বহুজাতিকের চেয়ে এগিয়ে দেশীরা

বড় হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এতে মূল ভূমিকা রাখছে শিল্প ও সেবা খাত। আর যাদের ওপর ভর করে খাত দুটি বড় হচ্ছে, সেই শ্রমিকদের ৯০ শতাংশের নিয়োগই এখনো অপ্রাতিষ্ঠানিক। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সেভাবে হচ্ছে না। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় সীমিত পরিসরে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান হলেও পিছিয়ে আছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। যদিও দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বহুজাতিক এসব কোম্পানির ব্যবসা ও মুনাফা বাড়ছে প্রতি বছরই।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে কর্মসংস্থান খুব একটা বাড়েনি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী শীর্ষ বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর। বরং কোনো কোনো কোম্পানির স্থায়ী কর্মীসংখ্যা কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোন ও লিন্ডে বিডি। সিঙ্গার, বার্জার পেইন্টস, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি), বাটা সু ও গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কর্মসংস্থান বাড়লেও তা সীমিত। অন্যদিকে ব্যবসার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। এসিআই, স্কয়ার ফার্মা, সামিট, কোহিনুর কেমিক্যালসের মতো কোম্পানিগুলোয় পাঁচ বছরের ব্যবধানে স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণে উন্নীত হয়েছে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর্মসংস্থান না বাড়ার কারণ হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধিকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক। এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আমি মনে করি, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কর্মসংস্থান খুব বেশি না বাড়ার অন্যতম কারণ তাদের অটোমেশন। ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনায় ঝোঁকার কারণে জনবল ব্যবহার কমেছে।
দেশের শেয়ারবাজারে তলিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর অন্যতম গ্রামীণফোন। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির ব্যবসা উল্লেখযোগ্য বাড়লেও কমছে স্থায়ী কর্মী সংখ্যা। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির ৩ হাজার ৮৮৭ জন স্থায়ী কর্মী থাকলেও ২০১৫ সাল শেষে তা ৩ হাজার দুজনে নেমে এসেছে। যদিও কোম্পানিটির বার্ষিক টার্নওভার ১১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মূলত তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির কারণে কোম্পানির জনবল কমেছে বলে দাবি সেলফোন অপারেটরটির।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জ্বালানি খাতের অন্যতম শীর্ষ কোম্পানি জার্মানিভিত্তিক লিন্ডে বিডি। গত পাঁচ বছরে দেশে কোম্পানিটির ব্যবসা বেড়েছে ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর বিপরীতে কমেছে বাংলাদেশে স্থায়ী কর্মী সংখ্যা। ২০১১ সালে লিন্ডে বিডির ৩৯৪ জন স্থায়ী কর্মী থাকলেও ২০১৫ সাল শেষে তা নেমে এসেছে ৩১৫ জনে।
তালিকাভুক্ত অন্য বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিএটিবিসির গত পাঁচ বছরে কর্মী সংখ্যা বেড়েছে ২৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কোম্পানিটিতে ২০১১ সালে স্থায়ী কর্মী ১ হাজার ১৪৬ থেকে ২০১৬ সাল শেষে ১ হাজার ৪৭০ জনে উন্নীত হয়েছে। যদিও এ সময়ে তামাক চাষ বৃদ্ধি ও বনায়নকাজে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক বা কর্মসংস্থান বেড়েছে বলে দাবি কোম্পানিটির।
দেশে পেইন্টসের বাজারে নেতৃত্বে রয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস। পাঁচ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের বাজারে কোম্পানিটির ব্যবসা শতভাগের বেশি বাড়লেও কর্মসংস্থান বেড়েছে মাত্র ৩৭ শতাংশ। ২০১১ সালে বার্জারের টার্নওভার ছিল ৬৩২ কোটি টাকা। পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা ১ হাজার ২২৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে এ সময়ে স্থায়ী কর্মী সংখ্যা ৪০৫ থেকে ৫৫৮তে উন্নীত করেছে কোম্পানিটি।
জানতে চাইলে বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফরেন ইনভেস্টর্স চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থানের যে তথ্য দেয়া হয়, সেগুলো সাধারণত স্থায়ী কর্মীর। এর বাইরে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানেরই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ থাকে। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এক প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠানের সেবা কিনে নেয়ার কারণেও স্থায়ী কর্মী সংখ্যা কমছে।
তালিকাভুক্ত অন্য বহুজাতিক কোম্পানির মধ্যে আরএকে সিরামিকস, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, বাটা সু ও গ্ল্যাক্সোস্মিথক্লাইনের কর্মসংস্থান খুব একটা বাড়েনি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে সিঙ্গারে কর্মসংস্থান বেড়েছে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর তুলনায় বেশি ভূমিকা রাখছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় অবদান রাখা দেশীয় কোম্পানিগুলোর একটি এসিআই লিমিটেড। গত পাঁচ বছরে কোম্পানিটির স্থায়ী কর্মী বেড়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির ২০১১ সালে ৪ হাজার ১৪ জন স্থায়ী কর্মী থাকলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ২৭৫ জনে। নতুন নতুন সাবসিডিয়ারি ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থায়ী কর্মীর বাইরে অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকের সংখ্যাও কয়েক গুণ বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এসিআই লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (এগ্রিবিজনেস) ড. ফা হ আনসারী বলেন, এসিআইয়ের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের জীবনমানের উন্নয়নসাধন। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি নতুন পণ্য উত্পাদনের পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বর্তমানে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে প্রায় ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে কর্মসংস্থান দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।
গত পাঁচ বছরে দেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখছে স্কয়ার ফার্মাও। ২০১১ সালে কোম্পানিটির স্থায়ী কর্মী ছিল ৪ হাজার ৬৪১ জন। ২০১৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ কোম্পানির স্থায়ী কর্মীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১৪৪। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আরেক দেশীয় কোম্পানি বেক্সিমকো ফার্মায় পাঁচ বছরে স্থায়ী কর্মসংস্থান ২ হাজার ৬৭০ থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৫১৫ জনে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে কোহিনুর কেমিক্যালসে স্থায়ী কর্মী ১ হাজার ৩৫৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৯০২ জন। এছাড়া সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টে ২০১১ সালে ৩৪১ জন স্থায়ী কর্মী থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে হয়েছে ৭৯৮ জন। ইস্পাত খাতের প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম লিমিটেড পাঁচ বছরে স্থায়ী কর্মী ৬৬৯ থেকে বাড়িয়ে ৮১৬ জনে উন্নীত করেছে। তালিকাভুক্ত অন্য দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত এপেক্স সুজের স্থায়ী কর্মী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫২১, ওরিয়নের ২ হাজার ২২৩, একমি ল্যাবরেটরিজের ৭ হাজার ৬৭৪, আরএসআরএমের ৫০৬ ও সামিট পাওয়ারের ২৮৯।