দেশে মডেল ফার্মেসি চালু সরকারের জনবান্ধব ওষুধনীতির সুফল

দেশে কতগুলো ওষুধের দোকান রয়েছে তার সংখ্যা আমাদের জানা নেই। তবে অনুমান করা যায় এবং এসব দোকানের মালিক সমিতির মতে এ সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। অবিশ^াস্য ব্যাপার! আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, এদের অধিকাংশেরই ওষুধ বিক্রির লাইসেন্স নেই। এসব দোকানে ওষুধ কিনতে প্রেসক্রিপশন লাগে না। টাকা থাকলেই যে কোন ওষুধ কেনা যায়। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ ব্যবহারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এন্টিবায়োটিক, হরমোন, ঘুমের/নেশার ওষুধ, এন্টিক্যান্সার ইত্যাদি যে কোন ওষুধই প্রেসক্রিপশন ছাড়া একমাত্র এদেশেই কেনা সম্ভব। ওষুধ কেনাবেচার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তাই সব সম্ভবের দেশ!

উন্নত দেশে রোগীর নিরাপত্তার কথা ভেবে এভাবে ফ্রি-স্টাইল ওষুধ বিক্রি হয় না। বাংলাদেশের রোগীরাও মানুষ এবং তারাও ওষুধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হতে পারেন। রোগীর নিরাপত্তার স্বার্থে তাই বাংলাদেশেও উন্নত দেশের মতো ‘রিটেইল ফার্মেসি’ স্থাপন করা প্রয়োজন। অনেক বক্তৃতা আর লেখালেখির পরেও কিন্তু এই চেষ্টাকে ফলবতী করা যাচ্ছিল না। দেশে প্রথমবার ১৯৮৬ সালে ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরের উদ্যোগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পাশে ওষুধের একটি আদর্শ দোকান স্থাপন করা হয়েছিল। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় স্থাপিত এই দোকানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘মডেল ফার্মেসি’। বিদেশে যেমন করে ওষুধের দোকানগুলো চলে এটিও তেমনি করে চলার কথা ছিল। ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার বিষয়ে অনভিজ্ঞ লোকজনের পরিবর্তে অভিজ্ঞ লোকদের তত্ত্বাবধানে ওষুধ বিক্রির জন্য গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টও নিয়োগ দেয়া হয়।

রোগীর চিকিৎসা ও আরোগ্যের বিষয়টি দুই ভাগে বিভক্ত: চিকিৎসক দিয়ে থাকেন চিকিৎসা সেবা বা মেডিক্যাল সার্ভিস, আর ফার্মাসিস্ট অর্থাৎ গ্রাজুয়েট ফার্মাসিস্ট দিয়ে থাকেন ওষুধ সেবা বা ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিস। সঠিক রোগ নির্ণয়, সঠিক ওষুধ ও অল্প সংখ্যক ওষুধে রোগ সারানো অর্থাৎ ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার, অস্ত্রোপচার ইত্যাদি মেডিক্যাল সার্ভিসের অন্তর্গত। আর ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার তথা সঠিক মানের ওষুধের উৎপাদন, বিপণন, বিতরণ, মজুদ, বিক্রি, রোগীকে ওষুধের ব্যবহার বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান ওষুধ সেবা বা ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিসের অন্তর্গত। বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল সার্ভিসটি ওষুধের উৎপাদন ছাড়া আর কোথাও নেই, এটি একেবারেই অবহেলিত।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে সেটিই হলো ওষুধ যা দিয়ে চিকিৎসা করা যায়। যার বিষয়ে সব তথ্য জানা রয়েছে এবং রোগী যেটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। এর কোন একটি অংশ বাদ দিলে একে নিরাপদে ব্যবহার করা যাবে না। অর্থাৎ শুধু ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনলেই হবে না, ওষুধের সঠিক ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধের নিরাপদ ব্যবহারের জন্য যে শর্তগুলো গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো হলো-১. সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়, ২. নির্ণিত সেই রোগের চিকিৎসার জন্য সঠিক ওষুধ নির্বাচন, ৩. সঠিক মানের ওষুধ কেনা এবং ৪. সঠিক নিয়মে সেই ওষুধ ব্যবহার। এই চারটি শর্তের যে কোনটি না মানলে ওষুধটি আর ‘ওষুধ’ থাকে না, সেটি হয়ে যায় ‘বিষ’।

প্রথম ও দ্বিতীয় শর্তগুলো পালন চিকিৎসকের দায়িত্ব। এ দুটি শর্ত মানতে পারলে ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন তৃতীয় ও চতুর্থ শর্তগুলো মেনে চলা।

তৃতীয় শর্তটি ওষুধের প্রস্তুতকারক কোম্পানি ও ওষুধ বিক্রেতার দায়িত্ব। ওষুধ কোম্পানিকে নিশ্চয়তা দিতে হবে তার উৎপাদিত ওষুধটি নি¤œমানের কিংবা নকল-ভেজাল নয়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত উত্তম উৎপাদন কৌশল (গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস-জিএমপি) অনুসরণ করে কোন কোম্পানি ওষুধ উৎপাদন করলেই কেবল সেই ওষুধ সঠিক মানের হবে। জিএমপি না মেনে উৎপাদিত ওষুধগুলো নি¤œমানের হতে বাধ্য, হতে পারে নকল-ভেজালও। এগুলো ব্যবহারে রোগ সারবে না, বরং রোগীর শরীরের আরও ক্ষতি হবে, যে ক্ষতি অনেক সময় প্রাণঘাতীও হতে পারে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের দেশে যে দুই শতাধিক ওষুধ কোম্পানি রয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই জিএমপি মেনে ওষুধ উৎপাদনে পুরোপুরি সক্ষম নয়। তবে এসব জিএমপি-ব্যর্থ ওষুধ কোম্পানি সংখ্যাগত হিসেবে বেশি হলেও বাজারে এদের প্রভাব খুব বেশি নয়, আমাদের হিসাব মতে বার্ষিক ওষুধের বাজারের প্রায় ৭% মাত্র। জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক স্থায়ী কমিটি কর্তৃক গঠিত ওষুধ কারখানা পরিদর্শন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এসব জিএমপি-ব্যর্থ ওষুধ কারখানাগুলো আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে জিএমপি সুবিধাবলী আয়ত্ত করতে পারছে না তা সত্য নয়। এদের সমস্যাটি বরং মাইন্ড সেট বা মানসিকতার। এসব নি¤œমানের কোম্পানিগুলো সবই যে মাঝারি বা ছোট কোম্পানি তাও নয়, এদের মধ্যে বড় কোম্পানিও রয়েছে।

জিএমপি-ব্যর্থ ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের নি¤œমানের ওষুধ সরবরাহ করে প্রচলিত অনেক ওষুধের দোকানে (সব নয়) এবং এসব দোকানও বেশি লাভের কারণে নি¤œমানের এসব ওষুধ বিক্রি করে মহাউৎসাহে। এসব অসাধু কোম্পানি ও অসাধু দোকানিদের কারণে সাধু দোকানগুলো সরকারের লাইসেন্স ও অন্যান্য নিয়মকানুন মেনে ওষুধ বিক্রি করতে গিয়েও হিমশিম খাচ্ছে।

এই নৈরাজ্য রোধে ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে মোট ৬২টি কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা সংবলিত বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্যবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সুপারিশে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাইকোর্ট ও সুপ্রীমকোর্টের নির্দেশে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর বেশ কিছু অসাধু ওষুধ কোম্পানি বন্ধ করা এবং নি¤œমানের এন্টিবায়োটিক, হরমোন ও এন্টিক্যান্সার ওষুধ উৎপাদনকারী জিএমপি-ব্যর্থ ওষুধ কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ জন্য দেশবাসী সুপ্রীমকোর্ট, হাইকোর্ট ও সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ। দেশবাসী আশা করে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের এই ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এর ফলে বাংলাদেশের বাজারে নি¤œমানের ও নকল-ভেজাল ওষুধের পরিমাণ ৭% থেকে কমিয়ে ০% করা সম্ভব হবে।

অসাধু ওষুধ কোম্পানিদের বিরুদ্ধে সরকারের এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের পাশাপাশি এখন জরুরী প্রয়োজন নি¤œমানের-নকল-ভেজাল ওষুধ যাতে কোন দোকানে বিক্রি না হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর তা করতে না পারলে জিএমপি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গৃহীত সরকারের যাবতীয় উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। উপরোল্লিখিত তৃতীয় শর্তটি মানতে গেলে তাই ওষুধের দোকানে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য।

চতুর্থ শর্তটি মানা রোগীর এখতিয়ার। তবে এটি মানতে রোগীকে যেসব তথ্য জানতে হবে তা তার পাওয়ার কথা ওষুধের দোকান থেকে। উন্নত বিশে^ এটাই নিয়ম। সেখানে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরা ওষুধের দোকানে কাজ করে এবং তারা রোগীকে এসব তথ্য দেয়। বিশেষায়িত কোর্স কারিকুলাম এবং প্রশিক্ষণের কারণে একমাত্র গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টরাই এসব তথ্য প্রদান করে রোগী কর্তৃক ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। প্রয়োজনীয় এসব তথ্যের মধ্যে রয়েছে ওষুধটি কিভাবে খেতে হবে, কতদিন খেতে হবে, খাবার আগে না পরে খাবে, খাবার আগে মানে খাবার কমপক্ষে আধা ঘণ্টা আগে খালি পেটে, কী ধরনের পাশর্^প্রতিক্রিয়া হতে পারে, এক্ষেত্রে রোগীর কিছু করণীয় রয়েছে কিনা, কী ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া হলে রোগীকে কী করতে হবে, কোন্ বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে ওষুধটির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে কিংবা ফার্মাসিস্টকে জানাতে হবে, কোন্ কোন ওষুধ ব্যবহারকালে রোদে বেরুলে ত্বকে প্রতিক্রিয়া বা ত্বক কালো হয়ে যেতে পারে, কোন্ ওষুধ খাওয়ার পর শুয়ে না থেকে দাঁড়াতে বা বড় জোর বসে থাকতে হবে, ওষুধ ব্যবহারকালে কী ধরনের খাবার খাওয়া যাবে না, ওষুধ ব্যবহারকালে কিডনি বাঁচানোর জন্য কতটুকু পানি বা তরল খাবার খেতে হবে, ওষুধটি বাড়িতে কিভাবে রাখতে হবে, কোন্ কোন্ ওষুধ ফ্রিজে রাখা যাবে না ইত্যাদি। এসব তথ্য গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়া অন্য কারও পক্ষে রোগীকে বলা সম্ভব নয়। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট রোগীর প্রেসক্রিপশনটি হাতে পাওয়ার পর সেখানে উল্লিখিত সঠিক ওষুধের মাত্রা, আন্তঃওষুধ বিক্রিয়ার সম্ভাবনা, ব্যবহারের বিধিনিষেধ ইত্যাদিও নিরীক্ষা করবে। প্রতিটি দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি করা যাবে এমন কিছু ওষুধের একটি তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করা থাকে। এগুলোকে বলে ওভার দি কাউন্টার বা ওটিসি ড্রাগ। ফার্মাসিস্ট ওটিসি ব্যতীত অন্য কোন ওষুধ প্রেসক্রিপশন ছাড়া ডিসপেন্স করবে না। নারকোটিক, হরমোন, এন্টিবায়োটিক, সিডেটিভ, ট্রাংকুইলাইজার ইত্যাদি ওষুধ ডিসপেন্স করার জন্য ফার্মাসিস্টকে কিছু বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। উপরন্তু প্রেসক্রিপশনে উল্লিখিত কোন ওষুধ বাজারে পাওয়া না গেলে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট সে ওষুধটি তাৎক্ষণিকভাবে সেখানেই তৈরি করে দেবে। এ সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় ‘ডিসপেন্সিং’। রোগীকে ওষুধ ব্যবহারের প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝিয়ে বলা অর্থাৎ পেশেন্ট কাউন্সেলিংটুকু ডিসপেন্সিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশে বর্তমানে যে ওষুধের দোকানগুলো রয়েছে সেগুলোর কোথাও ওষুধ ডিসপেন্স করার কোন ব্যবস্থা নেই। কারণ, গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট ছাড়া কোন ওষুধের ডিসপেন্সিং করা অসম্ভব। তাই ওষুধের নিরাপদ ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে আমাদের দেশের রোগীরা তাদের অজান্তেই প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিদেশে ওষুধের দোকান বা ফার্মেসিতে উপরোল্লিখিত সব কাজ করা হয়, বাংলাদেশের মতো ওষুধের লাইসেন্স নিয়ে বা না নিয়ে যত্রতত্র ওষুধের দোকান খুলে বসা যায় না। বিদেশে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের ছাড়া অন্য কাউকে ফার্মেসিতে কাজ করতে দেয়া হয় না। কিন্তু এখানে যে কেউ বসতে পারে, মোটামুটি সাক্ষর হলেই হলো। এখানে ওষুধ শুধু বিক্রিই করা হয়, ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার বিষয়ে রোগীকে তথ্য দেয়ার কেউ নেই, এমনকি ওষুধ বিক্রিতে প্রেসক্রিপশনও লাগে না। টাকা থাকলেই বাংলাদেশে যে কেউ যে কোন ওষুধ যে কোন পরিমাণে কিনতে পারে, যা উন্নত দেশে অবিশ^াস্য। বাংলাদেশের ওষুধের দোকানগুলোকে তাই ‘ফার্মেসি’ না বলে ‘ওষুধের মুদি দোকান’ নামে ডাকাই যুক্তিযুক্ত। আমরা মুদি দোকানে গিয়ে টাকার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী কিনি। টাকা থাকলেই যা খুশি যত ইচ্ছে কেনা যায়। সত্যিকারের ‘ফার্মেসি’ থেকে ওষুধ কিনতে হলে প্রেসক্রিপশন লাগবে, আর লাগবে এ ওষুধ কিভাবে সঠিকভাবে ও নিরাপদে ব্যবহার করা যাবে রোগীকে তা বলার জন্য সেখানে ফার্মেসি কাউন্সিল কর্তৃক নিবন্ধিত একজন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। কিন্তু আমাদের দেশের ওষুধের দোকানগুলো থেকে ওষুধ কিনতে এসব কিছুই লাগে না। ঠিক মুদি দোকানে যেমন হয়।

