গ্রামবাংলার মাঠ ভরে উঠেছে শাকসবজিতে

শীতের শেষলগ্নে সবুজে ছুঁয়েছে সারাদেশ। কেবল মাঠের পর মাঠ নয়- শাকসবজিতে ভরে উঠেছে গ্রামবাংলা; পথপ্রান্তর। আলু উৎপাদনে চলতি মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা যেমন ছাড়িয়ে গেছে- তেমনি ছাড়িয়েছে শাকসবজি, মসুর, মাষকালাই, রসুন ও কালোজিরার উৎপাদনও। চলতি রবি মৌসুমে এই ৬ ফসল আবাদে লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ হয়নি বরং কোন কোন ক্ষেত্রে অগ্রগতির হার ১১২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে মৌসুমটিতে এসব শস্যের উৎপাদন পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বছরটিতে গম আবাদে অগ্রগতির হার এখন পর্যন্ত ৯৫ শতাংশের ঘর অতিক্রম করতে পারেনি। সারাদেশে গম আবাদে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৯২ শতাংশ। এক্ষেত্রে কর্মকর্তারা গমের ব্লাস্ট রোগকে দায়ী করছেন। সর্বশেষ তথ্যমতে- মিষ্টি আলু, খেসারি, মটর, ফেলন, সরিষা, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়া আবাদে অগ্রগতির হারও ৯০ শতাংশের ঘর ছাড়িয়েছে। আবার রবি মৌসুমের দু-একটি ফসলের আবাদ এখনও মধ্যভাগে। সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ৫৭ শতাংশ অতিক্রম করলেও সূর্যমুখীতে অগ্রগতির হার ৩২ শতাংশ। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি রবি মৌসুমে অন্তত ১৫টি রবিশস্য উৎপাদনে পূর্বের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বর্তমানে দেশের কৃষক ধানের পাশাপাশি রবিশস্য উৎপাদনেও মনোযোগী। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। আর কৃষিতেও ছোঁয়া লেগেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির, ফলে সব ফসলেরই উৎপাদন বাড়ছে। সমন্বিত এই প্রভাবে কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে রবিশস্যের উৎপাদনও। এ বছরও পূর্বের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।

জানা গেছে, বাজারে নবেম্বরের শেষ দিকে রবি মৌসুমের ফসল উঠতে শুরু করে। কৃষি কর্মকর্তারা এখন নজর দিচ্ছেন উৎপাদনের হিসাব-নিকাশে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তথ্য পাঠাচ্ছেন ডিএইতে। একই সঙ্গে প্রতিদিনই মিলিয়ে দেখা হচ্ছে আবাদে অগ্রগতির হার। খোঁজ রাখা হচ্ছে প্রতিটি অঞ্চলের। আপডেট হচ্ছে বিভাগ ভিত্তিক আবাদ পরিস্থিতি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছর গম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় ৪ লাখ ৬১ হাজার ৬১৩ হেক্টর জমিতে। তবে আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম। সারাদেশে গম আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ২৮ হাজার ১৪৭ হেক্টর জমিতে। বছরটিতে ৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হলেও এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৬ হেক্টর জমিতে। আলু অবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। এখন পর্যন্ত আবাদ হয়েছে ৫ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ সারাদেশের আলুর আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি। মিষ্টি আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৫ হেক্টর জমিতে, তবে আবাদ হয়েছে মাত্র ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে। চলতি বছর শীতকালীন সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে। আর সবজির আবাদ হয়েছে ৫ লাখ ৬ হাজার হেক্টর জমিতে। এ বছর ছোলা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ হাজার ৫৭৯ হেক্টর জমিতে, আর আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৪৬৮ হেক্টর জমিতে।

তথ্য থেকে দেখা যায়, চলতি বছর শীতকালীন মুগ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৭০ হেক্টর জমিতে। একইভাবে খেসারি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৯৫ হাজার ৮৪২ হেক্টর, মসুর ২ লাখ ৫০ হাজার ২০৩ হেক্টর, মাষকালাই ৭০ হাজার ১০ হেক্টর, মটর ১০ হাজার ৫৩৮ হেক্টর, চীনা বাদাম ৭৫ হাজার ৯১৬ হেক্টর, সরিষা ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬০ হেক্টর, সয়াবিন ৮০ হাজার ৫০১ হেক্টর, সূর্যমুখী ৩ হাজার ৭৩৩ হেক্টর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইং কর্তৃক প্রণীত রবি মৌসুমের ফসল আবাদের সর্বশেষ অগ্রগতির তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সারাদেশে মাঠ পর্যায়ে গম আবাদে অগ্রগতির হার ৯২ শতাংশ। একইভাবে ভুট্টা আবাদে অগ্রগতির হার ৮৫ শতাংশ, আলু ১০৯ শতাংশ, মিষ্টি আলু ৯৪ শতাংশ, শাকসবজি ১০১ শতাংশ, ছোলা ৬৪ শতাংশ, মুগ (শীত) ৪৬ শতাংশ, খেসারি ৯৩ শতাংশ, মসুর ১০৮ শতাংশ, মাষকলাই ১১১ শতাংশ, মটর ৯০ শতাংশ, অড়হড় ৫৭ শতাংশ, ফেলন ৯৪ শতাংশ, চীনাবাদাম ৮৩ শতাংশ, সরিষা ৯৪ শতাংশ, তিল (শীত) ২৩ শতাংশ, সয়াবিন ৫৭ শতাংশ, সূর্যমুখী ৩২ শতাংশ, তিসি ৭০ শতাংশ, পেঁয়াজ ৯১ শতাংশ, রসুন ১১০ শতাংশ, মরিচ (শীত) ৯২ শতাংশ, ধনিয়া ৯৩ শতাংশ ও কালোজিরা আবাদে অগ্রগতি হয়েছে ১১২ শতাংশ। অর্থাৎ মাঠে রবি মৌসুমের কোন কোন ফসল আবাদে অগ্রগতির হার শতভাগ ছাড়িয়ে গেছে। আবার কোনটির আবাদ মাঝামাঝি পর্যায়ে। সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, মৌসুম শেষে সব ফসলের উৎপাদনই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ধান ছাড়া রবি মৌসুমের অন্যান্য ফসল উৎপাদনের সামগ্রিক প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন ইউং এর উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুহু জনকণ্ঠকে বলেন, রবি মৌসুমে এখন পর্যন্ত গম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আলু, শাকসবজি, মসুর, মাষকালাই, রসুন ও কালোজিরা আবাদে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। আবাদে অগ্রগতির হারে ৯০ ভাগের কোটা ছাড়িয়েছে মিস্টি আলু, খেসারি, মটর, ফেলন, সরিষা, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়া। দেশে অনুকূল পরিস্থিতি থাকায় কয়েকটি শস্যের উৎপাদন বাড়বে পূর্বের চেয়েও।