বইমেলায় শতকোটি টাকার বাণিজ্য

মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে জমে উঠেছে বাংলা একাডেমি, টিএসসি, শাহবাগ ও দোয়েল চত্বর এলাকা। বইমেলার নিরাপত্তা জোরদার করতে এবার মেলার বাইরে কোনো হকার বা ফুটপাতে দোকান বসতে দেওয়া হয়নি। যে কারণে বাইরে ভিড়ের চাপ কম। ফলে বই বেচাকেনা ও খাবারদাবারের সব আয়োজন মেলার ভেতরেই। মেলার ১১ দিন চলে গেছে। ইতোমধ্যে মেলা বেশ জমে উঠেছে। বইমেলার অর্থনৈতিক দিকগুলো নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন নাজমুল হুসাইন

প্রাণের মেলা অমর একুশের মাসব্যাপী বইমেলা চলছে। বইমেলা মানেই জ্ঞানের আসর। জ্ঞান বা সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চলে আসে অর্থনৈতিক মূল্যও। বই ছাপানো, বই বাঁধানো, কম্পোজ, প্রচ্ছদ আঁকা, লেখক সম্মানী, প্রকাশকের মুনাফা, পাঠকের বইকেনা, মেলার কাঠামো নির্মাণ, স্টল ভাড়া, মানুষের আসাযাওয়া ও খাওয়াÑ সব কিছুতেই লেগে আছে অর্থের হিসাব। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্টানগুলোও। ফলে বইমেলা কেন্দ্র করে হচ্ছে শতকোটি টাকার বাণিজ্য।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেলায় গত বছর ৪০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছিল। এবার আরও পাঁচ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪৫ কোটি টাকার বই বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে বাংলা একাডেমির কর্মকর্তারা জানান, বই বিক্রির পরিমাণ আরও বেশি। বই বিক্রির সময় অনেকেই রশিদ দেন না। আবার বিক্রি করলেও তা গোপন করেন কর কর্মকর্তাদের ঝামেলার ভয়ে। শুধু বাংলা একাডেমিই মেলায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকার বই বিক্রি করে। বড় বড় কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা এর চেয়েও বেশি বই বিক্রি করে। ফলে বই বিক্রির পরিমাণ যে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দ্বিগুণ হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ফলে মেলায় ৮০ থেকে শতকোটি টাকার বই বিক্রি হয়।

মেলার দুই অংশে ৬৪৯টি ইউনিট রয়েছে। প্রকাশকরা ইউনিট ভিত্তিতে তাদের বইয়ের স্টল দিয়েছে। কোনো প্রকাশক এক ইউনিট, কোনো প্রকাশক দুই ইউনিট, আবার কোনো প্রকাশক তিন ইউনিট মিলে একটি স্টল দিয়েছে। বড় প্যাভিলিয়ন আছে ১৫টি। প্রায় সাড়ে চারশরও বেশি প্রকাশক মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। ইউনিটের ভিত্তিতে ভাড়া দিতে হয় প্রকাশকদের। এক ইউনিটের ভাড়া ১৪ হাজার টাকা, দুই ইউনিটের ভাড়া ৩৪ হাজার, তিন ইউনিটের ভাড়া ৫৬ হাজার টাকা এবং প্যাভিলিয়নের ভাড়া এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। এ খাতে মোট ভাড়া বাবদ আয় হবে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টাকা।

বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জমি বাবদ গণপূর্ত অধিদপ্তরকে ৫০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। ধুলাবালিতে দর্শনার্থীদের যাতে কষ্ট না হয়, সে জন্য মেলা কর্তৃপক্ষ এবারই প্রথম উদ্যানে বইমেলার জন্য নির্বাচিত স্থানের মাটিতে ৯৫ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে ইট বিছিয়েছে। এই ইট দিতে খরচ হয়েছে ২৫ লাখ টাকা।

মেলার নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। দায়িত্বে আছে নিরাপদ মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট। বিদ্যুতের খরচ ধরা হয়েছে ১৮ থেকে ১৯ লাখ টাকা। সরবরাহ করা হচ্ছে পর্যাপ্ত পানির। শুধু পানি বাবদ খরচ হচ্ছে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।

সবচেয়ে বড় বাজেট মেলার অবকাঠামো। অর্থাৎ ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণে। ৬৪৯টি ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণে খরচ হয়েছে ১ কোটি টাকার মতো।

গতবারের থেকে এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিসসহ আড়াই হাজার নিরাপত্তা ফোর্স এখানে মোতায়েন করা হয়েছে। শুধু পুলিশ ফোর্সই আছে দুই হাজারের ওপরে। বইমেলায় বাংলা একাডেমিতে দুটি ও উদ্যানে তিনটি গেট আছে। প্রতি গেটে একজন ইন্সপেক্টর, একজন সাব-ইন্সপেক্টর, দুজন এএসআই, একজন নারী এসআই, ৯ থেকে ১০ জন নারী ফোর্সসহ প্রায় ২৫ জন করে পুলিশ ফোর্স আছে। পুরো মেলাজুড়ে ওয়াচটাওয়ার আছে ৯টি। ৫টি পুলিশের ও ৪টি র‌্যাবের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা বাজেট রয়েছে।

মেলায় সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ২৫০-৩০০ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ। সিসি ক্যামেরা বাবদ খরচ হবে ১৫ লাখ টাকা। পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি মেলার নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখার লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৮০ আনসার মোতায়েন করেছে মেলা পরিচালনা কমিটি। এই অতিরিক্ত আনসার মোতায়েনে খরচ হবে প্রায় ১২ লাখ টাকা।

মেলা উপলক্ষে বই ছাপাতে ছাপাখানা, কাগজ, কালি, প্রচ্ছদ আঁকা, বাঁধাইÑ এসব কাজে প্রায় ৫০ কোটি টাকার খরচ হচ্ছে।

মেলায় চারটি খাবারের স্টল আছে। এর মধ্যে দুটি বাংলা একাডেমি, দুটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে। এবাই প্রথম মেলায় খাবারের দোকান হিসেবে স্পন্সর করছে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের হোটেল অবকাশ। তাদের খাবারের দামের তালিকা বাংলা একাডেমির ভবনের সামনে বড় ব্যানারে টাঙিয়ে দেওয়া আছে এবং খাবারের স্টলগুলোতেও দাম দেওয়া আছে। তবে এগুলোতে খাবারের দাম অত্যধিক বেশি। বিক্রিও হচ্ছে ভালো। ফলে প্রতিদিন প্রতিটি স্টল ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড় থাকে বলে ওই দিনগুলোতে বিক্রিও বেশি হয়।

কিছু সমস্যার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের নির্বাহী অফিসার কাজী আর ইসলাম বলেন, আমরা আমাদের ইচ্ছামতো খাবারের পণ্য রাখতে পারি না। তাই বিক্রি একটু কম হয়। নির্দিষ্ট পণ্যেও বাইরে কিছু আইটেম রাখতে পারলে বিক্রি আরও ভালো হতো।

বইমেলা উপলক্ষে অনেক ছাত্রছাত্রী খ-কালীন চাকরি করছে স্টলগুলোতে। তাদের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। ইউনিটপ্রতি গড়ে তিন থেকে চারজন করে খ-কালীন কাজ করছে। প্রকাশকরা তাদের হাত খরচের পাশাপাশি মেলা শেষে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের বেতন দেন। প্রকাশনা ও বিক্রি অনুযায়ী বেতনের কিছুটা তারতম্য থাকলেও গড়ে তারা ৮-৯ হাজার টাকার মতো পায়।

উৎস প্রকাশনী চার ইউনিট মিলে তাদের স্টল দিয়েছে। এতে ১০ শিক্ষার্থী কাজ করছেন। কথা হয় শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার তানিশার সঙ্গে। লালমাটিয়া মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী। তিনি বলেন, কাজ করে বেশ ভালো লাগছে। অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছি, মিশতে পারছি। তাদের জানতে পারছি। এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা। সবচেয়ে বড় কথাÑ এ রকম পরিবেশে কাজ করা ভাগ্যের ব্যাপার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুরুন্নাহার পলি প্রগতি পাবলিকেশনের স্টলে কাজ করছেন। তিনি বলেন, আমি প্রতি বছরই বইমেলায় কাজ করি। এতে বেশ আনন্দ পাই।

উৎস প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী মেসবাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ছাত্রছত্রীদের খ-কালীন কাজে দারুণ খুশি আমরা। তাদের কথা বলার স্টাইল ও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করায় আমাদের প্রকাশনার অনেক প্রচার হচ্ছে।

শ্রাবণ প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী রবিন আহসান বলেন, প্রথম সপ্তাহে বিক্রি একটু কম ছিল। এখন ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বিক্রিও বাড়ছে।