শেখ হাসিনা ॥ শিক্ষানীতি শিক্ষা আইন ও বাস্তবায়ন

সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অর্থাৎ স্থায়িত্বশীল কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ধারা ৪-এর ভাবান্তর করলে দাঁড়ায় ‘অন্তর্ভুক্তিকরণ ও সমতাবিধানপূর্বক মানসম্পন্ন শিক্ষা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিতকরণ।’ বাংলাদেশ বর্তমানে দেশরত্ন ও জননেত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্তে এগিয়ে চলেছে। শেখ হাসিনার মতো প্রাজ্ঞ ও মহীয়সী নারী জানেন যে, এগিয়ে যাওয়ার পথে শিক্ষার বিস্তার হলেই হবে না, বরং মান উন্নত করতে হবে। শিক্ষানীতি-২০১০ প্রণয়ন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অসাম্প্রদায়িক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নির্ভর শিক্ষানীতি-২০১০ এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সহায়তা করবে বলে ধারণা। তবে শিক্ষানীতির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিবহাল। শিক্ষা সম্প্রসারণে শেখ হাসিনার যে জীবনদর্শন তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন ঘটছে। সমগ্র দেশে শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটছে। বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে বই বিতরণের ব্যবস্থা, বৃত্তি-উপবৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পাশাপাশি স্কুলগামী শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে আনয়ন, মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরাহ, শ্রেণীকক্ষসমূহে মাল্টিমিডিয়া সংযোগ প্রদান ইত্যাদির ব্যাপারে সরকারপ্রধানের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতির কারণে বেশ প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শিক্ষানীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব সময় যে সহযোগী ব্যবস্থাপনা করেছে, তা নয়। আর তাই পঞ্চম ও অষ্টম উভয় শ্রেণীতে পাবলিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে। এটি নিতান্তই দুভার্গ্যরে বিষয়। এমন সমস্ত বইয়ের বোঝা রচনা করেছেন শিক্ষাবিদরা যাতে গৃহ শিক্ষক, কোচিং ব্যবস্থা বন্ধ না হয়ে বেড়ে যায়। এটি আসলে প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকা-কে কিছুটা হলে বাধা সঞ্চারে ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাক্তন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আলাউদ্দীন অনেক বেশি মাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সচেষ্ট ছিলেন। এটি দেশ, জাতির জন্য মঙ্গলজনক ছিল। তারপরও প্রধানমন্ত্রী স্বীয় মেধা, প্রজ্ঞা, বিবেচনাগুণে দেশের শিক্ষা সম্প্রসারণ, সময়মতো বই পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি শিক্ষকদের মর্যাদা, বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে কাজ করে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ তৎপরতা দেশে মানসম্পন্ন শিক্ষার সম্প্রসারণে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে শিক্ষা আইনের প্রয়োজন রয়েছে। অথচ আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে শিক্ষা আইন-২০১৬ করা যায়নি। অচিরেই সমাধান হবে বলে বিশ্বাস করি।

একটি উদাহরণ দিচ্ছি। শিক্ষানীতিতে যেখানে আছে মহীয়সী নারীদের জীবনী পড়ানোর কথা, সেখানে ড্রাফট আইনে পুরুষদের জীবনীর কথা বলা হয়েছিল। এ ধরনের বিভ্রান্তি যারা করেন তারা জেনে-শুনে জামায়াত-বিএনপির কথায় করেন। শিক্ষা আইন প্রণয়ন করার সময় শিক্ষানীতি অবলম্বন করতে হবে। প্রতিবন্ধী শিশুরা স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিবন্ধী যুবকে রূপান্তরিত হবে। এ যুবক-যুবতীদের জন্য উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে। আমার মনে পড়ে, যখন আমি ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউসির পরিচালক ছিলাম, পঞ্চাশজনের ওপর শিক্ষক-শিক্ষিকাকে হাতে-কলমে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, সে সম্পর্কে ধারণা ও প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর কন্যা যে মহান ব্রত নিয়ে দেশের মঙ্গলের জন্য সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নিরলস কর্মকা- চালাচ্ছেন, আমরা সবাই যদি আমাদের স্ব-স্ব অবস্থানে থেকে কাজ করতাম, মানুষের জন্য মঙ্গল যাচনা করতাম, আখেরে তবে দেশের লাভ হতো। শিক্ষার্থীদের পরিবার, সমাজ ও দেশের প্রতি কর্তব্যবোধ জাগ্রত করা দরকার। সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করতে হবে, জনগণকে ভালবাসতে হবে এবং জঙ্গীবাদকে না বলতে হবে, যাতে দেশের মানসম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ‘ই-৯ মন্ত্রী পর্যায়ের শিক্ষা সংক্রান্ত বৈঠক-২০৩০’ উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেছেন যে, এসডিজি-৪-এর মূল লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিকরণ, মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। তিনি বৈশ্বিক পরিম-লের পর্যালোচনা করে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশসহ নয়টি দেশের শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকরা ‘এসডিজি-৪-এডুকেশন ২০৩০’ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নিজ নিজ দেশের আকাক্সক্ষা ও অঙ্গীকার প্রাধিকারের বিষয়ে আলোচনাপূর্বক প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা প্রণয়ন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যম-িত। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে সম্মিলিত সহযোগিতার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর এ উচ্চারণ আসলে শিক্ষার মান উন্নতকরণের প্রয়াস বললে অত্যুক্তি হবে না। ই-৯-এর এ বৈঠকে বাংলাদেশ ছাড়াও ব্রাজিল, চীন, মিসর, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, নাইজিরিয়া এবং পাকিস্তানসহ ইউনেস্কোর তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়। এ নয়টি দেশে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেক বাস করে, দু-তৃতীয়াংশ হচ্ছে বিশ্বের পূর্ণবয়স্ক অশিক্ষিত এবং অর্ধেক হচ্ছে যারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। অথচ সে তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভাল। বাংলাদেশে স্কুলে ড্রপ আউট প্রায় শূন্যের কোটায়। আবার ছেলেমেয়েদের স্কুলে পড়ার ক্ষেত্রে সমতাও ফিরে আসছে।

প্রফেসর ফেড্রিক হারবিসন মন্তব্য করেন যে, মানবসম্পদ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সম্পদে পরিণত হয়। পুঁজি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে পেসিভ উপাদান যেখানে মানুষ তাদের প্রয়োজন অনুসারে পুঁজি সংস্থান করে, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন করে, সামাজিক, অর্থনীতি, রাজনৈতিক সংস্থা তৈরি করে এবং জাতীয় উন্নয়নকে এগিয়ে নেয়। তিনি আরও মনে করেন যে, জ্ঞান এবং প্রাজ্ঞ যে রাষ্ট্রব্যবস্থা দেশের মানুষের মধ্যে গড়ে দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র অনুন্নয়নের দুষ্টুচক্রে আবদ্ধ থাকে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার উন্নয়নকে সরকার প্রাধান্য দিচ্ছে।

বস্তুত দেশের উন্নয়নের জন্য সরকারপ্রধানের ইচ্ছায় একটি কার্যকর শিক্ষানীতি-২০১০ সালে প্রণীত হয়। এটিকে বাস্তবের আলোয় বাস্তবায়নের জন্য একটি খসড়া আইন-২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু খসড়া আইনে প্রশ্নপত্র সাজার ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। যে সমস্ত শিক্ষাবিদ পাঠ্যবইয়ে ছাত্রছাত্রীদের হয়রানিমূলক পাঠ ও পঠনের ব্যবস্থা করেছেন, যারা বয়স বিবেচনায় না নিয়ে প-িতমন্য হিসেবে কাজ করছেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধ চেতনাকে ধূলিসাত করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার কথা নেই। প্রথিতযশা কবি-লেখক-কথাশিল্পীর লেখাকে অবমাননা করেছেন, ভুল হাদিসের সৃষ্টি করেছেন, নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য ভরে দিতে চেয়েছেন, এমনকি জাতির পিতার প্রতি অবমাননা করেছেন, সর্বোপরি সরকারের নির্দেশিত পথ থেকে সরে গেছেন, ভুলÑভাল প্রিন্ট করেছেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকা উচিত ছিল। গৃহশিক্ষকতা ও কোচিং বন্ধ করতে হলে অবশ্যই পড়াশোনার জন্য পাঠ্যপুস্তককে সহজপাঠ্য ও সাবলীল করা দরকার।

খসড়া আইন-২০১৬ অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রতিবন্ধী এবং যারা পারেন না সে সমস্ত ছেলেমেয়েকে ভর্তির কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের পরীক্ষা কিভাবে গ্রহণ করা হবে সে সম্পর্কে আইনে একটি ব্যাখ্যা থাকলে ভাল হতো। আইনে হায়ার এডুকেশন কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। আসলে দেশে উন্নত একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার কোন কমতি নেই। কিন্তু গিরগিটির মতো রং পাল্টানো শিক্ষাবিদরা অনেক সময় সরকার সমর্থক সেজে একের পর এক অন্যায় করে চলেন। এদের চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা বাহিনী দরকার। দেশে বর্তমানে যেহেতু কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়, ইংরেজী মাধ্যমের স্কুল, মাদ্রাসা, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং পলিটেকনিকের কতিপয় ছাত্রছাত্রী কতিপয় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা ব্রেনওয়াশ হচ্ছে বলে জানা গেছে, সেজন্য ক্যাম্পাস পুলিশ ও গোয়েন্দা আলাদাভাবে তৈরি করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। এটি জঙ্গীবিরোধী তৎপরতায় সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সহায়ক হবে। যেভাবে বিএনপি-জামায়াত ও পঞ্চম স্তম্ভ সক্রিয় রয়েছে, তা দেশের বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্টে (অক্টোবর ১৩, ২০১৬) বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে, বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ে এবং মেয়েদের জন্য। রাষ্ট্রের ভর্তির ক্ষেত্রে যা ২০০০ সালে ছিল ৮০% প্রাথমিক পর্যায়ে, ২০১৫ তে তা ৯৮%-এ উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে একই সময়ে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪৫% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪% হয়েছে। আবার নারী-পুরুষ শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের পরিমাণ হচ্ছে ৮ কোটি ৮০ লাখ, যার মধ্যে মাত্র ৪% মাধ্যমিকের গ-ি পেরিয়েছে। একই রিপোর্টে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক এন্টারপ্রাইজ স্কিল সার্ভের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে যে, যারা চাকরি দেবেন তারা মনে করেন যে, এদেশের উচ্চশিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত নয়। যা চাকরি প্রার্থীদের বর্তমান ও ভবিষ্যত কর্মকা- পরিচালনায় সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না বলে তারা অভিমত ব্যক্ত করেন। নোংরা শিক্ষক রাজনীতির উদাহরণ হচ্ছে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্রকে ইংরেজী বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিলে কতিপয় বিপথগামী ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক আন্দোলন করে। আসলে যে কোন স্থান থেকেই পাস করুক, প্রাইভেট হোক পাবলিক হোক, যোগ্যতা থাকলে নিয়োগ পাওয়া উচিত। বাস্তব উদাহরণ দেই, পাবনা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.৮৫ পাওয়া বিবিএ ছাত্রকে আইকিউসির এ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দিতে পারিনি। কেননা বেসিক এ্যাকাউন্টিং সম্পর্কে তার কোন ধারণা ছিল না। ছাত্রের মান ভাল হওয়া উচিত।

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১ম থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নতি লাভ করার পাশাপাশি গুণগত মানসম্পন্ন এবং বয়স অনুপাতে বই প্রকাশের ব্যবস্থা করবে। নচেত শিক্ষা হয়ে যাবে বোঝাস্বরূপ। পাশাপাশি যারা এ্যালামনাই তাদের উচিত স্বস্কুলের উন্নয়নকল্পে নিঃস্বার্থভাবে সহায়তা করা। মাদ্রাসা শিক্ষাকে কর্মমুখী করতে হবে। নচেত এ বিশাল ছাত্রছাত্রীরা পাস অন্তে সমাজ-পরিবারের বোঝা হয়ে পড়বে।

