শিক্ষায় এমন উদাহরণই সৃষ্টি করা প্রয়োজন

২০১৭ জানুয়ারি মাস। এ মাসটি একটি বিশেষ এলাকার জন্য যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেল। সেই বিশেষ এলাকাটি হলো কিশোরগঞ্জ জেলা। আর এ জেলার যে দুটি স্থান এ জানুয়ারি মাসে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে সেগুলোর একটি কুলিয়ারচর এবং আরেকটি বাজিতপুর উপজেলা। মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে পাশাপাশি দুটি উপজেলার মধ্যে এমন দুটি রেকর্ড সৃষ্টি করে সেটাও একটি বিশ্ব রেকর্ডের কাতারে পড়তে পারে।

নেতৃত্ব সৃষ্টি, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদির জন্য কিশোরগঞ্জ জেলাটি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সারাদেশে পরিচিত রয়েছে। কিন্তু এতদাঞ্চলের সুবিশাল একটি হাওর থাকার কারণে সে হাওর এলাকার মানুষজন বছরে মাত্র একটি ধান ফসল ফলাতে পারে। সেজন্য তারা আর্থিকভাবে একটু পশ্চাত্পদ। ঠিক সেরকমভাবে কুলিয়ারচর এবং বাজিতপুর তার বাইরে নয়। কিন্তু এ অপেক্ষাকৃত পশ্চাত্পদ এলাকায় সম্প্রতি ঘটে গেছে শিক্ষার ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের। দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই, সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব রেকর্ড। সেই দুটি বিশ্ব রেকর্ডের একটি ছিল গত ১১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে কুলিয়ারচরে। সেদিন সেখানে ২৮টি বিদ্যালয় হতে ৫ম থেকে ৭ম শ্রেণির মোট তিন হাজার দুইশ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বিজ্ঞান চর্চার বিষয় হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতি স্কুল-কলেজে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ল্যাবরেটরিতে করানো হয় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস। কিন্তু মাত্র দেড় ঘণ্টাব্যাপী এমন ওপেন ফিল্ডে একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ক্লাসের আয়োজন-সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এটি এখন ‘গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ উঠার জন্য প্রক্রিয়াধীন। তার পূর্বে তিন হাজার শিক্ষার্থীকে দিয়ে সবচেয়ে বড় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করার রেকর্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার। সেদিন কুলিয়ারচর উপজেলার ক্লাসটি পরিচালনা করেছিলেন দেশবরেণ্য বিজ্ঞান শিক্ষক, শিশু-কিশোরদের জন্য সহজ করে বিজ্ঞান ও বিষয়ভিত্তিক সময়োপযোগী লেখক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। সেখানেও তিনি সকল শিক্ষার্থীকে অতি সহজভাবে হাতে-কলমে চৌম্বকীয় শক্তি তৈরির কৌশল শিক্ষা দিয়েছিলেন। সেদিন বিশ্বের সেই বৃহত্তম ক্লাসের জন্য বর্তমান শিক্ষাবান্ধব ও ডিজিটাল সরকারের উত্সাহ প্রদানের অংশ হিসেবে সেখানকার স্থানীয় সাংসদ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ ও গুণীজনেরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী মহোদয় পরে যে ২৮টি স্কুল থেকে শিক্ষার্থী উক্ত ক্লাসে অংশ নিয়েছিল, সেসব স্কুলের ল্যাবরেটরির জন্য একটি করে কম্পিউটার উপহার দিয়েছেন। পুরো বিষয়টি আয়োজন করেছিলেন শিক্ষানুরাগী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ড. উর্মি বিনতে সালাম।

আরেকটি রেকর্ড সৃষ্টি হলো পাশাপাশি উপজেলা বাজিতপুরে। সেখানে ২১ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখে উত্সবমুখরভাবে অনুষ্ঠিত হলো দেশের সবচেয়ে বড় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর ‘একযোগে বইপড়া’ উত্সব। সেখানকার ১৯টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মোট পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী একত্রে বসে সরাসরি যার যার ক্লাসে পাঠ্যবইয়ের অন্তর্ভুক্ত মুক্তিযুদ্ধের গল্প, প্রবন্ধ পাঠ করেছে। সকাল ১১.২০ ঘটিকা থেকে শুরু করে এক ঘণ্টাব্যাপী এ পাঠ উত্সবে সেসব শিক্ষার্থীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে। কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পির আয়োজনে এ অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আরো অংশ নেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমেদ, কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দীন বিশ্বাস, উপজেলা চেয়ারম্যান ছারোয়ার আলম, পৌর মেয়র আনোয়ার হোসেন আশরাফসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। সেখানে ভাগলপুর নাজিম ভূইয়া মাঠে পাঁচ হাজার অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ছাড়াও আরো প্রায় সমপরিমাণ লোক দর্শক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে অনুষ্ঠানশেষে প্রায় ১০ হাজার টিফিনবক্স বিতরণ করা হয় শিক্ষার্থীদের মাঝে। এমন একটি আয়োজন দেখে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং ভবিষ্যতে তা সারাদেশে ছড়িয়ে দিয়ে বছরের একটি দিনকে ‘বইপড়া দিবস’ হিসেবে পালন করার দাবি করা হয়।

আমরা যারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরাখবর রাখি তাদের স্মরণ থাকার কথা, এরআগে গত কিছুদিন পূর্বে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলাতে স্থানীয় সাংসদ ফাহমি গোলন্দাজ বাবেলের উদ্যোগে সেখানকার প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী কর্তৃক মাসাবধি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পাঠের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে সারাদেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। যাহোক, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস আয়োজন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে জানার জন্য একত্রে উত্সব আকারে গল্প, প্রবন্ধ পাঠ এবং বঙ্গবন্ধুর জীবনসংগ্রামের ইতিহাস জানার জন্য শিক্ষামূলক যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে কিশোরগঞ্জের দুটি উপজেলা প্রশাসন, সেগুলোকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিলে একটি শিক্ষিত, সচেতন ও জঙ্গি-সন্ত্রাসমুক্ত জাতি গঠনে সহায়ক হবে। সেইসঙ্গে নতুন প্রজন্মের মাধ্যমে জাতি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। কাজেই শিক্ষা নিয়ে এমন আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে, যা এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করবে।