আসছে ছত্রাকসহিষ্ণু আলুর দুটি জাত

ছত্রাক বা লেট ব্লাইটসহিষ্ণু আলুর দুটি জাতের পরীক্ষামূলক চাষ করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। ছত্রাকনাশক ছাড়াই ‘অ্যালুয়েট’ ও ‘ক্যারোলাস’ নামের ওই দুই জাতের আলু চাষে সফলতা পেয়েছে ইনস্টিটিউটের পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উত্পাদন কেন্দ্র। এই আলু অন্য আলুর দ্বিগুণ ফলন দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চ ফলনশীল ‘অ্যালুয়েট’ ও ‘ক্যারোলাস’ আলুর চাষ সম্প্রসারিত হলে আলুর উত্পাদন বাড়বে। কম খরচে কৃষকরা লাভবান হবে। এ ছাড়া ছত্রাকনাশকের আমদানি কমে ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে ছত্রাকনাশকের বিরূপ প্রভাব থেকে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা পাবে।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের খাটুরিয়া সেন্টারপাড়া গ্রামে গত শুক্রবার বিকেলে দেখা গেছে ছোট ছোট প্লটে কৃষকের আলুর আবাদ। কিছু প্লটের আলুগাছ মরে গেছে ছত্রাকের (ষধঃব নষরমযঃ) আক্রমণে। আবার কিছু প্লটের আলুগাছ সজীব-সবল। এ সময় কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেল, দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উত্পাদন কেন্দ্র কৃষকদের দিয়ে এই (সজীব-সবল) নতুন দুই জাতের (অ্যালুয়েট ও ক্যারোলাস) আলুর পরীক্ষামূলক আবাদ করেছে।

সেন্টারপাড়া গ্রামের আলু চাষি আক্কাস আলী (৫৫) বলেন, “ছত্রাকনাশক ব্যবহার না করে পরীক্ষার এসব প্লটে আলু আবাদ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ‘অ্যালুয়েট’ ও ‘ক্যারোলাস’ জাতের আলু ছাড়া অন্য জাতের আলু ছত্রাক আক্রমণে নষ্ট হয়েছে। ”

আক্কাস বলেন, ‘আমি ৩০ শতক জমিতে নিজ উদ্যোগে অ্যালুয়েট ও ক্যারোলাস জাতের আলুর আবাদ করেছি। অন্য জাতের আলুতে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হলেও ওই দুই জাতের আবাদে কোনো ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়নি। ’ ফলনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গোটা ফসল উঠাইনি। যে পরিমাণ উঠিয়েছি তাতে মনে হয় ওই ৩০ শতক জমিতে ৯০ মণ আলু হবে। ’ তাঁর ওই হিসাব অনুযায়ী প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন আলু উত্পাদন হবে।

এ সময় সেখানে মাঠ পরিদর্শনে আসা দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উত্পাদন কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিষ কুমার সাহা বলেন, লেট ব্লাইট (নাবি ধসা) আলুর একটি মারাত্মক রোগ। এ রোগের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ৩০ শতাংশ আলুর ফলন হ্রাস পায়। আর গাছের বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ দেখা দিলে ৮০ শতাংশেও বেশি হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আলুর এ রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রতিবছর পাঁচ হাজার টনের বেশি ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয়। ওই ছত্রাকনাশকের মূল্য ৫০০ কোটি টাকার বেশি, যা সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর।

আশিষ কুমার আরো বলেন, গত বছর ‘অ্যালুয়েট’ ও ‘ক্যারোলাস’ জাতের আলুর প্রথম পরীক্ষায় ভালো ফল পাওয়ার পর এ বছরও পরীক্ষামূলকভাবে চাষিদের মাঝে দেওয়া হয়েছে। দুই বছরের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ছত্রাকনাশক ছাড়াই আলু দুটির ফলন ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষেতে লেট ব্লাইট আক্রমণ করতে পারছে না। লেট ব্লাইট প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন আলুর জাত দ্রুত কৃষকদের মধ্যে সম্প্রসারণ করা হলে ছত্রাকনাশক ব্যবহার কমবে, পরিবেশদূষণ রোধ হবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, বাজারে স্বাস্থ্যসম্মত আলু সরবরাহ নিশ্চিত হবে। তিনি জানান, মালিক অ্যান্ড কম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান হল্যান্ড থেকে ওই দুই আলুর বীজ এনেছে। সেটির পরীক্ষা চলছে।

দেবীগঞ্জ প্রজনন বীজ উত্পাদন কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবিদ হোসেন বলেন, অ্যালুয়েট ও ক্যারোলাস আলু দুই বছরের পরীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, প্রতি হেক্টরে ৩৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত ফলন হচ্ছে। অন্য আলু প্রতি হেক্টরে ১৬ থেকে ১৯ মেট্রিক টন পর্যন্ত হয়। অ্যালুয়েট লাল বর্ণের এবং ক্যারোলাস সাদা বর্ণের মধ্যে লাল চোখের। দুটিই খেতে সুস্বাদু। প্রতিবছর দেশে প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়। অতিমাত্রায় লেট ব্লাইট সহনীয় ওই দুই আলুর আবাদ দেশে ছড়িয়ে পড়লে ছত্রাকনাশক আমদানি করতে হবে না। এতে ৫০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।