এদিকে সরকার অত্যন্ত ভাল কাজ করেছে কারিগরি শিক্ষাকে আলাদা মন্ত্রণালয়ে পরিণত করে। এক্ষণে একজন উপযুক্ত মন্ত্রীর নেতৃত্বে কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে। নচেত এ শিক্ষাও কোন কাজে আসবে না। বরং বিদেশ থেকে লোক এনে আমাদের বিভিন্ন শিল্প-কারখানার কারিগরি দিক বর্তমানের মতো ভবিষ্যতেও সামলাতে হবে। মাঝখান থেকে প্রচুর পরিমাণে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাবে। এদিকে হাতেগোনা কয়েকটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় বাদে অধিকাংশের মান সরকারী এবং ইউজিসির শত চেষ্টা সত্ত্বেও উন্নত করা যাচ্ছে না। কোন কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচ্ছে-তাই। টাকা কামানোই একমাত্র ধান্ধা। অন্যদিকে সকল সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মানও যে ভাল, তা নয়। আসলে উপযুক্ত শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি এবং স্বজনপ্রীতি খুবই দুঃখজনক। শিক্ষক হবেন সত্যের পূজারী। কিন্তু তাদের একাংশ যখন দলবাজিতে নামেন, তখন খারাপ লাগে। সম্প্রতি রুয়েটের উপাচার্যকে কিছু ছাত্র নামধারী গু-া যেভাবে অবরুদ্ধ করে রাখল, সেটি খুবই দুঃখজনক। সরকারের সদিচ্ছাকে তারা মিথ্যার আবরণে ঢেকে দিতে চেয়েছিল। সরকার বর্তমানে স্নাতক পর্যায়ে বাংলাদেশ স্টাডিজ পাঠ্য করেছে সেক্ষেত্রে মোবাশ্বের আলী প্রণীত ‘বাংলাদেশের সন্ধানে’ বইটি পাঠ্য করা যেতে পারে।

শেখ হাসিনা যুগোপযোগী কর্মমুখী শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাঁর এ সাধু উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তিনি বিমস্টেকের সহায়তা নিতে পারেন। দেশে যেমন একটি এ্যাক্রিডিটেশান কাউন্সিল গড়ে উঠতে যাচ্ছে, তেমনি র‌্যাংকিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। ন্যাশনাল ফ্রেমওয়ার্ক অব কোয়ালিটি এডুকেশন তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত সকল রিসার্চ জার্নালের ইনডেক্সিং-এর ব্যবস্থা ইউজিসি গ্রহণ করতে পারে। ইউজিসির চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান একজন গুণী ব্যক্তি। ইউজিসি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং এবং ইনডেক্সিং-এর ব্যবস্থা করে তবে তার জন্য লোকবল ও অর্থের প্রয়োজন। সে বরাদ্দটুকু মনে হয় অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী বাজেটে দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাঠায় এতে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা বিস্তারে সহায়ক হবে। অন্যদিকে বিমস্টেকের আওতায় বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা উচিত। আসিয়ান যেভাবে শিক্ষা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, বিমস্টেকেরও সেভাবে কাজ করা দরকার। কেবল ফ্রি ট্রেড হলেই হবে না, গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকল্প নেই। আবার বিমস্টেকের আওতায় জার্নাল ইনডেক্সিং, কোয়ালিফেকশান ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি, র‌্যাংকিং ব্যবস্থা, এ্যাক্রিডিটেশান-রিজিওনাল পর্যায়ে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষানুরাগী শেখ হাসিনা শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মান বৃদ্ধিতে নিরলস প্রয়াস গ্রহণ করেছেন। এক্ষণে এটি বাস্তবায়ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। ড. গৌরাঙ্গ চন্দ্র মোহান্তের নেতৃত্বে হেকাপ অবশ্যই ভাল কাজ করে চলেছে। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কথা বলে এর মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বর্ধিত করা উচিত। কোয়ালিটি এস্যুরেন্স ইউনিটের আওতায় আইকিউসির কাজ ৫ম ও ৬ষ্ঠ রাউন্ডে বর্ধিতকরণ করা দরকার। এমটিসি গ্লোবাল, ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ভোলানাথ দত্তকে বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে কন্সালটেন্ট হিসেবে নিয়োগ করলে ভাল হয়। কেননা প্রফেসর ভোলানাথ দত্তের আদি বাড়ি ফরিদপুর এবং তিনি অত্যন্ত সাবলীলভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নে করণীয়, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, যুগোপযোগী প্রশিক্ষক তৈরি ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারে সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি। প্রফেসর নাথের দিকনির্দেশনা বাংলাদেশের শিক্ষার মান উন্নয়নে সহায়তা করবে। আশা করব, জননেত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নসমৃদ্ধ বাংলাদেশে ডিজিটাল প্রসার গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়বে, তাল মিলিয়ে ইনস্ট্রাকশন ম্যানুয়েল তৈরি হবে ও ই-লার্নিং এডুকেশান এবং ক্রস বোর্ডার এডুকেশানে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে। বস্তুত এসডিজি-৪ এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় কর্মমুখী শিক্ষার বিকল্প নেই।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