নারীদের অবস্থা বদলে দিচ্ছে কমিউনিটি রেডিও

ভোলার চরফ্যাশনে স্থাপিত কমিউনিটি রেডিও মেঘনার প্রতিবেদক ও অনুষ্ঠান প্রযোজক জান্নাত বেগম। দলিত জনগোষ্ঠীর নারী হিসেবে একসময় সমাজে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হতেন। এমনকি রেডিওতে কাজ শুরু করার পরও সইতে হয়েছে নানান কটু কথা। তার ভাষায়- ‘আমার বাবা মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টয়লেট পরিষ্কার করেন। মা অন্যের বাড়িতে বুয়ার কাজ করেন। আমরা ৫ ভাই বোন। রাস্তার পাশে আমাদের আবাস। রেডিও মেঘনায় কাজের শুরুর দিকে আশপাশের অনেককে বলতে শুনেছি ‘সুইপারের বেটি আবার রেডিওতে কাজ করে!’ আবার কখনও মায়ের সঙ্গে প্রতিবেশী কোনো নারীর কথা কাটাকাটি হলে মাকে বলত- রাস্তার পাশে থাকিস আবার মেয়েকে রেডিওতে পাঠাস! কথাগুলো নীরবে প্রতিবাদহীনভাবে শুনতাম, ভাবতাম ওরা তো সত্যি কথাই বলছে।
কিন্তু সময় আর সুযোগ জান্নাতকে বদলে দিয়েছে। এক সময় যারা তাকে হেয় করে কথা বলত আজ তারাই রেডিওতে তার অনুষ্ঠান শোনার জন্য অপেক্ষা করে। জান্নাত বলেন- ‘রেডিওতে কাজ করার মাধ্যমে বাহ্যিকভাবে আমার পরিবর্তন হয়তো সামান্য তবে আমার মানসিকতার পরিবর্তন যে অশেষ সেটা আমি বুঝতে পারি। কেননা এখন আর আমি নিজের জš§ পরিচয় কিংবা বাবা-মায়ের কর্ম পরিচয় নিয়ে লজ্জিত নই। কিছুদিন আগের সেই মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়া জান্নাত আর আমি নই। এখন আমি মাথা উঁচু করে, আত্মবিশ্বাস নিয়ে পথ চলার প্রত্যয়ী জান্নাত’।
দেশে বর্তমানে চলমান ১৭টি কমিউনিটি রেডিওতে জান্নাতের মতো গ্রামীণ যুব নারী বিশেষ করে সমাজের দলিত শ্রেণী যেমন-মুচি, মেথর, ঋষি, নাপিত, সুইপার, জেলে, বেদে, রবিদাস, কারিকর, কলু এবং স্থানীয় নৃ-তাত্ত্বিক মুন্ডা, সাঁওতাল ও রাখাইন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের যুব নারীরা পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন। তবে কিছুদিন আগেও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে সাংবাদিকতা পেশায় পল্লী অঞ্চলের নারীরা ছিল পিছিয়ে। সেই চিত্রটা এখন বদলাতে শুরু করেছে।
বাংলাদেশের কমিউনিটি রেডিওগুলো এখন রেডিওতে সাংবাদিকতা করতে আগ্রহী স্থানীয় যুব নারীদের উৎসাহ প্রদান এবং তাদের সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ লক্ষে বিগত ২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর উদ্যোগে এই কমিউনিটি রেডিওগুলো বাস্তবায়ন করছে ফেলোশিপ ফর ইয়ুথ উইমেন ইন কমিউনিটি মিডিয়া অ্যান্ড জার্নালিজম নামে এক ব্যতিক্রমী কর্মসূচি। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতায় দলিত যুব নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান এবং তাদের সক্ষমতা অর্জনে সহায়কের ভূমিকা পালন করার লক্ষ্যে এই কর্মসূচি হাতে নেয়া হয় ? পাশাপশি পেশাদারিত্বমূলক তৃণমূল মিডিয়া সাংবাদিক হিসেবে দলিত যুবনারীদের দায়িত্ব পালনে একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তাও করছে এই কর্মসূচি?
ইতোমধ্যে এই কর্মসূচি আওতায় দেশের মোট ১৭টি কমিউনিটি রেডিওতে বিভিন্ন মেয়াদে ৫টি ব্যাচে সর্বমোট ৮৭জন স্থানীয় যুবনারী সাংবাদিকতায় ফেলোশিপ গ্রহণ করছেন? এটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এ জন্যই যে এই যুব নারীদের মধ্যে ৬০ জনই এসেছে দলিত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে। ফেলোশিপকালীন এই নারীরা কমিউনিটি রেডিওর একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মীর তত্ত্বাবধায়নে স্থানীয় নারী ও শিশুদের ওপর বিশেষ করে দলিত সম্প্রদায়ের নারী ও শিশুদের বিদ্যমান অবস্থা ও অধিকারসমূহ, সম্ভাবনা, সমস্যা এবং এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় ইত্যাদি বিষয়ে নিউজ ও কেস স্টাডির জন্য বিষয় নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ, সাক্ষাৎকার নেয়া, রেকর্ড করা, স্ক্রিপ্ট লেখা, কম্পোজ করা, সম্পাদনা, অডিও সম্পাদনা, ইন্টারনেট-এর ব্যবহার, সংবাদপাঠ, অনুষ্ঠান প্রযোজনা, উপস্থাপনা ও মিক্সার মেশিন পরিচালনা ও পত্রিকার জন্য ফিচার লেখা ইত্যাদি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করেন।
বর্তমানে ৩৮ জন ফেলো সংশ্লিষ্ট রেডিওগুলোতে প্রযোজক (অনুষ্ঠান ও সংবাদ), বার্তাকক্ষ সম্পাদক, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, উপস্থাপক, সহযোগী প্রযোজক এবং প্রতিবেদক হিসেবে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন। দেশের সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত কমিউনিটি রেডিও মহানন্দার স্টেশন ম্যানেজার আলেয়া ফেরদৌস জানান- তার রেডিওতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন দলিত ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নারীরা। এমনই কয়েকজন-সোনিয়া শীল, মৌটুসি চৌধুরী, প্রতিমা রানী পাল, হাসিনা মারান্ডি ও লিলি কিস্কু। তারা রেডিও মহানন্দায় তুলে ধরছেন তাদের সম্প্রদায়ের নানান সমস্যা, সম্ভাবনা ও নিজস্ব সংস্কৃতি। তারা ভাঙছেন তাদের সমাজের নানা কুসংস্কারের বেড়াজাল। এভাবে রেডিওতে কাজ করে একদিকে যেমন পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের নারীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে, হচ্ছে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি। অন্যদিকে কমিউনিটি রেডিওগুলো এখন আর দলিত সম্প্রদায়ের নারীদের রেডিওকর্মী হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধা করছে না। তাদের সম্পর্কে পরিবারগুলোতেও সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। এ প্রসঙ্গে রেডিও মহানন্দার সহযোগী প্রতিবেদক প্রতিমা নারী বলেন- ‘এখন ভীষণ ভালো লাগে যখন দেখি, একদিন যে বাবা মেয়েদের বাইরে কাজ করার ঘোর বিরোধী ছিলেন সেই তিনি এখন নিয়মিত আমার প্রতিবেদনগুলো আগ্রহভরে শোনেন, আমাকে প্রশংসা করেন’।
রেডিওতে কাজের মাধ্যমে সমাজের এই দলিত নারীরা তাদের জীবন মান পরিবর্তনের পাশাপাশি অবদান রাখতে শুরু করেছে সমাজ পরিবর্তনে। রেডিও বিক্রমপুরের প্রতিবেদক রিংকি রানী দাস জানান এমনই এক পরিবর্তনের সত্যকথন। তার ভাষায়-‘মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত চর অঞ্চলে বসবাসরত বেদে সম্প্রদায়ের কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকাল সচেতনতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করতে গিয়ে পরিচয় হয় ঐ সম্প্রদারের এক কিশোরী সুমি আক্তারের সঙ্গে। নদীর পাড়ে নৌকায় বাস করেও যার পরিশীলিত চিন্তা ভাবনা ও প্রতিভা নজর কাড়ার মতো। ফলে এক পর্যায়ে শুধু সুমিকে নিয়ে একটি আলাদা কেস স্টোরি তৈরি করি এবং রেডিওতে সম্প্রচার করি। কেস স্টোরিটি দারুণ শ্রোতা প্রিয়তা লাভ করে। পরবর্তীতে সুমিকে নিয়ে রেডিওতে একটি লাইভ শো করি। ক্রমান্বয়ে সুমি হয়ে ওঠে রেডিও বিক্রমপুরের একজন স্বেচ্ছাসেবক। দরিদ্রতার জন্য ক্লাস ফাইভের পর সুমি আর স্কুলে যেতে পারি নি। এখন সুমি রেডিওতে কাজের পাশাপাশি স্কুলে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, সুমি তার নিজের জীবনের গল্প নিয়ে তৈরি রেডিও অনুষ্ঠান করে অর্জন করেছে ‘ইউনিসেফ মিনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০১৬’। রিংকি রানী দাস মন্তব্য করেন: “সুমি এখন বেদে সম্প্রদায়ের এক রোল মডেল। সুমির এই উঠে আসার গল্পটি অনেকের কাছে হয়তো সাদামাটা। কিন্তু আমার কাছে এটা এক নতুন আবিষ্কারের মতো আনন্দের, অর্জনের। আমি সাংবাদিকতার মাধ্যমে তুলে আনতে চাই এরকম হাজারো সুমির গল্প’ । তৃণমূলের আশা জাগানিয়া এই নারী সাংবাদিকরা এখন অভিজ্ঞ মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ইউনিসেফ কর্তৃক মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন জাতীয় পুরস্কার অর্জন করেছেন। নদীবন্দর খ্যাত উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় স্থাপিত রেডিও চিলমারীর যুগ্ম বার্তা সম্পাদক হেনা পারভীন তার ‘হরিজন সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোরদের অবহেলিত জীবনাচার’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য ২০১৫ সালে ইউনিসেফ মিনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। শুধু তাই নয় দলিত এই নারী সাংবাদিকদের লক্ষণীয় সফলতার জন্য ‘ফেলোশিপ ফর ইয়ুথ উইমেন ইন কমিউনিটি মিডিয়া অ্যান্ড জার্নালিজম” প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জাতিসংঘ কর্তৃক আয়োজিত তথ্য সমাজবিষয়ক বিশ্ব সম্মেলন পুরস্কার ( ডঝওঝ ২০১৬) অর্জন করেছে। এই পুরস্কার বাংলাদেশ তথা বিশ্বের সকল কমিউনিটি রেডিও’র ক্ষেত্রে প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কমিউনিটি রেডিওতে দলিত নারী সংবাদকর্মীরা আজ যে নতুন এক ধারার সূচনা করেছেন সেটা খুব মসৃণ নয়, সেখানেও রয়েছে চ্যালেঞ্জ। রেডিও ঝিনুকের প্রতিবেদক সূচনা সরকার বলছিলেন এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর ভাষায়-‘কিশোরীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি’-এই প্রতিবেদনটির জন্য সরেজমিন তথ্য সংগ্রহ করার জন্য হাসপাতালে গিয়ে ভর্তিকৃত রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে অভিভাবকরা এক প্রকার তেড়ে আসেন। এক নারী নিজে থেকে কথা বলতে চাইলে আমার সামনেই তার শাশুড়ি ‘পরিণাম কিন্তু ভালো হবে না’ বলে তাকে শাসাচ্ছিল। পরে দায়িত্বরত নার্স আমাকে জানান- এই নারীকে তার স্বামীই মুখে বিষ ঢেলে দিয়েছে। পরে প্রতিবেশীরা তাকে হাসপাতালে এনে ভর্তি করেছেন।’
অনেকের মতো আমার কাছে অবিশ্বাস্য ছিল -‘ভৌগোলিক অবস্থার কারণে ঝিনাইদহে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি’ সাধারণ মানুষের এই প্রচলিত ধারণাটা কাজে লাগিয়ে যৌতুক কিংবা পরকীয়ার জের ধরে কখনো স্বামী আবার কখনো স্বামীর পরিবারের সদস্যরা নারীদের উসকে দিচ্ছে আত্মহত্যার দিকে আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এই নিহিত সত্য আমি কখনো জানতে পারতাম না যদি রেডিও ঝিনুকে সাংবাদিকতা করার সুযোগ না পেতাম’ । বাল্য বয়সে পিতৃহীন রেডিও সাংবাদিক সূচনা ব্যক্তিজীবনে যেমন সংগ্রামী, তেমনি পেশার ক্ষেত্রেও ভীষণ চ্যালেঞ্জপ্রিয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন- সাংবাদিকতা আমি দারুণ উপভোগ করি। সমাজের নারী ও শিশুদের নানান সমস্যার আরো গভীরে গিয়ে কাজ করতে চাই, তুলে আনতে চাই অজানা চিত্র। শত প্রতিবন্ধকতায়ও রিংকি, প্রতিমা, সূচনার মতো এই সমস্ত দলিত নারীরা স্বপ্ন দেখেন একজন দক্ষ সাংবাদিক হবার। আশা জাগানিয়া এই নারীরা মনে করেন কণ্ঠই হলো শক্তি আর সাংবাদিকতাই হলো হাতিয়ার। তৃণমূলের নারীদের কমিউনিটি মিডিয়াতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, ক্ষমতায়ন এবং তথ্যে তাদের প্রবেশের প্রক্রিয়াকে সহজতর করতে বিএনএনআরসি, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক দাতাসংস্থা ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড-এর আর্থিক সহায়তায় ২০১৩ সালে ফেলোশিপ নামে দিন বদলের যে প্রচেষ্টা শুরু করেছিল আজ সেটা অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এখন স্বপ্ন সেদিনের যখন এই সমস্ত পিছিয়ে পড়া কিন্তু সাহসী, স্বপ্নবান যুব নারীরাই তৃণমূলের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব করবে, তুলে আনবে মূলধারার গণমাধ্যমে তৃণমূলের সত্য।
লেখক: প্রতিভা ব্যানার্জী, কর্মসূচি কর্মকর্তা, বিএনএনআরসি