বাকৃবি গবেষকদেও সফলতা: অল্প সময়ে ধান শুকানোর যন্ত্র আবিষ্কার

কৃষি প্রধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্য মতে, আমাদের দেশে বর্তমানে মোট ধান উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৫৬ মিলিয়ন টন। আমাদের খাবার হচ্ছে ভাত। ধান থেকে ভাত হয়ে আমাদের খাবার টেবিলে আসা পর্যন্ত উৎপাদনের প্রায় ১৩ শতাংশ অপচয় হয়ে যায়। হিসাব করলে অপচয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন টন। এর একটা বিশাল অংশ অপচয় হয় ধান শুকানোর সময়। এছাড়া বৃষ্টি ও মেঘলা দিনে ধান শুকাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন কৃষকরা, বেড়ে যায় ক্ষতির পরিমাণ। অপচয় কমিয়ে অল্প সময়ে সল্প খরচে ধান শুকানোর একটি নতুন যন্ত্র তৈরি করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। তাঁরা যন্ত্রটির নাম দিয়েছেন বিএইউ এসটিআর ড্রায়ার। প্রচলিত পদ্ধতিতে সূর্যের তাপে চাতালে ধান শুকাতে যেখানে ৩-৪ দিন সময় লাগলে সেখানে এই যন্ত্রটিতে মাত্র ৪-৫ ঘণ্টায় শুকানো সম্ভব হবে। সূর্যের ওপর নির্ভশীল না হয়ে বিকল্প পদ্ধতিতে ধান শুকানোর একটি যন্ত্র তৈরি করতে অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের নিয়ে ২০১৫ সালে শুরুতে কাজ শুরু করেন। প্রায় এক বছরেও অধিক সময় কাজ করে ২০১৬ সালের শেষের দিকে সফল হন। বিএইউ এসটিআর ড্রায়ার নামে ধান শুকানোর একটি যন্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হন।

যন্ত্রটির আকার অনেকটা ড্রামের মতো। দুইটি লোহার খাঁচা, তাপ উৎপাদনের জন্য একটি চুলার, গরম বাতাস পরিবহন পাইপের সমন্বয়ে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। চুলাসহ উচ্চতা ১.৪ মিটারের কাছাকাছি। যন্ত্রে জ্বালানি হিসেবে ধানের খোসা (তুষ) বা চারকোল ব্যবহার করা যায়। অথবা যন্ত্রটিতে এক হর্স পাওয়ারের ডিজেল বা বিদ্যুত চালিত মোটর ব্যবহার করা যায়। মোটর ব্যবহার করলে যন্ত্রটি চলতে প্রতি ঘণ্টায় তেল খরচ হবে হাফ লিটারের একটু বেশি। সম্পূর্ণ একটি যন্ত্র তৈরি করতে খরচ পড়বে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তাঁকে যন্ত্রটি তৈরি করতে সাহায্য করেন স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।

গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ড. চয়ন কুমার সাহা বলেন, ধান মাড়াইয়ের পর কৃষকদের সবচেয়ে সমস্যায় পড়ে শুকাতে গিয়ে। বৃষ্টির দিনে সমস্যাটা আরও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেতে যন্ত্রটি ব্যবহার করে কৃষকরা অল্প সময়ে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ধান শুকাতে পারবে। প্রতিদিন একটি যন্ত্র দিয়ে ১-১.৫ টন পর্যন্ত ধান শুকানো যায়। তিনি আরও বলেন, এটা ব্যবহার করে ধান শুকালে চালে গুণগত মানের কোন পরিবর্তন হয় না। এছাড়াও ছোট ছোট চালের কারখানায় এই যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে। এতে মালিকরা কম শ্রমিক ব্যবহার করেই ধান শুকাতে পারবে এবং বৃষ্টিতে ভিজে ধান নষ্ট হওয়ার সুযোগ থাকবে না। এতে করে খরচ অনেক কমে যাবে। পাশাপাশি শুকানোর সময় পশুপাখি বা বিভিন্ন কারণে অপচয় হবার ঝুঁকি থাকে না। পাশাপাশি বীজধান শুকানোর কাজেও যন্ত্রটি অত্যন্ত কার্যকর। যন্ত্রটি ব্যবহার করে বীজধান শুকালে অঙ্করোদগমের ওপর কোন প্রভাব পড়ে না। এক্ষেত্রে যন্ত্রের তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রী সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হয়। যন্ত্রটি সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা কমিটির পরিচালক অধ্যাপক ড. মঞ্জুরুল আলম বলেন, যন্ত্রটি ব্যবহার করে সময় ও শ্রম দুটিই সাশ্রয় করে ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে কৃষকরা লাভবান হবেন এবং অযাচিত অপচয় রোধে এটি কার্যকরী ভূমিকা রাখবে।