ঢাকা দক্ষিণের ১০ খাল পুনরুদ্ধারে চলছে উচ্ছেদ অভিযান

রাজধানীর ১০ খালের ওপর গড়ে তোলা সকল অবৈধ স্থাপনার দখল উদ্ধার করে খালের স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে আনতে রাজধানীতে প্রথমবারের বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সোমবার থেকে খালের ওপর অবৈধভাবে দখল করে গড়ে তোলা সকল স্থাপনা উচ্ছেদ করা হচ্ছে তাই উচ্ছেদ করে পুনঃদখল না করা পর্যন্ত এ অভিযান কোনক্রমেই থামবে না বলে জানিয়েছেন মেয়র সাঈদ খোকন। এছাড়া খাল ছাড়াও অবৈধভাবে দখলে রাখা রাস্তাঘাটসহ যে কোন নাগরিক স্থাপনা যে কোন মস্তান বা চাঁদাবাজ কিংবা যত ক্ষমতাসীন ব্যক্তিই হউক না কেন তাও উচ্ছেদ করার ঘোষণা দেন তিনি। উচ্ছেদ কাজে যে কোন প্রকার বাধা আসলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে বলেও জানান। সোমবার দুপুরে নতুন ডিএসসিসির অন্তর্ভুক্ত হওয়া নন্দীপাড়ার জিরানী খালের (ত্রিমোহিনী খাল) ওপর গড়ে তোলা শতাধিক দোকান ও স্থায়ী ও অস্থায়ী বিভিন্ন স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে ডিএসসিসির সীমানায় থাকা ১০ খাল উদ্ধারে অভিযান শুরুর সময় মেয়র এসব কথা বলেন। মেয়র উচ্ছেদ করা খালে পুনরায় কেউ দখল করলে স্থানীয় নাগরিকদের তা প্রতিহত করতে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অভিযানকালে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ বিলাল, ঢাকা ওয়াসার এমডি প্রকৌশলী তাকসিম এ খান, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা উপসচিব মোঃ আবু নাঈম, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ডেমরা সার্কেলের এসিল্যান্ড আঃ মালেক, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

মেয়র বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশের প্রেক্ষিতে সরকারের ৩টি সংস্থা ডিএসসিসি, ঢাকা ওয়াসা ও ঢাকা জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ও যৌথ উদ্যোগে এ খাল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২২ জানুয়ারি ৩টি সংস্থার প্রধান যৌথভাবে খাল উদ্ধার কাজ করতে সম্মত হন। এ সময় স্থানীয় নাগরিকদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে বলেন, আমরা ঢাকাকে জলসবুজে ঢাকা হিসেবে গড়তে চাই। এরই অংশ হিসেবে আমরা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ১০টি খাল উদ্ধারে কাজ শুরু করেছি। আমরা সবগুলো খাল উদ্ধার করব। পুরো কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। অবৈধ দখল থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে তা উদ্ধার করে নগরীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে ও বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দূর করতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঢাকার খালসমূহ ভরাট ও অবৈধ দখলের কবলে পড়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ অবস্থা থেকে নগরবাসীকে মুক্ত করতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। গুটি কয়েক মানুষের লাভের জন্য লাখ লাখ নগরবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হতে দেব না।

ডিএসসিসি মেয়র বলেন, ঢাকার কোন নাগরিক স্থাপনা যেমন রাস্তা ঘাট তা দখল করে মস্তানি ও চাঁদাবাজি করতে দেয়া হবে না। কেউ করলে তাকে বা তাদের শক্ত হাতে কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। গুলিস্তান, মতিঝিলসহ ডিএসসিসির যে কোন স্থানে যারা দখল করে নাগরিকের চলার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে সর্বশক্তি দিয়ে তাদের প্রতিহত করা হবে। খাল রাস্তাসহ যত অবৈধ স্থাপনা রয়েছে নগরবাসীর সহায়তা নিয়ে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নগরকে বাসযোগ্য করার সকল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তাই আপনারা দখল উদ্ধার করা খালে কোন প্রকার ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। এটি সবার সম্পত্তি তাই সবাই মিলে এ খালগুলোকে রক্ষা করুন। একাজে নগরবাসীর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্থানীয় নাগরিক ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন, ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানসহ ঢাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে কয়েক ঘণ্টা একটানা এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে শুরু করা অভিযানে কমপক্ষে ১শ’টি অবৈধ স্থাপনা ভেঙ্গে দেয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা জেলা পরিষদের ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়া ৫২ স্থায়ী স্থাপনা (দোকান) রয়েছে। এসব স্থাপনা ভাঙ্গার ফলে জেলা পরিষদের মাকের্টের প্রায় কোটি টাকার বেশি মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার সময় এসব দোকানে থাকা মালামাল স্থানীয় নাগরিকগণকে বস্তায়, ভ্যানে রিক্সাসহ যে যেভাবে পারেন তা নিয়ে যেতে দেখা গেছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী এ অভিযান চলাকালে ডিএসসিসির ক্ষমতাপ্রাপ্ত কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকনের নির্দেশে ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মোঃ নাজমুস শোয়েবের নেতৃত্বে এ অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। এই প্রথমবারের মতো ডিএসসিসি কর্তৃক পরিচালিত বিশাল এ অভিযানে কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হতে দেখা যায়নি। স্থানীয় নাগরিকদের সহায়তায় কেউ কেউ দোকানে রাখা মালামাল সরিয়ে নিয়ে আশপাশের বাড়িতে রাখতে দেখা গেছে।

ত্রিমোহনী খালের (জিরানী খাল) ওপর স্থায়ী এ মার্কেটটি এরশাদ সরকারের সময়ে নির্মাণ করা হয়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ায় অভিযানে এ ভবনটির ৫২টি দোকানই ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী পূর্বে ঘোষণা দিলেও পাকা ভবন হওয়ায় আপাতত এ ভবনটি ভাঙ্গা হবে না বলে দোকান মালিকগণ ধারণা করেন। কিন্তু মেয়রের নির্দেশে সেখানে থাকা ৫২টি দোকান ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কয়েকটি বড় বড় লোডার ও বুলডোজার দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে দোকান ভাঙ্গার কাজ শুরু করায় দোকান মালিকদের কেউ কেউ তাদের দোকানের কোন মালামলই সরিয়ে নিতে পারেননি। কিছু দোকান অভিযান পরিচালনার সময় বেশ কিছু দোকান বন্ধ দেখা গেছে। দোকান মালিকগণ দোকান না ভাঙ্গতে ও মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নিতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সময় চাইলে ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ ১০ মিনিট সময় দেয়। এরপরই দোকান ভাঙ্গার কাজ শুরু করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। খালের ওপর থাকা অবৈধ দখলে প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ জনকণ্ঠকে বলেন, সাধারণত যে কোন অবৈধ স্থাপনা ভাঙ্গার সময় ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হতে হলেও এখানে ব্যতিক্রম। স্থানীয়দের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ এক্ষেত্রে বেশ সক্রিয়। সবার সহায়তায় কোন অবৈধ দখলধারীকেই বাধা দিতে দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে।

অভিযানের সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খান মোহাম্মদ নাজমুস শোয়েবের বলেন, দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নেয়ার জন্য তিনদিন আগেই মাইকিং করা হয়েছে। তাদের নোটিসও দেয়া হয়েছিল কিন্তু দোকান মালিকগণ এতে কর্ণপাত করেননি। তাই সময় দেয়া যাবে না। নির্দিষ্ট সময়ের ফাঁকে তাড়াহুড়ো করে মালামাল সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন দোকান মালিকরা। দোকানের ভেতরেই অনেকের মালামাল রয়ে যায়। অনেকে মালামাল সরাতে না পেরে কান্না শুরু করেন। মূলত মার্কেটটি আটটি অংশে বিভক্ত। শুরুতে পশ্চিম অংশে সিটি কর্পোরেশনের তিনটি টায়ার লোডার একসঙ্গে মার্কেট ভবনে ধাক্কা দিলে ভবনটি ভেঙ্গে খালে পড়ে যায়। অভিযান শেষে নিয়মিতভাবে চলবে বলে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে মাইকিং করে জানিয়ে দেয়া হয়।