উত্পাদনমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা

আগের মতোই বেসরকারি খাতে ঋণ জোগানের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াতে পারে

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে প্রাক্কলিত অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবৃদ্ধির মাত্রা দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথেই রয়েছে। আর বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কৃষিখাত, শিল্প ও সেবার খাতের উত্পাদন কর্মকাণ্ড ও রপ্তানি অব্যাহত ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদায় তেজিভাব জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করবে।

 

চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) দ্বিতীয়ার্ধের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এসব বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। আগের কয়েকটি মুদ্রানীতির প্রকৃতির মতোই এবারের মুদ্রানীতির প্রকৃতিও একই রকম। তবে এবারের মুদ্রানীতিতে সতর্ক বা সংকুলানমূলক কোনো কিছু বলেই আখ্যায়িত করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।

 

গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ফজলে কবির মুদ্রানীতির ঘোষণা করেন। গভর্নর হিসেবে ফজলে কবির দ্বিতীয়বারের মতো মুদ্রানীতি ঘোষণা করলেন। বরাবরের মতো এবারো গতানুগতিক ও প্রথাগতভাবে এ মুদ্রানীতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে নতুন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সামাজিক দায়বোধ সম্পন্ন অর্থায়ন নীতিবোধের বিষয়টি। মুদ্রানীতির ঘোষণার সময় গভর্নর বলেন, নতুন এ নীতিবোধের মাধ্যমে আর্থিক খাত গ্রোথিত করবার চলমান প্রচেষ্টাকে বেগবান করবে। বলা হয়, নতুন নীতিবোধের মাধ্যমে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) বাস্তবায়নের জন্য সরকারের অগ্রাধিকার খাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ অর্থায়ন করা হবে। সবুজ উদ্যোগ নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়াবে। আর যা নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, নতুন নতুন কর্মসংস্থান ও পরিবেশ সংরক্ষণ করতে সহায়ক হবে।

 

গতকালের অনুষ্ঠানে গভর্নরের পাশাপাশি গভর্নরের সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ফয়সাল আহমেদ, ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, এসএম মনিরুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, চেইঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অ্যাডভাইজার মো. আল্লাহ্ মালিক কাজেমী, সিনিয়র অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ফয়সল আহমেদ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। এছাড়া অনুষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালকসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

 

লিখিত বক্তব্যে ফজলে কবির বলেন, দেশের অর্থনীতি ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষের ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। আর বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের জন্য প্রণীত মুদ্রানীতির ভঙ্গি প্রথমার্ধের উত্পাদন সহায়ক সতর্ক নীতিভঙ্গিতেই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। গেল মুদ্রানীতিতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান নির্ধারণ করা ছিল যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে ঋণের এই লক্ষ্যমাত্রাগুলোও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সঙ্গত কারণে সরকারি ঋণের জোগান এবং রিজার্ভ ও ব্যাপক মুদ্রার সররবাহের লক্ষ্যগুলোও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে গভর্নর বলেন, ঋণ প্রবৃদ্ধির এই জোগান চলতি অর্থবছরে সরকার প্রক্ষেপিত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের, এমনকি এই লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রমের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত হবে। বাজেটের ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ হ্রাস ব্যক্তি খাতের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের জোগান সুগমতর করেছে বলে জানান গভর্নর। তবে সঞ্চয়পত্রে সরকারের ঋণ বাড়ায় দেশে বন্ড বাজারের বিকাশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।

 

গভর্নর জানান, উত্পাদনমুখী কর্মকাণ্ডের জন্য মুদ্রানীতি কার্যক্রমে পর্যাপ্ত অর্থায়নের সংস্থান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অর্থায়ন যাতে সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ, অন্তর্ভুক্তি, পরিবেশবান্ধব ভিত্তিতে সমাজের সব স্তরের জনগোষ্ঠীর উত্পাদন কর্মকাণ্ডে সমর্থন জোগায় সে বিষয়ে বিবিধমুখী উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।

 

গেল মুদ্রানীতিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতে ঋণের জোগানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ও বেসরকারি খাতের ঋণের জোগান বেড়েছে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ ও ১৫ শতাংশ। তা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধির জোরালো ধারা বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন গভর্নর। তিনি বলেন, মুদ্রা ও ঋণ প্রবাহের এই যৌক্তিক পরিমিতি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে (উপশমে) অনুকূল অবদান রেখেছে। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বর্তমানে তা লক্ষ্যমাত্রার অনেক নীচেই রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই থাকবে। এ বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে গভর্নর বলেন, বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বসীমাটিই আমরা দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি কার্যক্রম প্রণয়নে ব্যবহার করেছি।

 

এক প্রশ্নের উত্তরে গভর্নর বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমাসহ অন্যান্য কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিম্নমুখী রয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছর জ্বালানি তেলের মূল্য স্থিতিশীল হয়ে ঊর্ধ্বমুখী হবে বলে বিশেষজ্ঞ মহল প্রত্যাশা করছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রমবাজারে জনশক্তি রপ্তানির তথ্য থেকে প্রত্যাশা করা যায় নিকট ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সে অন্তঃপ্রবাহ স্থিতিশীল হয়ে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরবে। হুন্ডির কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমছে কিনা সংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে যেসব টাকা পাঠানো হয় সেগুলোর বিষয়ে আমাদের রিসার্চ গ্রুপ কাজ করছে। তারা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি দেশে যাবে। পাশাপাশি ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ বেশি কিনা এবং ওয়েস্টার্ন মানিসহ যারা রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত তাদের কমিশন বেশি দিতে হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া বেসরকারি খাতের মতো ব্যাংকের ডোর টু ডোর সার্ভিসও নেই। এসব কারণসহ সার্বিক বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি। আশা করি দুই-তিন মাসের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান হবে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে।