স্বাস্থ্য খাতের ১০ সূচকে উন্নতি

২০০৭ সালে প্রতি হাজারে ৬৫ শিশু মারা যেত ৫ বছর বয়সের মধ্যে। ২০১৪ সালে এ সংখ্যা নেমে এসেছে প্রতি হাজারে ৪৬ জনে। এ হিসাবে শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ২৯ শতাংশ। ১৯৯০ সালে দেশে নারীপ্রতি শিশুর সংখ্যা ছিল গড়ে ৩ দশমিক ৩। সম্প্রতি নারীপ্রতি শিশুর সংখ্যা নেমে এসেছে ২ দশমিক ৩-এ। ২০০৯ সালে ৪৩ শতাংশ শিশু শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করত। ২০১৪ সালে এ হার উঠেছে ৫৫ শতাংশে। একই সময় জন্মের আগেই দক্ষ স্বাস্থ্য কর্মীর সেবা পাওয়া শিশুর সংখ্যা ৫৩ শতাংশ থেকে উঠেছে ৬৪ শতাংশে। প্রয়োজনের তুলনায় কম ওজনের শিশুর সংখ্যা ৪১ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ৩৩ শতাংশে। নবজাতক ও শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু এবং প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণে সাম্প্রতিক সময়ে ১০টি সূচকে সম্প্রতি সন্তোষজনক অগ্রগতি হয়েছে বলে মনে করে বহুজাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক।
স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা এবং পুষ্টি সেক্টর উন্নয়ন কর্মসূচির (এইচপিএনএসডিপি) সুবাদে এ অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে এসব বিষয় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এইচপিএনএসডিপি’র আওতায় ২০১৪ সাল থেকে দেশে ১৩ হাজারের বেশি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। কর্মসূচির আওতায় সচেতনতামূলক পদক্ষেপের কারণে প্রসবকালে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মীর সেবা নেয়ার হার ২১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের প্রবণতা ৫৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ শতাংশে। হামের টিকা গ্রহণের প্রবণতা উঠেছে ৮৬ শতাংশে। ২৩ মাসের মধ্যে সবগুলো মৌলিক টিকা গ্রহণের হার উঠেছে ৮৪ শতাংশে। এসব পদক্ষেপের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের মানুষের গড় আয়ুও বেড়েছে। প্রতিবেদনটিতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অভাবনীয় উন্নতি করেছে। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) আওতায় ৫ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে বাংলাদেশ ২০১০ সালে জাতিসংঘের এমডিজি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। এর পরও বাংলাদেশের অনেক মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে প্রতিদিন দেশের অর্থনীতির বিপুল পরিমাণে ক্ষতি হচ্ছে। নারী, শিশু ও দরিদ্রদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এইচপিএনএসডিপি ভালো ভূমিকা রাখছে।
দারিদ্র্য, উপকরণের অভাব, বিভিন্ন রোগের প্রকৃতির পরিবর্তন বাংলাদেশর স্বাস্থ্য খাতে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, শতকরা হিসাবের পাশাপাশি প্রকৃত সংখ্যায়ও বাংলাদেশে অপুষ্টির শিকার নারী ও শিশুর সংখ্যা এখনও বেশি। তাছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) তুলনায় পর্যাপ্ত রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় সরকারের একার পক্ষে এ চাহিদা পূরণ করা অনেক কঠিন। অনেকেই সরকারের সরবরাহের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে অনেক দরিদ্র মানুষ আরও দারিদ্র্যের শিকার হচ্ছেন।
তবে স্বাস্থ্য খাতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে এর বাইরেও আরও কিছু চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাতাদের অর্থছাড়ের সঙ্গে সংগতি রেখে সরকারি তহবিলের অর্থ ছাড় হচ্ছে না বলে জানানো হয়েছে। দক্ষ জনবলের স্বল্পতা ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কাজ করার অনাগ্রহে মানসম্পন্ন সেবা দেয়া যাচ্ছে না। তাছাড়া গাইনি ও এনেসথেশিয়া বিভাগের চিকিৎসকের অভাবে উপজেলা পর্যায়ে প্রসূতি সেবা এখনও নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
কেন্দ্রীভূত ক্রয় কার্যক্রম ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং এডিপি বরাদ্দের স্বল্পতাকে কার্যক্রমের চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে পুষ্টিসেবাগুলোকে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে নগর এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৩ আগস্ট ৫৬ হাজার ৯৯৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয় ধরে কর্মসূচিটি একনেকে অনুমোদন দেয়া হয়। কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার লক্ষ্য বেঁধে দেয়া হয়েছিল। পরে কর্মসূচির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পে রাজস্ব খাতের আওতায় ব্যয় হবে ৩৪ হাজার ৮১৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। আর উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে ২২ হাজার ১৭৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৪৩ হাজার ৪২০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় করা হচ্ছে। ১৩ হাজার ৫৭৬ কোটি ১৬ লাখ টাকা উন্নয়ন সহায়তা বাবদ বিদেশি উৎস থেকে আসছে।
কর্মসূচির উন্নয়ন অংশ ৩২টি অপারেশনাল প্লানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতর ১৭টি, পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর সাতটি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পাঁচটি এবং সেবা পরিদফতর, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও নিপোর্ট একটি করে প্লান বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকসহ ১৪ দাতা দেশ ও সংস্থা অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। প্রথমে এ খাতে ৩৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার ঋণ দেয়ার ঘোষণা দেয় বিশ্বব্যাংক। পরে এ প্রকল্পে আরও ১৫ কোটি ডলার সহায়তা দিতে ঋণ চুক্তি করে সংস্থাটি। সব মিলে এতে সংস্থাটির সহায়তা দাঁড়ায় ৫০ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। এর বাইরে ডিএফটিএডি, ডিএফআইডি, জাইকা, ইকেএন, জিআইজেড, কেএফডব্লিও, কেওআইসিএ, এসআইডিএ, ইউএসএআইডি, আইডিএ, ডব্লিওএইচও, ইউএনআইসিইএফ, ইউএনএফপি ও ইউএনএআইডিএস ছাড়াও মোট ১৪টি দাতা দেশ ও সংস্থা প্রকল্পে সহায়তা দেয়।