উপকূলের জেলেরা ফিরছে স্বস্তিতে

রফিকুল ইসলাম হাওলাদারের বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জের উত্তর রাজাপুর গ্রামে। পেশায় জেলে। সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়াই তার নিত্যদিনের কাজ। ভালোই চলছিল তার সংসার। হঠাৎ একটি ঘটনা তার জীবনে ছন্দপতন ঘটায়। নেমে আসে অন্ধকার। মাছ ধরতে গিয়ে দস্যু মাইজ্জা ভাই বাহিনীর হাতে অপহৃত হন তিনি। তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাকে। গত শনিবার সকালে মোড়েলগঞ্জ বাজারে বসে তার ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি। জমি বিক্রি করে মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। তার সঙ্গে আলাপচারিতার মধ্যেই সেখানে হাজির হন আরও একাধিক নির্যাতিত জেলে। এ সময় তারা দস্যুদের হাতে নির্যাতন হওয়ার বর্ণনা দেন।

উপকূলীয় এলাকায় নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের ওপর চালানো ওইসব নির্যাতন ২০১৬ সালের জুনের আগের ঘটনা। এখন পাল্টে গেছে উপকূলীয় ওই জেলার জেলেদের জীবনচিত্র। কারণ জলদস্যুরা আইনশৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছে। ফলে জেলেরা নদীতে নির্বিঘেœ মাছ ধরতে পারছেন। তারা জানান, এক সময় মাছ ধরতে গিয়ে ডাকাতের ভয়ে রাতের খাবার খেতেন বাতি নিভিয়ে। আর এখন গ্যাসের চুলা, টেলিভিশন নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। কেন এমন পরিবর্তন? কারণ সুন্দরবনের কুখ্যাত ৯টি দস্যুবাহিনী র‌্যাবের হাতে আত্মসমর্পণের পরই পাল্টে গেছে সেখানকার চিত্র। সরেজমিন বরগুনার পাথরঘাটা, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ ও শরণখোলা উপকূল ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে এখনো দুই-একটি ছোট জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে।

স্থানীয় জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও ট্রলার মালিকরা বলেন, ২০১২ সালের পর জেলেদের অপহরণের ঘটনা ও নির্যাতন ভয়াবহ রূপ নেয়। পরে দস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যক্রম জোরদার করতে থাকেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ক্রসফায়ারে নিহত হয় একের পর এক জলদস্যু।

সুন্দরবন ও সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সংগঠন বরগুনা জেলা ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুল মান্নান আমাদের সময়কে বলেন, এখন জেলেরা আনন্দ নিয়ে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। মনে হয়, তারা মায়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকেন। একটা সময় ছিলÑ যখন সব সময় আতঙ্ক তাড়া করে ফিরত।

ট্রলার মালিক মো. সোহাগ বলেন, তার একটি ট্রলার রয়েছে। কিছু দস্যুবাহিনী ছিলÑ যাদের কাছ থেকে কার্ড কিনতে হতো। প্রতিটি কার্ডের দাম ছোট ট্রলার ২৫ হাজার ও বড় ট্রলার ৪০ হাজার টাকা। এ কার্ড থাকলে ওই বাহিনী আর হামলা চালাত না। কিন্তু অন্য বাহিনীগুলো ঠিকই জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যেত।

ভুক্তভোগী কয়েক জেলে জানান, তাদের অপহরণের পর নির্মম নির্যাতন চালাত দস্যুরা। মুক্তিপণের দাবিতে অনেক জেলেকে মাসের পর মাস আটকে রাখা হতো। এমনই এক ঘটনার বর্ণনা দিলেন ইমাদুল হোসেন। তার বাড়ি পাথরঘাটার চরদুয়ানী গ্রামে। রাজু বাহিনীর হাতে অহরণের ৩৭ দিন পর জমি বিক্রি করে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, এখন সময় পাল্টে গেছে। নির্বিঘেœ মাছ ধরতে যেতে পারছি।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, গভীর সমুদ্রের যেখানে বেশি মাছ পাওয়া যায়, সেখানে একটা সময় জেলেরা যেতে চাইতেন না। এখন সেখানে আনন্দের সঙ্গে যাচ্ছেন তারা। এ বছর যত ইলিশ মাছ পাওয়া গেছে, গত ১০ বছরেও তা ধরা পড়েনি।

২০১৬ সালের ৩১ মে র‌্যাবের কাছে প্রথম আত্মসমর্পণ করে মাস্টার বাহিনী। এরপর একে একে ৯টি বাহিনীর ৯২ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে। তারা ১৯৫টি অস্ত্র ও ১০ হাজার ১৪৩টি গুলি জমা দেয়। ওই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় বেসরকারি একটি টিভি চ্যানেলের এক সাংবাদিক মধ্যস্থতা করেছিলেন।

দীর্ঘদিন জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কাজ করা র‌্যাব ৮-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির আমাদের সময়কে বলেন, এটা আসলে শুধু র‌্যাবের একার কাজ নয়। সবার সহযোগিতায় জলদস্যুদের বিরুদ্ধে যে একটা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে, সেটি হলো বড় অর্জন।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, আত্মসমর্পণকারী দস্যুরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। কেউ দিনমজুর, কেউ বা অন্য কাজ করছে। তবে তারা কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান আমাদের সময়কে বলেন, অভিযান কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি আইন মেনে দস্যুদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সঠিক পথে ফিরে আসার সুযোগ দিয়েছে র‌্যাব।