ভেড়ার পশমের বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগ

ভেড়ার পশমের বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগভেড়া এক ধরনের বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য রোমন্থক ও জাবরকাটা প্রাণী। এ প্রাণী থেকে মাংস, পশম ও চামড়া পাওয়া যায়। যা মানুষের ব্যবহারযোগ্য। বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক পরিবেশে এরা নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে। খামার সৃষ্টি করে এসব ভেড়া আমাদের দেশে লালন-পালন করা সম্ভব বলে মনে করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৪ লাখ ভেড়া থেকে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন পশম উৎপাদিত হচ্ছে। এই পশমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
সমাজভিত্তিক ও বাণিজ্যিক খামারে দেশি ভেড়ার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য যে প্রথম প্রকল্প নেয়া হয় তাতে মূলত পুষ্টি ও মাংসের চাহিদা পূরণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়। ২০০৮ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ২৭ লাখ ৫০ হাজার ভেড়া থেকে ২ হাজার ৭০০ মে. টন ভেড়ার পশম পাওয়া যায়। একটি ভেড়া থেকে বছরে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার গ্রাম পশম পাওয়া যায়। দেশের দেশি ভেড়া যে ধরনের পশম উৎপাদন করে তা কার্পেট বা মোটা পশমের অন্তর্ভুক্ত। পরীক্ষামূলকভাবে ভেড়ার পশম থেকে বস্ত্র তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা ইতিমধ্যে সফলভাবে কম্বল, চাদর ও শাল তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় ভেড়ার পশম, পাট ও তুলার সংমিশ্রণ করা বিভিন্ন বস্ত্রসামগ্রী বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও বিপণনের পরিকল্পনা নিচ্ছে। এরই প্রেক্ষিতে ২ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ইতিমধ্যে এসব সামগ্রী বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের ক্ষেত্রে কতটুকু ফল পাওয়া যায় তা নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতিমধ্যে তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টন পাট উৎপাদন হয়। আর এই পাটের মধ্যে থেকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টন ব্যবহার হয়। বাকিটা বিদেশে রফতানি হয়। আর ভেড়া পালন করা হচ্ছে ৩৪ লাখ, যা থেকে প্রতি বছর ৩ হাজার ৪০০ টন ভেড়ার পশম উৎপাদন হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ভারত ভেড়ার পশমের বস্ত্রসামগ্রী উৎপাদন করে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কারণ এটা একটি অভিজাত পোশাক। ইউরোপসহ বিভিন্ন শীতপ্রধান দেশে ভেড়ার পশমের তৈরি বস্ত্রসামগ্রী, কম্বল ও চাদরের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেড়ার পশমের বহুমুখী ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আর সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। পরবর্তীতে ভেড়ার পশম, পাট ও তুলা মিশ্রিত সুতা তৈরি করা হয়েছে। আর এ সুতা থেকে শাল তৈরি করা হয়েছে। যার উৎপাদন ব্যয় ২৪৪ টাকা। এর পাশাপাশি সুটিং কাপড়, প্যান্ট পিস, ব্লেজার পিস তৈরি করা হয়েছে। যার উৎপাদন ব্যয় প্রতি মিটারে ৫৮৮ টাকা। এ ছাড়া দেশি ভেড়ার পশম ও পাটের মিশ্রণে তৈরি করা সুতা দিয়ে কম্বল তৈরি করা হয়েছে। যার উৎপাদন ব্যয় ৪৯৫ টাকা।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ভেড়ার শরীর থেকে একেবারে ৭৫০ গ্রামের মতো পশম পাওয়া যায়। এই পরিমাণ পশমকে রং অনুসারে আলাদা করে ধুয়ে নিলে নিট ৪০০ গ্রাম পশম পাওয়া যায়। একটি ভেড়ার শরীরে প্রায় ৭ রঙের পশম হয়ে থাকে। তাই পশমকে কোনো কৃত্রিমভাবে রং করতে হয় না। ভেড়ার পশম ধোয়ার পানি নিয়ে অন্যান্য জামা কাপড়ও ধোয়া যায়। ভেড়ার পশমে এক ধরনের আটালো পদার্থ থাকে, যা দিয়ে ভেড়ার পশম ধোয়া যায়। এর জন্য আলাদা কোনো ডিটারজেন্ট ব্যবহার হয় না।
পশমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে খামারিদের সচেতন করার জন্য প্রকল্পের আওতায় ১১টি কেন্দ্রে নির্বাচিত খামারিদের মাঝে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে খামারিরা ভেড়া থেকে পশম সংগ্রহ করে বাজারজাত করার জন্য সংরক্ষণ করছে। পশমজাত পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এর পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে পশম উৎপাদন সম্ভব হলে একদিকে যেমন দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, বেকারত্ব কমবে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিতে দেশীয় পশমজাত পণ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নয়াগোলা হাটগ্রামে আবদুল খালেক ভেড়ার পশম ব্যবহার করে কম্বল, ওয়ালমেট, পাপোস, জায়নামাজ, আসন ইত্যাদি তৈরি করছে। ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি কম্বল ও চাদর অত্যন্ত নরম। এ পশম দ্বারা তৈরি পোশাকও আরামদায়ক। ভেড়ার পশমের চাদর, কম্বল বা পোশাক শীতের সন্ধ্যায় পড়ার জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নতমানের সাদা ভেড়ার পশমের খুবই চাহিদা রয়েছে। এই জাতের ভেড়ার পশম তুলনামূলকভাবে কোমল ও আশ পাতলা। যা সুতা বুননে অনেক উপযোগী। ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি সামগ্রী ভারতের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে।