জার্বেরায় স্বপ্ন বুনছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক

জার্বেরা ফুলে স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক। রাজশাহী গোদাগাড়ীর মোহনপুর ইউনিয়নের বাউটিয়া গ্রামে জার্বেরা ফুল চাষে সফলতা তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করছে। সোসাইটি ফর আন্ডার প্রিভিলেজড ফ্যামিলিজ (সাফ) নামক একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জার্বেরা ফুল চাষ করে সফলতা পেয়েছে। ভারতের পুনে থেকে কন্দ এনে তারা ১ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলক চাষ করেছেন। সংস্থার লক্ষ্য গোদাগাড়ীর কৃষককে এ ফুল চাষে আগ্রহী করে তুলে অর্থনৈতিকভাবে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলা। তাদের এ সফলতায় এলাকার অনেক কৃষক জার্বেরা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
সাফ সংস্থার ম্যানেজার এনামুল হক মাসুদ জানান, জার্বেরা চাষ যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি লাভজনকও। এ ফুল চাষ করতে হলে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে সাড়ে ৫ হাজার কন্দ রোপণ করতে হয়। আর এ কন্দগুলো অনেকটা আদার মতো দেখতে। একটি কন্দের দাম গড়ে ৪৫ টাকা। আর একটি কন্দ থেকে সাত থেকে আটটি শাখা বের হয় । একবার চাষ করলে ৪ বছর একই গাছ ফুল দিয়ে থাকে। একটি গাছের ঝাড় থেকে প্রতি বছর গড়ে ৪০টির বেশি ফুল পাওয়া যায়। বাজারে একটি জার্বেরা ফুলের দাম ২ টাকা। সে হিসাবে একটি কন্দের গাছ থেকে বছরে প্রায় ৮০০ টাকার ফুল পাওয়া যায়। ১ বিঘা জমিতে সার, কীটনাশক, বীজ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে তিনগুণের বেশি লাভ পাওয়া যায়।
চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে মাসুদ বলেন, পাঁচ থেকে ছয়টি চাষ দিয়ে মাটি টুকরো করে বেড তৈরি করতে হয়। প্রতিটি চাষে পরিমাণমতো বালি এবং ছাই ছিটিয়ে দেয়ার পর ৭০ থেকে ৮০ বস্তা নারিকেলের গুঁড়া ছোবড়া মাটির সঙ্গে মিশ্রণ করতে হয়। ছোবড়া মাটিতে মিশ্রণ করলে ফুলের গাছের শেকড় দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে গাছ সুন্দর, স্বাস্থ্যবান হয় এবং প্রতিনিয়ত ফুল দিতে থাকে। তিনি বলেন, বিঘাপ্রতি ৫০ কেজি হাড়ের গুঁড়া, ২০০ কেজি কেঁচো সার, ৫০ কেজি টিএসপি সার, এমওপি ৫০ কেজি এবং রোবন ও দস্তা ২ কেজি করে প্রয়োগ করতে হবে। কন্দ রোপণের ১০ থেকে ১২ দিন আগে সব ধরনের সার দিয়ে জমি তৈরি করে রেখে দিতে হবে। রাসায়নিক সার গাছের পাতা গজানোর পর দিতে হবে। প্রতি মাসে একবার কিংবা প্রয়োজনে দুইবার দুই বস্তা কেঁচো সার, পনেরো কেজি হাড়ের গুঁড়া ও ২৫ কেজি ডিএপি সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে ইউরিয়া সার ও ৫ থেকে ৭ কেজি পটাশ সার দেয়া যেতে পারে। এছাড়া সামান্য ইউরিয়া ও পটাশ সার দিয়ে ১৫ কেজি সরিষার খৈল ভিজিয়ে পচিয়ে সারিতে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
তাছাড়া সপ্তাহে একবার করে সেচ প্রয়োগ করতে হবে। সেচের পানি যেন জমিতে আটকে থাকেত না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেই সঙ্গে গাছ যেন অতিবৃষ্টি ও অতিখরায় নষ্ট হতে না পারে, তার জন্য গাছের ওপর শেড তৈরি করে দিতে হবে। শেডের কারণে ফুলের রঙ কোনোভাবেই বিকৃত হয় না। বাঁশ কিংবা সিমেন্টের খুঁটি ও মোটা পলিথিন বা ঘন নেট দিয়ে এ শেড তৈরি করা যায়।
মাসুদ বলেন, এ ফুলের রোগবালাই তেমন হয় না। তবে কিছু ছত্রাক আক্রমণ করে থাকে। এ ফুলের বড় সমস্যা হচ্ছে মাইডস পোকা, যা কচি পাতা চুষে নেয়। এ কারণে পাতা কুঁকড়ে যায়। বাজারে প্রচলিত ছত্রাকনাশক ১০ দিন পরপর জমিতে স্প্রে করলে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে বছরে ১০ থেকে ১২ বার কীটনাশক স্প্রে করতে হয়। পাতা বেশি হয়ে গেলে ৩ মাস অন্তর তা ভেঙে দিতে হবে।
এতে ফুল বড় হয়। এ ফুলের গাছ বেশি পানি ও শুষ্ক সহ্য করতে পারে না বিধায় সবসময় হালকা করে ভিজিয়ে রাখতে হবে। জার্বেরা ফুল বিশ্বে ৩০ ধরনের হলেও বাংলাদেশে মাত্র পাঁচটি জাতে জার্বেরা চাষ হচ্ছে।