পায়রা বন্দরে পাখা মেলছে দক্ষিণের কোটি মানুষের স্বপ্ন

দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ পর্যটন সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল। পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চল এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে
পটুয়াখালী প্রতিনিধি
ধান, নদী, খাল এই তিনে বরিশাল_ এমন সস্নোগান নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে দেশের ষষ্ঠ বিভাগ হিসেবে বরিশাল বিভাগের যাত্রা শুরু হয়েছিল। যদিও অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে অপার সম্ভাবনাময় দক্ষিণাঞ্চল আজও অবহেলিত জনপথ হিসেবেই পরিচিত।
অথচ এ অঞ্চলে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ বঙ্গোপসাগর, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, কুয়াকাটাসহ পর্যটন সমৃদ্ধ দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন দ্বীপাঞ্চল। পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চল এগিয়ে নিতে বর্তমান সরকার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশের টাকায় পদ্মা সেতুর নির্মাণ এগিয়ে নেয়ার পশাপাশি এবার পটুয়াখালীতে পায়রা সমুদ্রবন্দর স্থাপনের কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী ইউনিয়নে রামনাবাদ চ্যানেলের পশ্চিম তীরে প্রায় সাত হাজার একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে দেশের তৃতীয় এই সমুদ্রবন্দর।
এর বাইরে ১৬ একর জমিতে চলছে লাইট হাউস নির্মাণ ও রাজপাড়া থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত চার লেনের সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ। ২০২৩ সালের মধ্যে বন্দরের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
ইতোমধ্যে রামনাবাদ চ্যানেলে ৬টি বৈদেশিক বাণিজ্যিক জাহাজ মালামাল খালাস করেছে। জাহাজগুলো ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পানামা ও চীন থেকে এসেছে। এর মাধ্যমে ১২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। পায়রা পোর্ট পেয়েছে ৪০ লাখ টাকা। জাহাজকেন্দ্রিক কর্মকা-ের সঙ্গে প্রায় ৪ হাজার মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছে। ফলে অঞ্চলে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঝড়ঝঞ্ঝা, বিক্ষুব্ধ এ অঞ্চলের মানুষের এক সময় কৃষি এবং মাছ ধরা ছিল প্রধান পেশা। ধুঁকে ধুঁকে চলা পেশার চলন শক্তিতে গতির সঞ্চার ঘটেছে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কারণে। এই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ ঘিরে এবং কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখে এ অঞ্চলের মানুষ স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। সকলেরই প্রত্যাশা বন্দর পুরো মাত্রায় চালু হলে এ অঞ্চল ঘিরে গড়ে উঠবে শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক আধুনিক শহর। গড়ে উঠবে বাণিজ্যিক এলাকা, বিমানবন্দর, পোর্টকেন্দ্রিক শিল্প এলাকা ও পর্যটন এলাকা। ইতোমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-পায়রা বন্দর ২৪০ কিলোমিটার রেললাইন স্থাপনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটি ২০২৪ সালে শেষ হওয়ার কথা। পায়রা বন্দরে টার্মিনাল-জেটির পাশাপাশি তেল শোধনাগার, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট অঞ্চল, বিমানবন্দর এবং জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের ব্যবস্থাও থাকবে। বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত মাস্টারপ্ল্যান। এতে কর্মসংস্থান হবে ৫ থেকে ১০ লাখ মানুষের। পরোক্ষভাবে উপকারভোগী হবে কোটি মানুষ।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, দেশের তৃতীয় ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর’ দক্ষিণ উপকূলের মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে। বন্দর ঘিরে প্রকল্প এলাকায় চলছে বিরামহীন উন্নয়ন কার্যক্রম। শত শত শ্রমিক সেখানে কাজ করছে। পটুয়াখালী সদর থেকে পর্যটন শহর কলাপাড়া উপজেলা সদর হয়ে মানুষ যেতে পারছে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকায়। ভূমি অধিগ্রহণের পর এগিয়ে চলছে চার লেনের সংযোগ সড়কের কাজ। প্রশাসনিক ভবন, ওয়্যার হাউস ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পায়রা বন্দর হতে ঢাকা পযর্ন্ত নৌপথে চলাচলের জন্য নৌবাহিনীর জরিপ ও ড্রেজিং কাজ চলছে। পড়ন্ত বিকালে ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় লেগে যায় বন্দর এলাকায়। প্রকল্প এলাকায় টার্মিনাল স্থাপন করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম। আলোকিত হচ্ছে জনপদ। টানা হয়েছে পল্লী বিদ্যুতের লাইনও। অন্যান্য বন্দরে জাহাজ চলাচলে যেমন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হয়, পায়রা বন্দরে এ সমস্যা নেই। গভীরতা বেশি থাকায় এ রুটে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ চলাচলের সুযোগ রয়েছে।
