আফাল-তাফাল, ব্যস্ত দক্ষিণের কৃষক

আমনের ম ম গন্ধে এখন মাতোয়ারা দেশের দক্ষিণাঞ্চল। ধান কাটা। বাড়িতে বয়ে আনা। মই দেয়া। সিদ্ধ-শুকানো। ছাঁটাই করা। বছরের খোরাকি ঘরে তোলা- এসব নিয়েই ব্যস্ত গাঁয়ের কৃষিনির্ভর নারী-পুরুষ সবাই। তাই শীত আর কুয়াশা উপেক্ষা করে দিন-রাত চলছে অন্য রকমের কর্মযজ্ঞ। বিশেষ করে পুরুষের তুলনায় নারীদের ব্যস্ততা যেন আরও বেশি। ধান সিদ্ধ, শুকানো আর সারা বছরের চাল মজুদের কাজটি যেন অঘোষিত ভাবে পুরুষরা তাদের ওপরেই বর্তে দিয়েছে। ঘরকন্নার নিয়মিত কাজের মাঝে তারাও চিরায়ত কাল থেকে এতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে রোপা আমনের চাষ যেমন হয় কিছুটা বিলম্বে, তেমনি ফসলও আসে দেরিতে। উত্তরের কৃষক আমন ঘরে তুলে বোরো আবাদে নেমে পড়েছে। অথচ এ অঞ্চলের অধিকাংশ ক্ষেত এখনও রোপা আমনে ভরা। বিশেষ করে সাগর পাড়ের দ্বীপচরগুলোর ক্ষেত-খামার আমনে পরিপূর্ণ। এখানকার ক্ষেত ভর্তি সোনালী ফসলের ডগায় জমছে শিশিরবিন্দু। এখন চলছে ফসল কাটা আর সিদ্ধ-শুকানোর ভর মওসুম। তাই তো এখন চারদিকে আমনের ম-ম গন্ধ। চরগাঁয়ের যে কোন বাড়িতে গেলেই চোখে পড়বে ধানের স্তূপ। বিশেষ করে অবস্থাপন্ন কৃষকদের বাড়ির উঠোনের কোথাও এতটুকু ফাঁকা পড়ে নেই। সর্বত্র আঁটিবাঁধা ধানের স্তূপ। রাতভর চলছে গরু দিয়ে ধান মাড়াই। কেউ কেউ ধান মাড়াইয়ের জন্য আজকাল ডিজেল চালিত পাওয়ার পাম্প মেশিন দিয়ে যন্ত্র বানিয়ে নিয়েছে। এগুলো ভাড়াতেও পাওয়া যায়। ধান মাড়াইয়ের কাজটি যেমন বেশির ভাগ রাতে হয়, তেমনি সিদ্ধ করার কাজটিও রাতেই বেশি চোখে পড়ে। সিদ্ধ করার আগে আবার কেউ কেউ ধান ভিজিয়ে নেয়। এতে সিদ্ধ হতে সময় কম লাগে। ধান ভেজানো হয় নৌকায়। ধান সিদ্ধ করার জন্য বানানো হয় কিছুটা কমবেশি পাঁচ-সাত ফুট দৈর্ঘ্য-প্রস্থের আড়াআড়ি মাটির চুলা। স্থানীয় আঞ্চলিক ভাষায় চুলা বা উনুনকে বলা হয় ‘আফাল’। এ আফালের ওপরে বসানো হয় টিন দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি করা চুঙ্গা। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘তাফাল’। আফাল আর তাফাল মিলেই চলে ধান সিদ্ধ করার পালা। তাফাল বা চুলায় আগুন জ্বালানো হয় তুষ দিয়ে দিয়ে। যখনই চুলার মধ্যে ছিটিয়ে দেয়া হয় তুষ তখনই দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। সে আগুনে রাঙা হয়ে ওঠে গাঁয়ের কিষান বধূর মুখ। শীত আর কুয়াশা যতই তীব্র হোক, গভীর কিংবা শেষ রাতে শুরু হয় ধান সিদ্ধ করার পালা। যা চলে প্রায় দুপুর পর্যন্ত। পরে সিদ্ধ করা ধান মেলে দেয়া হয় রোদে। তিন-চার দিনেই শুকানো ধানে হয় চাল। যা হবে কৃষকের সারা বছরের খোরাকি। ধান ভিজানো, সিদ্ধ এবং শুকানোর এ প্রক্রিয়াকে গ্রামীণ জীবনের এক অনবদ্য চিত্রকল্প হিসেবে বিবেচনায় নেয়া গেলে, তা হবে আবহমান বাংলার এক অনন্য চিরায়ত দৃশ্যকাব্য। এর মাঝেই খুঁজে পাওয়া যাবে বাংলার প্রকৃত মুখ।

