প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করছে

অর্থনীতি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিক গ্রোথ সেন্টারের ভিজিটিং ফেলো হিসেবে উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ গুস্তাফ রানিসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। তাঁর পলিসি অ্যান্ড রিফর্ম ওয়ার্ক ১৯৯১ সালে ‘দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ডেভেলপমেন্ট পলিসি চেঞ্জ’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি জাতিসংঘের প্রথম মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশেও যুক্ত ছিলেন। বেসরকারি খাতের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘ ২৬ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি ডজনখানেক দেশে কাজ করেছেন। ২০০৭-১০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের বিনিয়োগ পরিবেশ-বিষয়ক প্রকল্পে বাংলাদেশের গবেষণায় যুক্ত হন। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মাধ্যমে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, সরকার ও ব্যবসায়ীদের কাঠামোবদ্ধ সংলাপ, অর্থনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার প্রভাব, উন্নয়নের বিকল্প ভাবনা নিয়ে বিস্তর কাজ করেছেন তিনি। বিশ্বব্যাংকের বহু দেশীয় একটি প্রকল্পে তিনি যুক্ত রয়েছেন।

সাক্ষাত্কার নিয়েছেন এম এম মুসা

বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নিয়মকানুন কেমন হওয়া উচিত?

ব্যবসা শুরু থেকে পরিচালনা পর্যন্ত, এমনকি ব্যবসা গুটিয়ে ফেললেও বিভিন্ন ধরনের সরকারি নিয়মকানুন মানতে হয়। শুধু একটি সাধারণ পারমিট পেতেই অনেক সময় লেগে যেতে পারে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে অনিশ্চয়তা। নিয়মে হয়তো বলা আছে, একটি বিদেশী কোম্পানি তাদের মুনাফা রেমিট করতে পারবে, কতটুকু পারবে এবং কীভাবে পারবে। কিন্তু আইনে তো বেশি বিস্তারিত লেখা থাকে না। একটা পর্যায় পর্যন্ত লেখা থাকে। এখন ব্যবসায়ী যখন তার সমস্যা নিয়ে কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছে যান তখন তা কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। একেকজন কর্মকর্তা একেকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন। যেভাবে সহজে কাজটা হওয়ার কথা ছিল, কাগজে যেভাবে লেখা ছিল, সেভাবে অধিকাংশ সময় হয় না। এটি শুধু আমাদের দেশে নয়, বাইরের দেশেও হয়। একেক কর্মকর্তা আইনকে একেকভাবে ব্যাখ্যা করায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় সমস্যা। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, কী নিয়মকানুন আছে অনেক সময় ব্যবসায়ীরা হয়তো তাও জানেন না। ধরুন, কোনো ব্যবসায়ী একটি রেস্টুরেন্ট খুলবেন। কী কী বিষয়ে পারমিট নিতে হবে, কার কাছে যেতে হবে— এ সম্পর্কে হয়তো আংশিক জানেন, পুরোটা নয়। এ ধরনের অনেক সমস্যা রয়েছে। আবার অনেক আইন রয়েছে, যা এখন আর প্রযোজ্য নয়।

অনেকেই হয়তো জানেন না, আমাদের কুরিয়ার খাতটি অনেক দিন বেআইনি ছিল। কিন্তু কেউ এটি টের পায়নি। একজনের নজরে এসেছিল যে, আইনে রয়েছে একমাত্র পোস্টাল সার্ভিস ছাড়া কেউ কোনো ধরনের চিঠিপত্র বিলি করতে পারবে না। অর্থাত্ কুরিয়ার সার্ভিস অনুমোদিত নয়। এটি নজরে আসার পর আইন সংশোধনপূর্বক নতুন আইন জারি করা হলো। কিন্তু এমন অনেক আইন রয়েছে, যেগুলো হয়তো ১০০ বছরের পুরনো। যেমন— আমাদের কোম্পানিজ অ্যাক্ট ১০০ বছরের পুরনো। অবশ্য এটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। অনেক আইন আউটডেটেড হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় হয়তো আইনও নেই। সম্ভবত ডিজিটাল সিগনেচার আইন দু-তিন বছর আগে হয়েছে। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গেলে যে আইনি কাঠামো দরকার, আমাদের সেটিও নেই। অনেক জায়গায় অনেক বেশি নিয়মকানুন রয়েছে, অনেক জায়গায় আউটডেটেড নিয়মকানুন রয়েছে এবং অনেক জায়গায় নিয়মকানুনই নেই। একজন প্রশ্ন করেছিলেন, গাড়িতে ব্রেক থাকে কেন? আমরা বলেছিলাম, গাড়ি থামানোর জন্য। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, না। গাড়ি যেন দ্রুত চলতে পারে সেজন্য। বিষয়টি কিন্তু ঠিক। কারণ গাড়িতে যদি ব্রেক না থাকত, তাহলে বেশি জোরে গাড়ি চালানো যেত না। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে অনেক ধরনের সুযোগ আসবে। কিন্তু এগুলো নতুন ধরনের বিষয়, নতুন ধরনের প্রযুক্তি, নতুন ধরনের পণ্য। এ সুযোগ নিতে পারব কিনা, নিয়ম অনুমোদন করবে কিনা, তা কিন্তু আমরা জানি না। নিয়ম না থাকলে আমি হয়তো ওই পথে এগোব না। কারণ না জানি কি গণ্ডগোলে পড়তে হবে। অনেক সময় নিয়মকানুনের প্রয়োজন হয় মানুষকে ক্ষমতায়নের জন্য। এ বিশ্বায়নের যুগে হরেক রকমের সুযোগ আমাদের জন্য আসবে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হলে এমন আইনি কাঠামো থাকতে হবে, যা আমাদের নতুন ধরনের কাজ করার অনুমোদন দেবে। এটি করতে গিয়ে আবার বিপদে পড়ব কিনা, এমন ভয় যেন তৈরি না হয়। আইন সংস্কার বাংলাদেশে হয়, কিন্তু অ্যাডহকভাবে। হয়তো কোনো ঋণদাতা চাপ দিল, সরকারের ভেতর থেকে উদ্যোগ নেয়া হলো বা ব্যবসায়ী মহল বললে কিছু বিষয় সহজ করা হলো কিংবা পরিবর্তন করা হলো। অনেক সময় দেখা যায়, একটি বিষয় সহজ করা হলো, কিন্তু সরকারের আরেকটি অংশ এমন একটা কিছু করল, যা আবার ওটাকে কন্ট্রাডিক্ট করে, অনেক সময় হয়তো ইচ্ছা করে করা হয়। যেহেতু এখানে ক্ষমতা কমে গেছে, তাহলে অন্যদিক দিয়ে ধরি। এ রকম প্রচুর হয়। এটি অন্য দেশেও হয়। আমাদের এখন সিস্টেমিক লেভেলে চিন্তা করতে হবে। প্রথমে চিন্তা করতে হবে কীভাবে নতুন আইন, রেগুলেশন তৈরির প্রক্রিয়াটি আরো উন্নত করা যায়। যাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে, তাদের একটি সুযোগ দিতে হবে প্রস্তাবিত নতুন আইন নিয়ে মতামত দিতে। বাংলাদেশে যে একেবারে এটা হয় না, তা নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশে, উন্নত দেশ তো বটেই, উন্নয়নশীল দেশে এটি আরো সিস্টেমাইজ করা হয়েছে। কমপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মকানুনের বিষয়ে আগাম নোটিস দেয়ার নিয়ম রয়েছে। খসড়া ভালোভাবে প্রচার করা হয় এবং যথেষ্ট সময় দেয়া হয় এটি পড়ে মতামত জানানোর জন্য। কোন মতগুলো সরকার গ্রহণ করল আর কোনগুলো করল না, এর বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এটি হচ্ছে স্বচ্ছতা।

আরেকটি হচ্ছে নিয়ম করার আগে প্রভাব মূল্যায়ন। প্রথম হচ্ছে সমস্যাটা কী। এ সমস্যার জন্য কি রেগুলেশন দরকার, না অন্য কোনোভাবে দূর করা যায়। যদি রেগুলেশনই দরকার হয়, তবে সরকার কি এটি বাস্তবায়ন করতে পারবে, নাকি অসততার সুযোগ তৈরি হবে। এ ধরনের কয়েকটি প্রশ্ন করা, যেগুলোকে ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বলা হয়। এমনটা করার নজির আমাদের দেশে খুব একটা নেই। এটি করা যেতে পারে। কমপক্ষে কিছু নিয়মকানুন দিয়ে আমরা শুরু করতে পারি। যে মিনিস্ট্রি স্পন্সর করছে, তাদের কিছুটা জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কেন তারা আইন করছে, তা জাস্টিফাই করতে হবে। এর পর নিয়মকানুন তৈরির পর সবাই যেন সেটি জানতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। আবার যখন এগুলো বাস্তবায়ন করা হবে, তখন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিতে হবে। এভাবে কাজ করাকে আমি বলছি রেগুলেটরি সুশাসন। আমাদের এখন রেগুলেটরি সুশাসনের দিকে যেতে হবে। রেগুলেটরি সুশাসন কীভাবে উন্নত করব, তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। এখন দেশে অ্যাডহক পদ্ধতিতে সংস্কার হচ্ছে, যা না করে সিস্টেমিক দিকগুলোয় আরো নজর দেয়া দরকার।

বিদেশী অর্থ নেয়ার সীমা বাড়ানো উচিত কি?

মনে করুন, আপনি এখন সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিলেন। এ নিয়ে অন্য কারো দ্বিমত থাকতে পারে। তাহলে এটি নিয়ে আলোচনা হোক। আপনি প্রস্তাব দিলেন, আর পদধারী বললেন দরকার নেই, কোনো আলোচনা হলো না। বাংলাদেশে এ রকমই হয়। কিংবা আপনি খুব প্রভাবশালী, আপনি বললেন আর হুট করে হয়ে গেল। এর কোনোটিই কাম্য নয়। এটি নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

কাজের প্রক্রিয়াটা কেমন হবে?

কিছু কিছু বিষয় রয়েছে, যা খুব স্পর্শকাতর। হয়তো পুরো ব্যবসায়ী সমাজ এর বিরুদ্ধে থাকে। আলোচনা করলেই সব সমস্যা সমাধান হবে, এমনটা বলছি না। কিছু কিছু বিষয় থাকবে, যার জন্য ব্যবসায়ীরা ফাইট করে যাবেন, আবার কিছু বিষয়ের জন্য সরকার। তবে অনেক কিছুরই সমাধান হবে। আমরা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হয়েছি বলে গর্ববোধ করছি। এটি পরিসংখ্যানগত দিক থেকে। কিন্তু আমরা কি মধ্যম আয়ের দেশের মতো আচরণ করছি? একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে সরকারের প্রক্রিয়া কেমন হবে বা ব্যবসায়ীদের আচরণ কেমন হবে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা শুরু করতে পারি। নিয়মকানুন করার সময় ডিসিপ্লিন মেনে চলা, যে নিয়মকানুনগুলো করা হয়েছে, তা স্বচ্ছভাবে সবাইকে জানানো, সরকারের সেবা সম্পর্কে ফিডব্যাক নেয়া— এগুলোকে আমি বলব মধ্যম আয়ের দেশের আচরণ।

বেসরকারি খাতেরও তো জবাবদিহিতা থাকা উচিত

নিশ্চয়ই। বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত নিয়ে একটা কাজ করেছিলাম। আমরা সবাই জানি, টেক্সটাইলের কারণে পরিবেশ দূষণ হয়, প্রচুর পানি অপচয় হয়। ফ্যাব্রিক তৈরি করতে যতটুকু পানি দরকার, তার চেয়ে দু-তিন গুণ পানি ব্যবহার করা হয়। কারণ পানির তো বিল নেই, পাম্প করে ওঠাতে যা খরচ। কিন্তু খুব সহজেই এটি কমিয়ে আনা যায়। আমাদের বিশ্লেষকরা প্রতিবেদন দিয়েছেন, এভাবে কমানো যেতে পারে। এর পর অনেকে কমাচ্ছেন। আমরা তো ১০০টি ফ্যাক্টরিতে এটি দেখালাম। এখন এটিকে আস্তে আস্তে পুরো টেক্সটাইল সেক্টরে ছড়িয়ে দেয়া বেসরকারি খাতের নিজের দায়িত্ব হওয়া উচিত। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর এ দায়িত্ব পালন করা উচিত। নিয়মকানুন কীভাবে আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তা নিয়ে সরকারকে চিন্তাভাবনা করতে হবে। তবে ব্যবসায়ীদের নিজ উদ্যোগেই এগিয়ে আসা উচিত।

বিশ্বায়নের ফলে যে সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা কীভাবে ব্যবসায়ীরা কাজে লাগাতে পারেন?

সুযোগের একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়। আগে একটি পণ্য হয়তো একটি দেশেই তৈরি করা হতো, এখন এর অংশবিশেষ বিভিন্ন দেশে তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশে হয়তো একটি পণ্যের পুরোটা তৈরির ক্ষমতা নাও থাকতে পারে, কিন্তু একটি অংশ তৈরি করার ক্ষমতা থাকতে পারে। ওই অংশ তৈরিতে হয়তো এখানে ব্যয় কম হবে, হয়তো আমাদের দক্ষ লোক রয়েছে। বিশ্ববাজারে ওইটুকুই করতে পারলে বিশাল বাজার। হয়তো ওই অংশটুকু কয়েক বিলিয়ন ডলারের বাজার হতে পারে। আমরা এটিকে বলি গ্লোবাল ভ্যালু চেইন। এ চেইনে কীভাবে আমরা সংযুক্ত হব, তা একটি বিরাট প্রশ্ন। এ সুযোগগুলো গ্রহণ করতে হলে আমাদের দেখতে হবে পলিসি ও রেগুলেটরি কাঠামোয় কোথায় দুর্বলতা রয়েছে। যেভাবে গ্লোবাল ভ্যালু চেইন ডেভেলপ করা হচ্ছে, তাতে অনেক জায়গায় বাংলাদেশ প্রবেশ করতে পারবে। এজন্য প্রথমে কোথায় সুযোগ রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে। তবে ব্যবসায়ীদের কিছু করতে হলে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে গবেষণা করা উচিত। এর পর দেখতে হবে সুযোগ নিতে হলে বাধাগুলো কী। সরকারের রেগুলেশন, ব্যবসায়ীদের দক্ষতা, ব্যাংক থেকে শুরু করে আদালত পর্যন্ত আমাদের কী কী দুর্বলতা রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।

অনেকে বলেন, রেগুলেশন কমলে ভালো হবে, আবার অনেকের মতে রেগুলেশনের মধ্যেই ভালো করা সম্ভব। আপনি কোনটা সমর্থন করেন?

এর কোনো হ্যাঁ-না উত্তর নেই। এখন যে ধরনের রেগুলেশন হয় বা যেভাবে এনফোর্স করা হয় এবং যে সমস্যাগুলোর কথা বলেছি, তা এ সুযোগ ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। যে রেগুলেশন রয়েছে, তা হালনাগাদ করা এবং যে নতুন রেগুলেটরি ইস্যুগুলো আসতে পারে, তা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানার জন্য সরকারের একটি প্রক্রিয়া থাকতে হবে। এগুলো যোগ করার নমনীয়তা থাকতে হবে। এটি এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। অন্যদিকে নিয়মকানুন না থাকা আরেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এছাড়া ব্যবসায়ীদের থেকে বেরিয়ে পুরো সমাজের কথা চিন্তা করা। নতুন পথ গ্রহণ পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলবে কিনা, সমাজে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা, এটি দেখতে হবে। অনেক সুযোগের ইতিবাচক দিকের সঙ্গে নেতিবাচক দিকও থাকতে পারে। এজন্য যে সেটি করা যাবে না, তা নয়। বরং নেতিবাচক দিক ম্যানেজ করে কাজটি করতে হবে। এর জন্য একটা বিশ্লেষণ দরকার। মুখ ফিরিয়ে নিলে হবে না। হয়তো অন্য দেশে এটি চালু হয়েছে। অন্য কোনো দেশ সমস্যার সমাধান করেছে খোলা মন নিয়ে। যদি খোঁজ করি, তাহলে আমাদের রেগুলেটরি ব্যবস্থাকে অনেক আধুনিক করতে হবে এবং তখন হরেক রকম সুযোগের সদ্ব্যবহার আমাদের ব্যবসায়ীরা করতে পারবেন এমন পথে, যা সমাজের জন্য ভালো হবে।

বিনিয়োগকারীরা কম বিনিয়োগের জন্য দুর্বল অবকাঠামো, বিদ্যুত্ সংকট ও সুদের উচ্চহারের কথা বলেন। সম্প্রতি সুদের হার কমে এসেছে। কিন্তু বিনিয়োগ বাড়ছে না। এটা কেন?

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৫০টির ঊর্ধ্বে, কিন্তু সেই অর্থে প্রতিযোগিতা নেই। প্রতিযোগিতা হলে স্প্রেড কমে আসার কথা। প্রতিযোগিতা নীতির মাধ্যমে প্রতিযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া নন-পারফর্মিং লোন কমানো গেলে স্প্রেড কমানো যাবে। আর আগে যেসব সমস্যার কথা বললাম, সেগুলো থাকলে তো বিনিয়োগ বাড়বে না। অবকাঠামোসহ অন্যান্য সমস্যা থাকলে সুদের হার কম হলেও বিনিয়োগ বাড়বে না। সুদের হার কতটুকু বাধা দিচ্ছে, আর অন্য সমস্যাগুলো কতটুকু বাধা তৈরি করছে, তা নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন সময় ব্যবসায়ীরা প্রণোদনাসহ বিভিন্ন ছাড় চান। প্রণোদনা কি কাজে দিচ্ছে, নাকি খামাখাই দেয়া হয়েছে— এসব নিয়েও গবেষণা হয়নি। কেন ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করছেন না, এর একটি ভালো গবেষণা সেভাবে হচ্ছে না।

অনেকে বলেন, বাংলাদেশে যে ব্যবসায়ী শ্রেণী তৈরি হয়েছে, তার পেছনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কাজ করেছে। এখন সরকার করছে না তাই উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না

এটা হতে পারে। যেমন— গার্মেন্টসের ভেতরেই বহুমুখীকরণের সুযোগ রয়েছে। পোশাক কারখানার মালিকরা যে বলেন তাদের মার্জিন খুব কম, এটি ঠিক। এ মার্জিন দিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, নিরাপদ ভবন প্রতিষ্ঠা, কর্মপরিবেশ উন্নতি সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি গার্মেন্টসের মধ্যেই হায়ার ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্টের মধ্যে যাই, তবে মার্জিন অনেক বেড়ে যাবে, কিন্তু ব্যয় অতটা বাড়বে না। তাহলে প্রশ্ন, যায় না কেন? এর একটি ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমাদের গার্মেন্টস খাত একটি কমফোর্ট জোনের মধ্যে ঢুকে গেছে। মার্জিন কম হলেও ব্যবসা ভালোই চলছে। এ কমফোর্ট জোন থেকে আমরা বের হতে চাইছি না।

তৈরি পোশাক খাত থেকে সরকারের ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া উচিত কি?

যে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে, তা আসলেই দরকার কিনা, কমপক্ষে এর একটি বিশ্লেষণ হওয়া দরকার। আরেকটি কাজ করতে পারে সরকার, এক বছরের জন্য সুবিধা প্রত্যাহার করে দেখতে পারে, কী প্রভাব পড়ে। মধ্যম আয়ের দেশের ব্যবহার হচ্ছে সুকৌশলী। সিঙ্গাপুর কেন এত ভালো করল? কারণ তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি সাধারণ স্লোগান ছিল ‘থিংক অ্যাহেড’— আরো ১০ বছর পর কী হবে, তা নিয়ে অগ্রিম চিন্তা করা, ‘থিংক অ্যাক্রস’— সবকিছুর সঙ্গে সবকিছুর সংযুক্তি রয়েছে, সেটি মনে রাখা। আর ‘থিংক অ্যাগেইন’, যেমন— এত দিন ধরে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে তা আসলেই দরকার কিনা। ইপিজেডগুলোয় জমি সস্তায় না দিলে কি বিনিয়োগ আসত না? বহুগুণ বাড়ালেও আসত। কিন্তু আমরা দ্বিতীয়বার চিন্তা করে দেখিনি। যে নীতি একবার প্রণয়ন করা হয়েছিল, তা এখনো প্রাসঙ্গিক কিনা, সে প্রশ্ন আমরা করিনি।

অনেক পণ্য রয়েছে, যেগুলো আমদানি করতে উচ্চশুল্ক দিতে হয়। কিন্তু দেশে ওই পণ্যগুলোর উন্নতি হচ্ছে না

একটি শিল্প যখন গড়ে উঠছে, তখন সুরক্ষার দরকার হয়। অনেকটা শিশুকে হাঁটতে শেখানোর মতো। পূর্ব এশিয়ায় যেমন বলা হচ্ছে, তুমি যখন একটু বড় হয়ে যাবে, তখন আমি হাত ছেড়ে দেব অর্থাত্ সুরক্ষা উঠিয়ে নেয়া হবে। এর পর যদি তুমি টিকে না থাকো, তাহলে বুঝতে হবে, তোমার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নেই। কিন্তু বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই তা হয় না। একবার সুরক্ষা চালু করা হলে তা চলতেই থাকে। ফলে যারা বিদেশে গিয়ে প্রতিযোগিতা করতে পারত, তারা তো আর কষ্ট করবে না। ভয় থাকে, সুরক্ষা সরিয়ে নিলে হয়তো শিল্পটা ধসে যাবে, বহু লোকের চাকরি চলে যাবে। ২০ বছর আগে হয়তো এভাবে চিন্তা করা যেত, কিন্তু অর্থনীতি যেমন গতিশীল হয়েছে, তাতে একটি শিল্প সংকুচিত হলে আরেকটি দ্রুত দাঁড়িয়ে যাবে। আদমজী পাট কলের কথা ধরা যাক। এটি যখন বন্ধ হলো, তখন ২০ হাজার শ্রমিকের চাকরি চলে যায়। সেই জমিতে এখন আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে এরই মধ্যে ৪৬ হাজার লোকের চাকরি হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো হবে।

ভোক্তারাও তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন

এ দিকটা তো রয়েছেই। এসব সুরক্ষা নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা উচিত। ব্যবসায়ীরা একবার সুরক্ষা বা প্রণোদনা পেলে তারা তো স্থায়ীভাবে সেটি পেতে চাইবেন, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু অর্থনীতির জন্য, ভোক্তাদের জন্য, সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর জন্য তা ভালো কিনা, তা চিন্তা করে দেখতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে দেশে আরো গবেষণা, আরো আলোচনা, আরো বিতর্ক হওয়া দরকার।

অনেকে অলাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি করছেন। এ বিষয়ে আপনার মত কী?

একটি উদাহরণ তুলে ধরি, টেলিটক তো সরকারি প্রতিষ্ঠান। এখন যদি জিজ্ঞাসা করি, টেলিটকের দরকার আছে কি? যেখানে আমরা মোবাইল ফোনে প্রতিযোগিতা অনুমোদন করেছি, বেসরকারি সেলফোন কোম্পানিগুলোর মান ও সেবাও বলতে গেলে ভালো, সেখানে কী গ্যাপ রয়েছে, যা সরকারি এ প্রতিষ্ঠান পূরণ করছে? কোথায় সরকারকে দরকার আর কোথায় তার যাওয়া উচিত নয়, তা নিয়ে যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক আলোচনা দরকার। সরকার যদি নিজে কোনো ব্যবসা করে, তবে সরকারের কিছু লোকের মনোযোগ তো সেখানে যাবে। সরকারের আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যেমন বিশ্বায়নের যুগে আমাদের কী ধরনের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; আমাদের ব্যবসায়ীরা, আমাদের উদ্যোক্তারা কীভাবে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারেন, তাদের বাধাগুলো কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করা। অন্যত্র দৃষ্টি দেয়ায় এ কাজগুলো অবহেলিত হচ্ছে। অনেক কাজ রয়েছে, যা বেসরকারি খাতকে দিয়ে করানো যায়। দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অর্থনীতি বহুমুখী করা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো কাজগুলো বেসরকারি খাতকে দিয়ে করানো যেতে পারে। এ কাজ করাতে সরকারকে সতর্কতা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে কিছু নীতি প্রণয়ন করতে হবে। এ নীতি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। টেলিটকের মতো কোম্পানি চালাতে যে সময় যাচ্ছে, তার বদলে এ নিয়ে চিন্তা করলে আরো ভালো ফল পাওয়া যাবে।

দেখা যায়, রফতানি করা আর দেশের বাজারে ছাড়া একই পণ্যের মানের তারতম্য থাকে। বাইরে অপেক্ষাকৃত ভালোটা পাঠানো হয়। কিন্তু দাম আবার কাছাকাছি থাকছে

এখানে নিয়মকানুন কার্যকরের বিষয়টি আসছে। আমাদের এখানে এখনো যেহেতু সুশাসন ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই এ সমস্যা সমাধানে সৃজনশীল সমাধানের পথ অবলম্বন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন— কোনো পণ্য খারাপ হলে তার ছবি তুলে আপলোড করে দেয়া যেতে পারে। এটি করলে ওই কোম্পানির ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

বিশ্বায়নের কারণে দ্রুতগতিতে প্রযুক্তি খাতে উন্নতি হচ্ছে, আমরা হয়তো মনে করব, এসব প্রযুক্তি উন্নত দেশের জন্য প্রযোজ্য, আমাদের জন্য নয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উল্টোটা বরং প্রযোজ্য। মোবাইল ফোনের কারণে আমাদের দেশের গরিবরা কিন্তু উপকৃত হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি করছে। এ সুযোগ কাজে লাগানোর মাধ্যমে আমরা আমাদের অর্থনীতি বহুমুখী করতে পারব। আমাদের দেশে এখন যথেষ্ট এন্ট্রাপ্রেনিউরিয়াল ডায়নামিজম সৃষ্টি হয়েছে। এখন সরকারের নিয়মনীতি নিয়ে আধুনিকভাবে চিন্তাভাবনা করা দরকার।

নতুন যেসব ব্যবসায়ী আসছেন, তাদের নিয়ে আপনার মত কী?

আমার মনে হয়, আধুনিক প্রযুক্তি বা চর্চা নিয়ে তাদের অনেক ধারণা রয়েছে। অনেকে নতুন কিছু করতে চান। নতুন কিছু করতে গিয়ে নিরুত্সাহিত হয়ে আবার কমফোর্ট জোনের মধ্যে চলে যান কিনা, তা নিয়ে সমীক্ষা চালানো উচিত।

মধ্যম আয়ের দেশের জন্য কী ধরনের বেসরকারি খাত আমাদের প্রয়োজন? বেসরকারি খাত ও সরকারকে কোন দিকগুলোর প্রতি নজর দিতে হবে?

কোথায় কোন সুযোগ রয়েছে, তা খুঁজে বের করা। সরকারকেই করতে হবে, তা নয়; থিংক ট্যাংক দিয়েও করা যেতে পারে। তবে সরকারের ভেতর ন্যূনতম কিছু ক্ষমতা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত. নীতি ও নিয়মকানুন প্রণয়নের প্রক্রিয়া আরো সফিস্টিকেটেড করতে হবে। তৃতীয়ত. কো-অর্ডিনেশন, সরকারের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এর অভাবে অনেক সমস্যা হয়। যেমন— সরকারের একটি অংশ ভালো করলে অন্য অংশ পিছিয়ে থাকছে, আবার কখনো উল্টো কাজও করছে। কো-অর্ডিনেশন, জ্ঞানের আদান-প্রদান আরো উন্নত করতে হবে। এখানেও কিন্তু প্রযুক্তি অনেক সাহায্য করবে। আবার যেসব নীতি তৈরি করা হয়েছে, তা আসলেই কার্যকর হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করতে হবে। বিশ্লেষণ করে করে এগিয়ে যাওয়া মধ্যম আয়ের দেশের একটি বৈশিষ্ট্য। ব্যবসায়ীদের প্রতি পরামর্শ হচ্ছে, প্রথমে কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দ্বিতীয়ত. সমস্যা ও এর সমাধান আরো বৈজ্ঞানিকভাবে হতে হবে। আরেকটি হচ্ছে সেলফ রেগুলেশন। পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ কর্মস্থল প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিকদের ভালো কর্মপরিবেশ দেয়া ইত্যাদির দায়িত্ব নিজেদেরই ঠিক করতে হবে।