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সঠিক অর্থে অর্থাৎ উন্নত দেশের মতো একটি ‘ফার্মেসি’ স্থাপনের জন্য ওষুধ প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা এতে অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিতে তখনই সম্মত হয়েছিল এবং সংস্থার পক্ষে এসেনশিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানি লিঃ সম্পূর্ণ বিষয়টি সমন্বয় করছিল। এরপর সেটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি। এখানে তাৎক্ষণিকভাবে ওষুধ তৈরির প্রয়োজন হলে যাতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট তা করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সজ্জিত একটি ছোট ল্যাবও ছিল। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালায় বর্ণিত ‘গুড ফার্মেসি প্রাকটিস- জিপিপি’ অনুসরণ করে এটি স্থাপনের তিনটি উদ্দেশ্য ছিল। এক. পেশেন্ট কাউন্সেলিংসহ ওষুধ ডিসপেন্সিংয়ের মাধ্যমে ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দুই. রোগীরা উন্নত সেবা পেতে থাকলে দেখাদেখি অনেক ওষুধের দোকান মালিক তাদের দোকানেও একই ধরনের সেবা চালু করতে এগিয়ে আসবে এবং তিন. বিশ^বিদ্যালয়ে ফার্মেসি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা রিটেইল ফার্মেসিতে ডিসপেন্সিং সম্পর্কে হাতে-কলমে শিখতে পারবে, যা তাদেরকে ভবিষ্যতে ওষুধ কোম্পানির বদলে হাসপাতাল ফার্মেসি বা রিটেইল ফার্মেসিতে চাকরি করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এজন্য এর নাম দেয়া হয় ‘মডেল ফার্মেসি’।

