প্রতিকূলতা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা …

‘ঘড়িতে সকাল ৯টা। আছমা, রাজিয়া, স্মৃতি, পলি ও মারুফা। পাঁচ বান্ধবী। গাঢ় আকাশি ও সাদা স্কুল ড্রেস পরে গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে আসছে। গন্তব্য তাদের বিদ্যালয়।’ প্রতিদিন শিবরামপুর উচ্চবিদ্যালয়ে মেয়েরা গ্রামের মেঠোপথ দিয়ে বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসে। স্কুল ছুটির পর মেয়েদের বাইসাইকেল চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে যে কেউ দেখলে মনে করবে সাইকেল র‌্যালি হচ্ছে। ১ থেকে সাড়ে ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এসব মেয়ে প্রতিদিন বাইসাইকেলে করে স্কুলে আসে। গ্রামের সড়কগুলো মাটির হওয়ায় বৃষ্টি হলে কিছুটা সমস্যা হয়। সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে ওরা। একদিন ওরাই করবে জয়।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ ইউনিয়নের একটি গ্রাম শিবরামপুর। ১৯৬৭ সালে গ্রামের নামানুসারে স্থাপিত হয় শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭ শতাধিক। তার মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থী ৩ শতাধিকের ওপরে। বিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি মেয়েই এখন বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসে।
২০০৬ সালে শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী দীপা দেবনাথ প্রথম বাইসাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করে। দীপার দেখাদেখি ওর ৪/৫ জন বান্ধবীও সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করে। পরবর্তীতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকরা অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন এ বিদ্যালয়ে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসবে। কোনো কোনো অভিভাবক প্রথমে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কিছুটা লজ্জা পাচ্ছিল মেয়রাও। প্রথম প্রথম মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসার পথে অনেক ছেলে হাসি ঠাট্টা করত। বখাটে ছেলেদের হাসিঠাট্টা ও টিটকারী উপেক্ষা করে সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসা অব্যাহত রাখে মেয়েরা।
বাইসাইকেলে স্কুলে আসার অনেকটা সুফল পায় শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা। যেমন একদিকে মেয়েরা সময় মতো স্কুলে যাওয়া আসা করতে পারে, অপরদিকে যানবাহনের জন্য রাস্তাঘাটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। এখন শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে মেয়েরা ভর্তি হলেই অভিভাবকরা তাদেরকে বাইসাইকেল কিনে দেন যাতায়াতের জন্য।
শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে মেয়েদের সাইকেলে করে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা দেখে এখন আশপাশের স্কুলের মেয়েরাও তাদেরকে অনুসরণ করছে। শিক্ষার দিক থেকেও এ বিদ্যালয়টি উপজেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেকটা এগিয়ে। সারাদেশে শ্রেষ্ঠ স্কুল নির্বাচিত হয়ে ২০০৪ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ স্কুলের সম্মাননা ক্রেস্ট গ্রহণ করেন প্রধান শিক্ষক। বিদ্যালয়টির অসংখ্য শিক্ষার্থী বর্তমানে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করছেন।
সহকারী শিক্ষক জীবন আনন্দ দেবনাথ বলেন, প্রায় দশ বছর ধরে এ বিদ্যালয়ের মেয়েরা বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাওয়া আসা করে। প্রথম প্রথম এলাকার বখাটে ছেলেরা রাস্তাঘাটে মেয়েদের সাইকেল চালাতে দেখে হাসিঠাট্টাসহ উত্ত্যক্ত করত। বিষয়গুলো শিক্ষকরা অভিভাবকদের নিয়ে প্রতিবাদ করায় আস্তে আস্তে এসব বন্ধ হয়ে গেছে।
শিবরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী দীপা দেবনাথ বলেন, ২০০৬ সালে প্রথম আমি বাইসাইকেলে করে স্কুলে যাওয়া আসা শুরু করি। বাইসাইকেলে স্কুলে যাওয়া-আসা নিয়ে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে আমাকে। এখন প্রায় সব মেয়েই সাইকেল নিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করে তা দেখে অনেক ভালো লাগে।
সহকারী প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একজন মেয়ে যখন সাইকেলে করে স্কুলে যাতায়াত করে তখন তার মধ্যে কোনো জড়তা থাকে না। প্রতিদিন ২ শতাধিক মেয়ে সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করে।