পুরো প্রকল্পকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি এই তিন ভাগে ভাগ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বহিঃনোঙ্গরে ক্লিংকার, সার ও অন্যান্য বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজ আনয়ন ও লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করা। এরই মধ্যে বর্তমানে বহিঃনোঙ্গর ও রামনাবাদ চ্যানেল ক্লিংকার, পাথর ও সিমেন্ট ক্লিংকার লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করা হচ্ছে। এছাড়া চলছে ক্ষুদ্র পরিসরে পায়রা বন্দর কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের টিওএন্ডই ও প্রবিধানমাল চূড়ান্তকরণ, পায়রা বন্দর প্রকল্প ভূমি অধিগ্রহণ আইন-২০১৫, নৌপথ জরিপ, কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা, সমুদ্র ও নদীপথে নৌপথ নির্দিষ্ট ও প্রয়োজনীয় বয়া স্থাপন করা, জাহাজের রাজস্ব ও শুল্ক পরিশোধ এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে ডেজিং কাজ।
মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে ২০১৯ সালের মধ্যে ১০ মিটার গভীরতার চ্যানেল ড্রেজিং, ১টি কন্টেইনার, ১টি মাল্টিপারপাস ও ১টি বাল্ক টার্মিনালসহ বন্দর অবকাঠামো তৈরি করে বন্দর কার্যক্রম শুরু করা। আর অবকাঠামো উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। মধ্যমমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ভূমি অধিগ্রহণে ৭ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। আর ওই জমির মূল্য বাবদ ২৮৩ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিকমানের দেশীয় ও আঞ্চলিক বন্দর সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় অংশ হিসেবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঢাকা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ, একটি এলএনজি টার্মিনাল, একটি লিকুইট বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ, জাহাজ ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা সংবলিত ডকইয়ার্ড নির্মাণ, বিমানবন্দর নির্মাণ, কুয়াকাটাকেন্দ্রিক পর্যটন ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা স্থাপন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে আরও রয়েছে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬ মিটার গভীরতার ড্রেজিং সম্পন্ন করে পূর্ণাঙ্গ বন্দর সুবিধা গড়ে তোলা।
এ বিষয়ে বন্দরে নিয়োজিত পায়রা পোর্ট অথোরিটির সদস্য (প্রশাসন ও ফিন্যান্স) কমান্ডার এম রফিকুল হাসাইন বলেন, ‘একটি পোর্ট মানে শিল্পাঞ্চল। একটি পোর্ট মানে একটি দেশ। একটি আধুনিক পোর্ট একটি দেশ পর্যন্ত চালাতে পারে। ২০১৮ সালের মধ্যে অন্তত ২টি টার্মিনাল চালু হলেও বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। আর পুরো প্রকল্প চালু হলে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে। শুধু কর্মসংস্থান হিসাব করে এ বিষয়টি বোঝানো যাবে না। সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম কিংবা খুলনার মংলা বন্দরের কথা চিন্তা করলে বোঝা যাবে একটি সমুদ্র বন্দর হলে কি ধরনের উন্নয়ন হয়। সেখানে পায়রা বন্দর হবে আরও আধুনিক ও কার্যকর।’
তিনি বলেন, ‘পৃথিবীতে যত বাণিজ্যিক শহর রয়েছে এর পেছনে রয়েছে সমুদ্রবন্দর। তাছাড়া এখানে একটু ড্রেজিং করলেই সর্বোচ্চ ১৬মি. ড্রাফট (পানিতে নিমজ্জিত জাহাজের গভীরতা) জাহাজ নোঙ্গর করতে পারবে। যা বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা খুলনা ১০ মিটারের নিচে ড্রাফট জাহাজ নোঙ্গর করতে পারে। মোট কথা এই সমুদ্রবন্দর সম্পূর্ণভাবে চালু করা গেলে পৃথিবীর প্রায় সব ধরনেরই জাহাজের পণ্য খালাসের সুবিধা থাকবে।’
১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর, জাতীয় সংসদে পাস হয় পটুয়াখালীর ‘পায়রা সমুদ্রবন্দর’ প্রকল্প। একই বছরের ১৯ নভেম্বর বন্দরের ভিত্তি ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম উদ্বোধন করেন তিনি। পদ্মা সেতুর পাথর নিয়ে আসা এমভি ফরচুন বার্ড থেকে পণ্য খালাসের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় পায়রার। এক হাজার ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের তৃতীয় এই বন্দর নির্মাণ করে এ অঞ্চলকে বিশেষ একটি অর্থনৈতিক জোন গড়ে তুলতে হাতে নেয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও চতুর্মুখী পরিকল্পনা।