কিন্তু এটি পরিচালনার ভার ওষুধ প্রশাসন পরিদফতরের হাতে থাকার পরও সেটি কয়েক মাসের বেশি চালানো যায়নি। আর আশপাশের ওষুধের দোকানদাররা রোগীবান্ধব এই মডেল ফার্মেসিকে সুনজরে দেখেনি। কয়েকদিন পরপর এখানে বোমা পড়তে লাগল। তাতেও কাজ না হওয়ায় এরপর শুরু হলো কর্মরত গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের লক্ষ্য করে জীবননাশের হুমকি ও গুলিবর্ষণ। জীবননাশের মুখোমুখি হয়ে কোন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট আর সেখানে কাজ করতে চায়নি। মডেল ফার্মেসিটি এরপর বন্ধ হয়ে যায়। এর ডিসপেন্সিং ল্যাবের যন্ত্রপাতিগুলো তেজগাঁয়ের এসেনশিয়াল ড্রাগসের গুদামে রাখা হয়। দীর্ঘদিন সেগুলো ওখানেই ছিল। এগুলো এখন কী অবস্থায় কোথায় আছে জানি না।

গত ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬ সরকার দেশের তৃতীয় জাতীয় ওষুধনীতি ঘোষণা করেছে। এতে জনবান্ধব অনেক ধারা রয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত অনেক জনবান্ধব ব্যবস্থা এই প্রথম এদেশে চালু করা হচ্ছে। সরকারকে অভিনন্দন যে, এই ওষুধনীতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ওষুধনীতির অংশ হিসেবে নি¤œমানের ও নকল-ভেজাল ওষুধের উৎপাদন বন্ধে জাতীয় সংসদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ও সরকার কিছু আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোম্পানি পর্যায়ে ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি নি¤œমানের ও নকল-ভেজাল ওষুধের বিক্রি বন্ধের জন্য দোকান পর্যায়েও ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকার তাই ওষুধনীতি বাস্তবায়নের সূচনায় দীর্ঘ ৩০ বছর পর আজ আবার মডেল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে। গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ নূরুল ইসলাম (পরবর্তীতে প্রয়াত) এবং প্রফেসর ইমেরিটাস ডঃ এ কে আজাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রখ্যাত স্বাস্থ্য ও ওষুধ বিজ্ঞানীরা এদেশে ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক অন র‌্যাশনাল ড্রাগ ইউজের (ইনরুড) ব্যানারে ওষুধের যৌক্তিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন। তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এবং ম্যাসাচুসেটস্ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিখ্যাত কিছু স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীর একটি প্রতিষ্ঠান ‘ম্যানেজমেন্ট সাইন্স ফর হেলথ (এমএসএইচ)’ বিভিন্ন স্বল্পোন্নত দেশে স্বাস্থ্য সেক্টরের উন্নয়নে ‘মডেল ফার্মেসি’ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন রোগীবান্ধব কাজ করছে। ইতোমধ্যে তারা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশের সব ওষুধের ডাটাবেজও নির্মাণ করেছে।

তাদেরকে আমরা বাংলাদেশের গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের পক্ষ থেকে গত বছর আমন্ত্রণ জানাই এদেশে মডেল ফার্মেসি চালুর বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করতে। ওষুধ প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও মডেল ফার্মেসি প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করতে সম্মত হয়। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর কর্তৃক গৃহীত এই প্রকল্পটির নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ ফার্মেসি মডেল ইনিসিয়েটিভ (বিপিএমআই)’, যা ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর, বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল এবং ম্যানেজমেন্ট সাইন্স ফর হেলথের সহযোগিতায় বাস্তবায়ন হবে।

বর্তমান সরকারের মডেল ফার্মেসি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগে ওষুধের দুই ধরনের দোকান প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রথম ধরনের নাম হবে ‘ফার্মেসি’ এবং দ্বিতীয়টির ‘মেডিসিন স্টোর’। কোন দোকানে পূর্ণকালীন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট না থাকলে ‘ফার্মেসি’ নাম ব্যবহার করা যাবে না। তবে ‘মেডিসিন স্টোর’গুলোতে গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট না থাকলেও চলবে। এগুলোতে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্ট বা ফার্মেসি টেকনিশিয়ানরা দোকান পরিচালনা করবে। গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট পরিচালিত দোকান অর্থাৎ ফার্মেসিগুলোতে আলাদা একটি লোগো থাকবে, যাতে জনগণ সহজেই এসব দোকান চিনে নিতে পারে। গত বছরের শেষের সপ্তাহে এসব দোকান পাইলট ভিত্তিতে পরিচালনা শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত অর্থাৎ ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর পান্থপথ, কলাবাগান, বনানী ও গুলশানে মোট সাতটি মডেল ফার্মেসি চালু হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এগুলো উদ্বোধন করেছেন। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী এখনকার পর্যায় হলো ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে এবং পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে সারাদেশে এসব দোকান ছড়িয়ে দেয়া হবে। সিলেট মহানগরীতে মডেল ফার্মেসি চালুর তারিখ নির্ধারিত রয়েছে বৃহস্পতিবার ২৬ জানুয়ারি ২০১৭ তারিখ। ইতোমধ্যে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল কর্তৃক গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টদের বাছাই করা হচ্ছে এবং গত ২৬ নবেম্বর ২০১৬ থেকে ৩০ জন গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্টের একেকটি ব্যাচকে ফার্মেসি কাউন্সিল ও এমএসএইচ কর্তৃক প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হয়েছে, যা চলমান থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ‘ফার্মেসি’ নামের ওষুধের দোকান কমপক্ষে ৩০০ বর্গফুট আয়তনের হতে হবে। তবে ‘মেডিসিন স্টোর’ কমপক্ষে ১২০ বর্গফুটের হতে পারবে। তবে কোন ধরনের দোকানেই ডাক্তারের চেম্বার থাকতে পারবে না। ফার্মেসিতে বিভিন্ন পর্যায়ের তাপ-সংবেদনশীল ওষুধগুলোর সঠিক সংরক্ষণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং রেফ্রিজারেটর অবশ্যই থাকতে হবে। তবে মেডিসিন স্টোরের বেলায় এই শর্ত শিথিলযোগ্য।

এছাড়া ফার্মেসিতে ওটিসি ড্রাগ এবং প্রেসক্রিপশন ড্রাগ উভয়ই বিক্রি করতে পারবে। তবে মেডিসিন স্টোরগুলো ওটিসি ড্রাগের সাথে সীমিত সংখ্যক প্রেসক্রিপশন ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে, যেগুলো সরকার নির্ধারিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া মেডিক্যাল সাপ্লাইস, মেডিক্যাল ডিভাইসেস, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সামগ্রী ইত্যাদি উভয় দোকানই বিক্রি করতে পারবে।

এভাবে উভয় ধরনের দোকানের জন্য বেশ কিছু নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, যা অনুসরণ করে কোন মেডিক্যাল স্টোর নিজেকে ফার্মেসিতে উন্নীত করতে পারবে। বর্তমানের দোকানগুলোও সব শর্ত পূরণ করে মেডিক্যাল স্টোরে রূপান্তরিত হতে পারবে।

সরকার কর্তৃক সারাদেশে মডেল ফার্মেসি চালু হলে দেশের মানুষ ওষুধের ক্ষেত্রে অনেক প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাবে। যেমন এই মডেল ফার্মেসিতে কোন নিম্নমানের বা নকল-ভেজাল ওষুধ বিক্রি হবে না। তেমনি কোন মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা চোরাচালানকৃত ওষুধও বিক্রি হবে না। ওষুধের প্যাকেটে কোম্পানির মুদ্রিত দামের চাইতে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি হবে না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ হওয়ার কারণে নেশার ওষুধও কারও পক্ষে কেনা সম্ভব হবে না।

জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং ওষুধের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত এই মডেল ফার্মেসির উদ্যোগটিকে নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সবার সমর্থন করা উচিত। আসুন, আমরা জাতীয় ওষুধনীতি ২০১৬-এর অংশ এই মডেল ফার্মেসিকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করি এবং ওষুধ কেনার সময় ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে ওষুধের নিরাপদ ও কার্যকর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যও বুঝে আসি। ১৯৮৬ সালের মতো মডেল ফার্মেসির উদ্যোগটি এবার যেন কোন মহলের চক্রান্তে ভেস্তে না যায়।

Views: 558