রাসায়নিক সার প্রয়োগের সাশ্রয়ী পদ্ধতি আবিষ্কার

জমিতে রাসায়নিক সার প্রয়োগে সাশ্রয়ী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন আজিজ কোম্পানি নামে খ্যাত ঘাটাইলের প্রত্যন্ত গ্রামের চাষি আ. আজিজ। তিনি এ পদ্ধতির নাম দিয়েছেন দ্রবণ পদ্ধতি। তার এই পদ্ধতি এলাকায় আজিজ ফর্মুলা নামে পরিচিত।
এ পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ইউরিয়া ও পটাশ সরাসরি ফসলে না ছিটিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে দ্রবণ তৈরি করে ফসলের পাতাতে সেপ্র করে ভিজিয়ে দিতে হয়। আ. আজিজের দাবি এ পদ্ধতিতে সত্তর শতাংশ ইউরিয়া ও পটাশ সার সাশ্রয় হবে এবং ফলনও বৃদ্ধি পাবে বিঘাপ্রতি ৩০ শতাংশ। তার ভাষ্যমতে এ পদ্ধতি প্রয়োগে যেমন রাসায়নিক সার সাশ্রয় হবে তেমনি বেচে যাবে কৃষকের খরচ। অপরদিকে ফসলে পোকার আক্রমণ কমে যাবে বিশেষ করে ধানের খোল পচা রোগসহ নানা রোগ। ফসলের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং বেঁচে যাবে আমাদের মাটি। আ. আজিজের বাড়ি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার প্রত্যন্ত শালিয়াবহ গ্রামে।
ঘাটাইল, মধুপুর, জামালপুর ও ফুলবাড়ীয়া উপজেলার প্রায় পাঁচ হাজার কৃষকের মাঝে ধান বীজতলায় তার ফর্মুলা প্রয়োগ করে ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন বলে জানান আ. আজিজ। তিনি বলেন, ফসলে প্রচলিত নিয়মে সার প্রয়োগ করলে প্রায় ৭৫ শতাংশ সার অপচয় হয়। আর তার ফর্মুলায় সার প্রয়োগ করলে মাত্র ১০ শতাংশ সার অপচয় হয়। এক কেজি ইউরিয়া আজিজ ফর্মুলায় প্রয়োগ করলে মাটিতে পাঁচ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগের সমান কাজ করে। তার এ ফর্মুলা সকল ধরনের ফসলে প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে দাবি করেন চাষি আব্দুল আজিজ। তিনি আরো জানান, কোন ধান বীজতলায় বীজ বপনের ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রথম বার ১৬ লিটার পানিতে ৭০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৩০০ গ্রাম পটাশ মিশিয়ে প্রতি ছয় শতাংশ জমিতে সেপ্র মেশিন দিয়ে ভিজিয়ে দিতে হবে। সাত দিন পর একই পরিমাণ ও নিয়মে ২য় বার প্রয়োগ করতে হবে। এতে ধান চারা সবল ও কুশি বেশি হবে। ইউরিয়া ও পটাশের দ্রবণ কীটপতঙ্গ ও ছত্রাক নাশকে ভূমিকা রাখে। ধান ও গম চাষে রোপণ ও বপনের ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতি ১৬ লিটার পানিতে এক কেজি ইউরিয়া ও ৫০০ গ্রাম পটাশ প্রতি বিঘাতে ৪ মেশিন দ্রবণ সেপ্র করতে হবে। ২য় ডোজ ১৫ দিন পর এবং ৩য় ডোজ ধান শীষ বের হবার ১০ দিন আগে প্রয়োগ করতে হবে। চাষা আজিজ বলেন, এতে ধানের খোলপচা রোগ কমে যাবে এবং পোকার আক্রমণও কম হবে। ফলন বাড়বে ৩০ শতাংশ সারও সাশ্রয় হবে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সার সংকট মোকাবিলায় এ পদ্ধতি ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। আনারস চাষে চারা রোপণের দু’মাস পর ১৬ লিটার পানিতে এক কেজি ইউরিয়া ও ৪০০ গ্রাম পটাশ দ্রবণ ৩০০ থেকে ৪০০ গাছের শুধু পাতা ভেজাতে হবে। এভাবে তিন মাস পর পর চলবে। কলা চাষে রোপণের দুই মাস পর থেকে ১৬ লিটার পানিতে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম পটাশ দ্রবণ সেপ্র করে পাতা, গাছ ও গোড়াসহ ভিজাতে হবে। আদা হলুদ চাষে, রোপণের দু’মাস পর থেকে ১৬ লিটার পানিতে ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ১০০ গ্রাম পটাশ এক মাস পর পর চলবে। ভুট্টা ও ইক্ষু চাষে রোপলের ৪৫ দিন পর থেকে ১৬ লিটার পানিতে ৮০০ গ্রাম ইউরিয়া ৪০০ গ্রাম পটাশ। আলু চাষে, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ২০০ গ্রাম পটাশ রোপণের এক মাস পর থেকে ২ থেকে ৩ বার। চা চাষে দেড় মাস অন্তর ২০০ গ্রাম ইউরিয়া ১০০ গ্রাম পটাশ প্রয়োগে লাল মাকড় দমন হবে।
আজিজ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি নিশ্চিত যে হারে মাটিতে রাসায়নিক প্রয়োগ হচ্ছে তাতে খুব অল্প সময়ে আমাদের কৃষিজমি পাথরে পরিণত হবে। এ থেকে মাটিকে বাঁচানোর এটাই একমাত্র পদ্ধতি। শালিয়াবহ গ্রামের কৃষক মো. রুহুল আমীন বলেন, আমার আনারস বাগানে এ ফর্মুলা প্রয়োগ করেছি এতে লাভবান হচ্ছি। মুরাইদ গ্রামের সফল চাষি মো. ছাইদুর রহমান বলেন, আমি এবার বীজতলায় আজিজের ফর্মুলা প্রয়োগে সফলতা পেয়েছি। মহিষমারা গ্রামের চাষি সিরাজুল ইসলাম, আবদুল বারেক, আউশনারার আবুল হোসেন, জলছত্র গ্রামের আরফান আলী, মুরাইদ গ্রামের আরফান আলী তরফদার এরা সকলেই দীর্ঘদিন ধরে এ ফর্মুলায় কৃষি করছি সঙ্গে সঙ্গে অন্যকেও এ ফর্মুলায় কৃষি করার জন্য আহ্বান করছি। কৃষি অধিদপ্তর টাঙ্গাইলের ডিডি মো. আবুল হাসিম বলেন, চাষি আজিজের ইউরিয়া সার প্রয়োগের সাশ্রয়ী পদ্ধতির বিষয়টি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কিনা সে বিষয়ে গবেষণার প্রয়োজন।