প্রধানমন্ত্রীর বই উৎসব ও আগামীর বাংলাদেশ

নতুন বই হাতে নিলে কেমন আনন্দ, দুই মিনিট চোখ বন্ধ করে শৈশবে ফিরে গেলে তা স্ফটিকের মতো দেখতে পাওয়া যায়। নতুন বই হাতে নিলে সব পাতা না উল্টে পারা যায় কি? শৈশবে তো না-ই, পরিণত বয়সেও অনেকেই পারেন না। শৈশবে স্কুলপ্রেমী প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছেই নতুন বই অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বছরের প্রথম দিনের বই উৎসব দেখে মুগ্ধ হননি, এমন কেউ আছেন বলে মনে হয় না। এ উৎসব অনেককেই সেই মধুর শৈশবে নিয়ে গেছে। আর অন্তত এ ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অন্তর থেকে ধন্যবাদ দিতে চাই। কারণ ব্যস্ততায় ভরা এ নগরজীবনে শৈশবে ফিরে যাওয়ার মতো অবকাশ কোথায়! তিনি আমাদের সেই সুযোগটুকু তৈরি করে দিলেন।
সকালে সেজেগুজে স্কুলে যাওয়া এবং নতুন বই হাতে গ্রামের পথে পথচলার উচ্ছ্বাসপূর্ণ দৃশ্য কল্পনায় ভাবলেও নির্মল এক আনন্দে মন ভরে যায়। মনের এ ফুরসতটুকু দেয়ার সময়টাও যে আজ মেলানো দায়। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসনীয় উদ্যোগ সে সুযোগ তৈরি করেছে আমাদের। রাজধানীর শত ব্যস্ততায়ও শৈশবের রূপ, রস, গন্ধ অনুভব করতে পারছি। মোহময়ী আবেশে অবগাহনের ভেলায় নিজেকে হারাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে যথার্থই বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী।
শৈশবে বছরের প্রথম দিনে নতুন বইয়ের ‘গন্ধ’ না পাওয়ার আক্ষেপে এ দীর্ঘ বয়সে এসে হাহাকার করে ওঠে অর্থমন্ত্রীর মন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে বই উৎসবে এসে শৈশবের সে হাহাকারকে আর চেপে রাখতে পারেননি। আবুল মাল আবদুল মুহিত বই বিতরণ উৎসবে বলেই ফেলেন, ‘আমি কাল রাত থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি। কাল থেকে ভাবছি, এমন একটা আসরে যাব, যে আসরটা আমাদের সময়ে কখনও হতো না। এ ধরনের নতুন বই আমরা সব সময় পেতাম না। অনেক সময় পুরনো বই দিয়ে ক্লাস করতে হতো।’
তিনি আরও বললেন, ‘আজকের দিনে আমার খুব আনন্দ, তোমাদের হাতে এ বইগুলো যাবে, তোমরা অত্যন্ত খুশি হবে, নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকবে এবং সেখানে মোটা মোটা হরফে নাম লিখে দেবে।’ অর্থমন্ত্রী যেন গড়গড় করে নিজের শৈশবের চিত্রটিই বলে দিলেন।
এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, আধুনিক সমাজে বই ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করা যায় না। কেননা বই-ই মানুষের মনের দুয়ার খুলে দেয়, জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে এবং ভেতরে আলো জ্বেলে দেয়। মনুষ্যত্ব¡ অর্জনেরও বড় পথ বই পাঠ। বই পাঠ আসলে মানুষের একটি অপরিহার্য উপাদান। মূলত মানসিক উৎকর্ষ সাধনে বই পাঠের কোনো বিকল্প নেই।
কথায় আছে, জ্ঞানের কোনো সীমা নেই। চৌহদ্দি নেই। জ্ঞান অসীম, অফুরন্ত, কোনো পাঠে বা দানে হ্র্রাস পায় না বরং যত জ্ঞান লাভ করা যায়, ততই মনের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। একটু নিরীক্ষণ করলেই আমরা দেখতে পাব, সব যুগেই বই পাঠের বিকল্প ছিল না, আগামীতেও নেই। সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত মানুষ বই পড়ে। বই সর্বাবস্থায়ই আমাদের সহায়ক শক্তি। বই জীবনকে আলোকিত করে, বিকশিত করে এবং পরিপূর্ণ করে। বই থেকে আমরা যা গ্রহণ করি তা জ্ঞান, প্রজ্ঞা কিংবা বিদ্যা। বই ছাড়া এর কোনোটাই সম্ভব নয়। যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন বই পড়ব? জবাবে বলব, বই পড়ব জ্ঞান বিকাশ, জ্ঞান-পিপাসা এবং জ্ঞান-জিজ্ঞাসা মেটানোর জন্য। বই পড়ব ভদ্র, শালীন, মার্জিত এবং সংস্কৃতিবান হওয়ার জন্য। সর্বোপরি বই পড়ব পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার জন্য।
কোমলমতি শিশুদের শৈশবকে রঙিন করছে পাঠ্যবই। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ চিনতে এখন আর ভুল হয় না শিক্ষার্থীদের। বছরের শুরুর দিনে সরকার বিনামূল্যে বই দেবেÑ এ সহজ হিসাবও তাদের মুখস্থ। কারণ সরকার বই দেয়ার বিষয়টিকে এখন রেওয়াজে পরিণত করেছে। আজ সন্তানের হাতে নতুন বই দেখে খুশি হচ্ছেন মা-বাবারা। আগে নতুন বছরে এসে মার্চ-এপ্রিল নাগাদ নতুন বই পাওয়া যেত, তাও টাকা দিয়ে কিনতে হতো। কিন্তু এখন দিনবদল হয়েছে। আর এ পরিবর্তনের দিশারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যার দূরদর্শী চিন্তার কারণে বছরের শুরুর দিনে নগর থেকে গ্রামে সর্বত্রই বই উৎসবের আমেজÑ এ দৃশ্য ভালো লাগার, এ দৃশ্য ভালোবাসার।
বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের ৮ বছরে সরকারের অর্জন অনেক। যার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এবার সাড়ে চার কোটি শিশুর হাতে তুলে দেয়া হয়েছে ৩৬ কোটিরও বেশি বই। যাদের হাতে বই তুলে দেয়া হচ্ছে, এ শিশুরাই তো আগামীর বাংলাদেশ। তাদের জনসম্পদে পরিণত করছে সরকার। একযুগ আগেও বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু সেই অসাধ্য সাধন করে চলেছে শেখ হাসিনার সরকার।
১৯৭২ সালে রচিত বাংলাদেশের সংবিধানে সব শিশুর বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। সদ্য স্বাধীন দেশে অর্থের অভাব থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু সে বছর ৮০ লাখ টাকা মূল্যের ৪০ লাখ বিনামূল্যের বই ছাপিয়ে তা বণ্টন করেন। ১৯৭৩ সালে ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থীর জন্য বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি চালু করেন। পরে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদেরও বই দেয়া শুরু হয়। ২০১৩ সালে তিনি ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। এ বছর আরেকটি অসাধ্য সাধন করেছেন। প্রথমবারের মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিনামূল্যে ব্রেইল বইয়ের ব্যবস্থা করেছেন। ১ হাজার ২০১ জন শিক্ষার্থীকে দেয়া হয়েছে ১১টি বিষয়ে ৯ হাজার ৭০৩টি বই। এছাড়া পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুর হাতে প্রথমবারের মতো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাদরি ও গারোÑ এ পাঁচটি ভাষার বই তুলে দেয়া হয়েছে।
ঠিক সময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রীও আনন্দিত। এবার গণভবনে বই বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনকালে তিনি তার সেই উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বছরের প্রথম দিন তাদের হাতে বিনামূল্যের বই তুলে দিতে পারার আনন্দ অন্যরকম। নতুন বই পেলে আনন্দের অনুভূতি হয়। সুন্দর এ অনুভূতি পড়ালেখার আগ্রহ বাড়ায়। এজন্যই আমরা প্রতি বছর সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিই।’ তিনি আরও বলেন, ‘বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেয়ার আরেকটি কারণ আছে। অনেক মা-বাবা তাদের ছেলেমেয়েদের বই কিনে দিতে পারেন না। অনেকে অবহেলার কারণেও বই কিনে দেন না। তাই বছরের প্রথম দিন আমরা তাদের হাতে বই তুলে দিই, যাতে সন্তানদের পড়ালেখার জন্য মা-বাবার কোনো অজুহাত না থাকে।’
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যেই অনুমিত যে, তিনি বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মকে নিয়ে কতটা ভাবছেন। আসলে এটাই তো হওয়া উচিত। এ দেশে প্রতিটি সকাল আসে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। আর সেই সম্ভাবনার পথে এগিয়ে চলছে প্রাথমিক শিক্ষা। প্রতিদিন গ্রাম কিংবা শহরে এভাবে জ্ঞানের আলোর দীক্ষা নিতে ছুটে যায় শিশুরা। কারণ শিক্ষা এখন সুযোগ নয়, অধিকার। আর বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ করে দিচ্ছে সরকার। গরিব অথবা সামর্থ্যবান সবার সন্তানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভের সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগকে ত্বরান্বিত করতে সরকার ১ কোটি ৩০ লাখ শিশুকে উপবৃত্তির সংস্থান রেখেছে। চালু রয়েছে স্কুলফিডিং কর্মসূচি। সম্ভাবনার স্রোতেই এখন শিক্ষার তরী, যা আমাদের একটি সুন্দর আগামী সৃষ্টিতে শুধু আশাবাদীই করে তুলছে।
প্রাথমিক শিক্ষার বাতিঘর জ্বালিয়ে রাখছেন ৫ লাখ শিক্ষক। তাদের যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষতা বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সনাতন পাঠদানের পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোয় মাল্টিমিডিয়া পদ্ধতিতে পাঠদান চলছে। আধুনিক পদ্ধতিতে আনন্দময় পরিবেশে পড়ানোর সঙ্গে শিশুরা প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের এসব তথ্য আমাদের আশাবাদী করে তুলছে আরও। চারদিকে বিনষ্ট হওয়ার যেসব উপকরণ ছড়িয়ে আছে, তার মাঝ দিয়ে আগামী প্রজন্মকে সঠিক পথে টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। তারপরও এ কঠিন পথটিতেই টিকে থাকতে হবে আমাদের। দেশকে উন্নত বিশ্বের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে যথার্থ শিক্ষার বিকল্প নেই। অন্যদিকে আমাদের লক্ষ্য, শিশুদের নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
বাঙালি জাতির গৌরবগাথা, শৌর্যবীর্যের ইতিহাস, মেধাকে শানিত করতে হবে এসবে। যাতে তাদের মনে সবকিছুর ঊর্ধ্বে জেগে থাকে দেশপ্রেম।
শিক্ষার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে হাঁটছি আমরা। শিক্ষা খাতে বিপ্লব সাধিত হচ্ছে। শিল্প-সাহিত্য, খেলাধুলায় ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখাচ্ছে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা। দেখছি নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী এবং যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নের রোলমডেল। এ গতি অপ্রতিরোধ্য। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শত বাধা পেরিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ, এ আমাদের বিশ্বাস।