শীত ঠেকাতে কিষান বধূর গায়ে মোটা চাদর কিংবা কাঁতা। কোলে দুধের শিশু। কুয়াশা ভেদ করে তখনও উঁকি দেয়নি সূর্য। কিষান স্বামী দূর থেকে বয়ে আনছে ভেজা ধান। শালিকরা দলবেঁধে ছড়ানো ছিটানো ধান ঠোঁটে কামড়ে ধরছে। চুলার আগুন জ্বলসে উঠছে। এমন সুমধুর দৃশ্য শুধু চর-গাঁয়েতেই মিলবে।

আমন ধান সিদ্ধ-শুকানোর এমন চিত্র কয়েকদিনে ঘুরে দেখা গেছে বেশ কয়েকটি চর-গাঁয়ে। পটুয়াখালীর শেষ দক্ষিণ প্রান্তের চরপক্ষিয়ার এক বাড়ির উঠোনের কোনায় শেষ রাতে দেখা গৃহস্থ বধূ মোমেনা বেগম জানান, ধান সিদ্ধ শুকানোর কাজেও আছে নানা কৌশল। যা তিনি শিখেছেন তার শাশুড়ির কাছে। সিদ্ধ কমবেশি হলে চাল ভাল হবে না। আবার রোদেও শুকানো হবে পরিমাণ মতো। তা না হলেও চাল ভাল হবে না। দীর্ঘদিন ঘরে চাল রাখার জন্য পরীমিত সিদ্ধ এবং শুকাতে হবে। তিনি আরও জানান, তার শাশুড়ি ৬০ বছর ধান সিদ্ধ-শুকানোর কাজ করেছেন। তিনিও করছেন ১৮ বছর ধরে। এতে এখন তিনি যথেষ্ট অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। পার্শ্ববর্তী মৃধা বাড়ির তিন সন্তানের মা আনোয়ারা বেগম জানান, ধান সিদ্ধ-শুকানোতে যে কত রকমের কৌশল আছে, যা শহরের মানুষ বুঝতে পারবে না। একত্রে যেমন ১৫-২০ মণ ধান সিদ্ধ করা যায়। আবার ১০-২০ কেজি ধানও সিদ্ধ করা যায়। ধানের পরিমাণ বুঝে সিদ্ধ করতে হয়। ভিজিয়েও রাখতে হয় একইভাবে পরিমাণ মতো। বেশি ভিজলে যেমন সমস্যা। আবার কম ভিজলেও সমস্যা। বাড়ির কর্তা আনোয়ার হোসেন জানান, পটুয়াখালী বা বরিশাল অঞ্চলের বেশির ভাগ বাড়িতে ধান সিদ্ধ-শুকানোর কাজটি মহিলারাই করছে। এটি যুগ যুগের চিরায়ত ধারা, যা আজও বহমান। তবে পুরুষরাও সমানভাবে সহযোগিতা করে। তিনি আরও বলেন, এ অঞ্চলে ধান সিদ্ধ-শুকানোর যান্ত্রিক পদ্ধতি না থাকায় বাধ্য হয়ে প্রাচীন আমলের ধারাটি চলে আসছে। এটিকে গ্রামীণ জীবনের নিজস্ব ধারা বলা চলে।

পটুয়াখালীর দ্বীপ-চরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক-চাষীর বাড়িতেই এখন যেন ধান সিদ্ধ-শুকানোর উৎসব চলছে। নারী-পুরুষ সবাই ব্যস্ত এ কাজ নিয়ে। যা চলবে আরও এক মাসের বেশি সময় জুড়ে। আবহমানকালের এ ঐতিহ্যে সমানে টিকে আছে মাটি আর মানুষের মাঝে।র‌্য