধিক চিকিৎসক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত চমেক হাসপাতাল কাগজে-কলমে ১ হাজার ৩১৩ শয্যার হলেও এখানে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকে। চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলা ছাড়াও এ অঞ্চলের পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান, কক্সবাজারসহ আরও অনেক এলাকা থেকে রোগীরা, বিশেষ করে গরিব ও অসহায় রোগীরা চিকিৎসা নিতে ছুটে আসেন এখানে। যে কারণে দিনের ২৪ ঘণ্টাই সীমাহীন রোগীর চাপ লেগে থাকে পুরনো এ হাসপাতালটিতে। গত তিন বছরে চমেক হাসপাতালে সাড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভবন বর্ধিত করে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্ভিস সংযোগ সংস্কার-নতুন কেবল স্থাপন ও আন্ডারগ্রাউন্ডের পুরনো অকেজো ফিডার কেবল পরিবর্তন, ই ব্লক-আইসিইউ ও নিউনেটালে পুরনো ফিডার কেবল পরিবর্তন, সাবস্টেশন থেকে জি ব্লক পর্যন্ত কেবল পরিবর্তন ও পিএফআই পরিবর্তনসহ আনুষঙ্গিক কাজ, জেনারেল বাথরুম সংস্কার, জরুরি বিভাগ থেকে সিটি করপোরেশনের রাস্তা পর্যন্ত সম্প্রসারণ ও গেট সংস্কার, সিঁড়ি ও পার্কিং বারান্দা নির্মাণ, হাসপাতালের পূর্ব গেট অংশের রাস্তা সম্প্রসারণ, কেবিন মেরামত ও সংস্কার, স্টাফ কোয়ার্টার নবরূপে নির্মাণ-মেরামত ও ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, গভীর নলকূপ স্থাপনসহ সেবার মান বাড়াতে বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া অস্থায়ী বর্জ্য সংগ্রহশালাও মেরামত করা হবে।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল থেকে একজন রোগীও যাতে চিকিৎসা না নিয়ে ফেরত না যায় তার জন্য যা করার তা আমরা করছি।’

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন সমকালকে বলেন, ‘৮০ কোটি টাকার বরাদ্দ দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, উন্নত মেশিন স্থাপনসহ সামগ্রিক উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন করা হবে। এরই মধ্যে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ আমরা পেয়েছি। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হচ্ছে। হাসপাতালটির সার্বিক পরিবর্তনে মন্ত্রণালয় খুবই আন্তরিক।’

তিনি আরও জানান, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি চমেক হাসপাতালে ফেকো মেশিন, ম্যামোগ্রাফি মেশিন, ইটিটি মেশিন, ভিডিও ক্লনোসকপি, পোর্টেবল আল্ট্রাসনোগ্রাম, শ্যাডো ল্যাস ওটি লাইট, সেইলিং ওটি লাইট ডাবল এবং অটো নেবুলাইজার মেশিন বসানো হচ্ছে। এসব মেশিন খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পাঠানো হবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠির মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর জন্য সিএমএসডি নামক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। এসব মেশিন ছাড়াও অত্যাধুনিক রেডিওথেরাপি ও একটি অটো এনালাইজার মেশিন বসানো হবে। একটি অত্যাধুনিক এনজিওগ্রাম মেশিন এরই মধ্যে বসানো হয়ে গেছে। – See more at: http://bangla.samakal.net/2017/03/05/274737#sthash.nKRs8dxJ.dpuf