কুমিল্লার পাহাড়ে কাসাবার চাষ

কুমিল্লার পাহাড়ে কাসাবার চাষমামশাদ কবীর, কুমিল্লা: কাসাবা একটি কৃষি ফসল। দেখতে মিষ্টি আলুর মতো। শর্করা জাতীয় এই ফসলটি গম, ভুট্টা, আলুর মতো দানাদার খাদ্য শ্রেণির। তা কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের লোকজনের কাছে দিন দিন পরিচিত হয়ে উঠছে। পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে বাড়ছে কাসাবার চাষ।
লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের শত শত একর জুড়ে কাসাবার চাষ হচ্ছে। কাসাবা চাষি লালমাই পাহাড়ের শ্রীবিদ্যা এলাকার মঞ্জিল মিয়া জানান, লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের কমপক্ষে এক থেকে দেড় হাজার একর জমিতে কাসাবার চাষ হচ্ছে।
কাসাবা মাটির নিচে উত্পাদন হয়। ৪-৫ ফুট উঁচু গাছের গোড়ায় মাটির নিচে উত্পাদিত এই ফসলটি বছরে একবার আহরণ করা হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বরে এর চারা রোপণ করা হয়। পরবর্তী বছরের একই সময় সেটা মাটির নিচ থেকে তোলা হয়।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে রকেট নামে এক ব্যক্তি সালমানপুরের পাহাড়ি এলাকায় কিছু জায়গায় পরীক্ষামূলকভাবে কাসাবার চাষ শুরু করেন। তিনি তার উত্পাদিত ফসল রংপুরের শিল্পপতি রহিম উদ্দিন ও করিম উদ্দিন ভরসার মালিকানাধীন একটি কারখানাতে বিক্রি করতেন। পরবর্তী সময়ে নরসিংদীর তারাব এলাকায় অবস্থিত রহমান কেমিক্যাল নামের একটি কারখানায় সেগুলো সরবরাহ করা হতো। তখন রহমান কেমিক্যাল স্থানীয় কৃষকদের বীজ সরবরাহ করত। আর এভাবে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ে কাসাবা।
একসময় কাসাবা চাষ সম্প্রসারণে রহমান কেমিক্যালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবেও স্থানীয় উত্পাদকদের সহযোগিতা শুরু করে। বর্তমানে লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের সালমানপুর,
চৌধুরীখোলা, রাজারখোলা, জামমুড়া, শ্রীবিদ্যা, রতনপুর, লালমাই, ময়নামতি সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকা, কোটবাড়ী বিজিবি সেক্টর ব্যাটালিয়নের আশপাশসহ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পাশেও কাসাবা চাষাবাদ হচ্ছে।
কাসাবা চাষি জাহাঙ্গীর জানান, প্রতি একর জমিতে দু’শতাধিক মণ কাসাবা উত্পাদন হয়। ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের লোকজন এসে জমির পাশ থেকে ফসল নিয়ে যায়। এজন্য উত্পাদকদের বাজারে তাদের মালামাল নিয়ে যেতে হচ্ছে না। ঘরে বসেই তারা তাদের উত্পাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছে।
আরেক কাসাবা চাষি নজরুল বলেন, বর্তমানে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রাণ গ্রুপ কাসাবা চাষিদের উন্নতমানের হাইব্রিড বীজ সরবরাহ করছে। লালমাই পাহাড়ের সালমানপুর এলাকায় কাসাবা উত্পাদনকারী ৭৫ বছরের বৃদ্ধ তোতা মিয়া বলেন, কাসাবা কী সেটা এখনও অনেকেই জানে না। কাসাবা সম্পর্কে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের গ্লাসকো স্মিথ ক্লাইন কোম্পানি কাসাবা নিয়ে গ্লুকোজ উত্পাদন করত। অনেক কোম্পানি চিপস বানাচ্ছে। রহমান কেমিক্যাল ও প্রাণ কোম্পানি বর্তমানে এখানকার উত্পাদিত কাসাবা কিনে নিয়ে গ্লুকোজ-ডি, চিপসসহ বিভিন্ন ওষুধের কাঁচামালও তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে কেউ এখনও কাসাবা চাষে আমাদেরকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করছে না। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা মাঠ পর্যায়ের অফিসারদেরও আমাদের এলাকায় দেখিনি। একই কথা বললেন ৭০ বছরের বৃদ্ধ কাসাবা চাষি আয়েত আলী ও আবুল হাসেম।
এদিকে মৌলভীবাজার ও ময়মনসিংহে কাসাবা উত্পাদন হচ্ছে জানিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণের সহকারী পরিচালক আসাদুল্লাহ মিয়া দাবি করেন, কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়েও চাষাবাদ হচ্ছে। আমরা স্থানীয়ভাবে কৃষকদের কাসাবা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করছি। তিনি জানান, কাসাবা ডায়াবেটিস ও ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে।