ব্যবসা সহজীকরণ বিষয়ে মহাপরিকল্পনা ঘোষণা

বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ আয়ের দেশের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর সেটা খুব দ্রুত এগুতে হবে। সেজন্য ২০২১ সালের পরে মাত্র ২০ বছর সময় পাওয়া যাবে। আর সে লক্ষ্যে যেতে প্রয়োজন ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি। প্রয়োজন ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা। ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করলেই বিনিয়োগ আসবে। এক্ষেত্রে দেশিয় ও বিদেশি দুই ধরনেরই বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। এ বিনিয়োগ আসার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দরকার। যাতে বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেতে পারেন।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসা সহজীকরণ বিষয়ে মহাপরিকল্পনা ঘোষণা হয়। এ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি আব্দুল মাতলুব আহমাদ, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাশেম, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মিস পরাগ, বাণিজ্যমন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জহির উদ্দিন আহমেদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইসুল আলম মন্ডলসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এতে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন বিডা চেয়ারম্যান ও এফবিসিসিআই সভাপতি।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিশ্বব্যাংক ঘোষিত ডুয়িং বিজনেস সূচকে ১৮৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। আগামী ৫ বছরের মধ্যে এটা দুই ডিজিটে বা কমপক্ষে ৯৯তম অবস্থানে আসবে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ব্যবসা শুরু ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় লাগে, এরপর জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশের ছাড়পত্র পেতে হয়রানি, গ্যাস-বিদ্যুত্ সংযোগ না পাওয়াসহ ১০ ধরণের সমস্যায় পড়তে হয় একজন ব্যবসায়ী হওয়ার জন্য।

সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়, এখন থেকে ব্যবসা শুরু জন্য মাত্র সাত দিন সময় লাগবে। আগে সাড়ে ১৯দিন সময় লাগত। অবকাঠামো তৈরির অনুমোদন পেতে আগে যেখানে ২৭৮দিন লাগত এখন সেখানে ৬০ দিন সময় লাগবে। বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে এখন সময় লাগমে মাত্র ২৮ দিন। অথচ আগে এর জন্য সময় ব্যয় করতে হত ৪০৪ দিন। এখন থেকে ব্যবসা শুরুর জন্য স্থাবর সম্পদের দলিল করে নামজারি করতে অল্প কয়েকদিন লাগবে। ব্যাংক ঋণ পাওয়ার জন্য সিআইবি প্রতিবেদন দ্রুত পাওয়া যাবে। একইসঙ্গে মিলবে ব্যাংক ঋণও। সংখ্যালঘুদের বিনিয়োগ রক্ষা করা হবে। ট্যাক্স দেওয়ার প্রক্রিয়া, সময় ও খরচ কমিয়ে আনা হবে। সীমান্ত বাণিজ্য আরো সহজ করার হবে। আইনী জটিলতা কমানোর জন্য এ বিষয়ে আলাদা বেঞ্চ , হাইকোর্ট ডিভিশন গঠন করা হবে। আর এ বিষয়ে প্রতিবেদন ওয়েবসাইটে দিয়ে তা জনগণকে অবহিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করার পাশাপাশি ব্যবসা শুরু ও বর্ধিত করার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করারও ব্যবস্থা নিয়েছে বিডা।

সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল মাতলুব আহমাদ বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসার ক্ষেত্রে দুই তিন জায়গায় বাঁধা পেতে হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় বাঁধা নীতি বার বার পরিবর্তন। যেকোন নীতি পরিবর্তন করতে হলে কমপক্ষে ৫ বছর সময় দিতে হবে। কারণ, একটা ব্যবসা বড় হতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন বছর লাগে। সরকারের কাছে তিনি জোর দাবি করেন এসআরও এর মাধ্যমে নীতি যেন ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে না যায়।

এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমরা বিদেশে যেয়ে বিনিয়োগকারীদের এদেশে নিয়ে আসছি। কিন্তু তাদের যদি ব্যবসার পরিবেশ দিতে না পারি তাহলে সেটা খুব খারাপ হবে, তাদেরকে না আনার চেয়েও সেটা ক্ষতিকর। তিনি বলেন, দেশে কাল টাকার পরিমাণ কত তা মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল। এছাড়া দেশ থেকে কারা টাকা পাচার করছে, কিভাবে করছে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। আর খেলাপী ঋণ রোধের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর হওয়ার কথাও বলেন তিনি।

আবুল কাশেম বলেন, বর্তমানে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) দিক থেকে এশিয়া সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। এছাড়া চীন থেকে যেসব বিনিয়োগ চলে যাচ্ছে সেগুলোকে বাংলাদেশে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, আগে চীন প্লাস ওয়ান বলা হলেও এখন চীন প্লাস থ্রি বলা হচ্ছে। আর এর মধ্যে বাংলাদেশকেও গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে বিদেশিরা। আর এ প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে দেশের ব্যবসার ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো দূর করতে হবে।

মিস পরাগ বলেন, দেশিয় বিনিয়োগ, এফডিআই ও যৌথ উদ্যোগের মধ্যে সবগুলোর বিষয়েই কাজ চলছে। তবে এর মধ্যে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ চলছে।

জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য যা করা দরকার সবগুলোই করার উদ্যোগ নিয়েছে বানিজ্য মন্ত্রণালয়। এখন কোম্পানি আইন পরিমার্জন, পরিবর্তন, সংশোধনের কাজ চলছে। এটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরে এ আইন সংসদে উঠবে বলে আশা করেন তিনি।

রইসুল আলম মন্ডল বলেন, পরিবেশগত ও অবস্থানগত দুটি বিষয়ের উপর লক্ষ্যরেখে অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিয়ে থাকে। ছাড়পত্র পাওয়া সময়সীমা এখন কমে এসেছে। এখন ৭ থেকে ১৫ কর্মদিবস লাগে। এছাড়া অনলাইনে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। যা ব্যবসা শুরু করার জন্য খুবই সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

ব্যবসা সহজীকরণের রোডম্যাপ

বর্তমান অবস্থা লক্ষ্য

ব্যবসা শুরুর সময় ১৯.৫ দিন ৭ দিন

অবকাঠামো নির্মাণে অনুমোদন ২৮৭ দিন ৬০ দিন

বিদ্যুত্ সংযোগ ৪০৪ দিন ২৮ দিন