লাখো কণ্ঠে বাল্য বিবাহকে ‘না’

সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণা এবং বাল্য বিবাহকে ‘না’ বলার এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছিল সুনামগঞ্জবাসী। গতকাল এই আয়োজনে শিক্ষার্থীসহ লাখো মানুষ অংশ নেয়। জেলার ২৯৯টি স্থানে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩২৩টি লাল কার্ড নিয়ে একযোগে এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বাল্য বিবাহকে ‘না’ বলার ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগকে গিনেস বুকে ঠাঁই দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা অনুষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ করেছেন।

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মাঘের শুরুতে শীতের দাপট দেখা দিলেও সপ্তাহ পার হতে না হতেই তা কিছুটা স্থিমিত হয়ে আসছে। কিন্তু গতকাল সোমবার ছিল উত্তর-পূর্বাঞ্চেলের প্রান্তিক জেলা সুনামগঞ্জ শহরবাসীর জন্য অনেকটাই ব্যতিক্রম। নিরিবিলি এই শহরবাসীর ঘুম ভাঙ্গে শিশু কিশোরদের কলককলী, হৈ-হুল্লুড় ও ব্যস্ততার মধ্যে। কাক ডাকা ভোর থেকে এই শহরের বালিকারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে ‘বাল্য বিবাহ’ নামক বিয়েকে ‘না’জানাতে। ঘরে ঘরে সে কি উত্সাহ-উদ্দীপনা। মেয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদেরও আনন্দের শেষ নেই। এমন এক অভিশাপকে সরকারি উদ্যোগে বিদায় জানানো হচ্ছে- তা জেনে সবাই আনন্দমুখর। নিজেরাও যোগ দেন সেই সমাবেশে। প্রস্তুত করে দেন তাদের নাবালিকা সন্তানদের। তারা যেন বাল্য বিবাহের কুফল নিজেরই অনুধাবন করে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে নিজের ভবিষ্যত্ জীবনের। তাই সূর্য উঠার সাথে সাথে সবাই শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলানায়তনের দিকে লাইন ধরে রওয়ানা হয়। দৃশ্যটি যে কারো জন্য অভিভুত হওয়ার মত। জেলার ১১টি উপজেলায় একই সময় মেয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাকরা দাড়িয়ে সমম্বরে বিভাগীয় কমিশনার মো: জামাল উদ্দিনের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বাল্য বিবাহকে না বলেছেন। ‘এটি সম্ভাব হয়েছে সকালের প্রচেষ্টায়, মন্তব্য করে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম গতকাল বিকালে ইত্তেফাককে বলেন, ‘গত বছর জানুয়ারিতে ছাতক উপজেলা থেকে আমরা বাল্য বিবাহের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলাম। পরে ১১টি উপজেলায় এই আন্দোলন সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, আমরা সুনামগঞ্জকে পিছনে দেখতে চাই না। শুধু প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।

গতকাল দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে লাখো কণ্ঠে। জেলার লাখো মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলে লাল কার্ড দেখিয়ে সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা দেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ।

মূল অনুষ্ঠান হয় জেলা শহরের শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে তারা মিনিট পাঁচেক ধরে বাল্যবিবাহকে লাল কার্ড দেখিয়েছেন।

সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণার আগে শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বিভাগীয় কমিশনার মো. জামাল উদ্দীন আহমদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাবেরা আক্তার। জেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামরুজ্জামান।

বিভাগীয় কমিশনার মো.জামাল উদ্দীন বলেন, সুনামগঞ্জ আজ ইতিহাসের অংশ হলো। এর আগে এত লোক একসঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শপথ নেয়নি। আজ থেকে সুনামগঞ্জ বাল্যবিবাহমুক্ত হলো।

জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসারে সুনামগঞ্জকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করতে এক বছর ধরে কাজ চলে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতায় আজ জেলাকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হলো। জেলা প্রশাসক জানান গ্রিনিজ বুকে নাম তোলার জন্য তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম অনুসরণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় উপাত্ত পাঠানো হচ্ছে।

অনুষ্টানে বক্তব্য রাখেন ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী, সুনামগঞ্জে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বাবর আলী মীর, সিভিল সার্জন আশুতোষ দাশ, নারীনেত্রী শীলা রায় প্রমুখ।