উন্নত বাংলাদেশ: স্বপ্ন ও সম্ভাবনা

স্বাধীন দেশ হিসেবে এর জন্মের সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশ এক স্বপ্নতাড়িত দেশ। যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বর্তমান সরকারের প্রতিটি উন্নয়ন-রূপকল্পের ভিত্তিমূলেই রয়েছে সেই স্বপ্নের প্রতিধ্বনি। বলা যায়, দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোর বর্তমান সাফল্যচিত্রের অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল এই স্বপ্নতাড়না।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ক্রয়ক্ষমতার সমতা (Purchasing Power Parity) বিচারে বর্তমানে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৩৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ২০১৬ সালে প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম দ্রুত প্রবৃদ্ধির দেশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ১১, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৬৫ মার্কিন ডলারে। বলা যায়, প্রায় সব নির্দেশকই একটি ভালো অর্থনৈতিক অবস্থার ইঙ্গিতবাহী।
তুলনামূলক বিচারে ২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সময়কালকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের স্বর্ণসময় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। এ সময়কালে প্রথমবারের মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প সামনে রেখে দেশের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে। বস্তুত, রূপকল্প ২০২১ এবং সংশ্লিষ্ট প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১) শুধু দেশের পরিকল্পনা মানচিত্রেই পরিবর্তন আনেনি, পরিবর্তন করে দিয়েছে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সব পথনকশা, যার ফল অবলোকন করা যায় সব আর্থসামাজিক সূচকের ধনাত্মক প্রবণতায়।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে চলতি মূল্যে মোট দেশজ উত্পাদন ছিল প্রায় ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, মাত্র এক দশকের পথপরিক্রমায় তা তিন গুণ বেড়ে গিয়ে বর্তমানে ২২১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন ঘটেছে এর সার্বিক কাঠামোয়। কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতি পরিবর্তন হচ্ছে শিল্পনির্ভর নাগরিক অর্থনীতিতে। এর প্রতিফলন দেখা যায় জিডিপিতে শিল্প খাতের ক্রমবর্ধমান অবদানে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপির এক-চতুর্থাংশ, অর্থাত্ মাত্র ২৫ শতাংশ ছিল শিল্প খাত; বর্তমানে এ অনুপাত ৩১ শতাংশেরও বেশি। একই হারে পরিবর্তন ঘটেছে শিল্প খাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপখাত ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে। ২০০৫-০৬-এ উপখাত ছিল জিডিপির ১৬ শতাংশ, বর্তমানে যা ২০ শতাংশের কোটা অতিক্রম করেছে। ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান না হলেও এ সময়ে পরিবর্তন ঘটেছে জিডিপির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং অনুষঙ্গ বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশে; এক দশক আগে (২০০৫-০৬) এর পরিমাণ ছিল ২৬ শতাংশ। একই সময়কালে জিডিপির অংশ হিসেবে জাতীয় সঞ্চয় ২৮ থেকে ৩১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবণতা অনুযায়ী, প্রায় দ্রুতগতির প্রবৃদ্ধির অনুগামী হয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রেও সফল। বিচক্ষণ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সফল উদাহরণ ছিল উচ্চ প্রবৃদ্ধি হার এবং নিম্ন মূল্যস্ফীতির সমান্তরাল ধারা। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে গড় সাধারণ মূল্যস্ফীতি (ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী) ছিল ৭ শতাংশের বেশি এবং ২০০৭-০৮ অর্থবছরে এ হার ১২ শতাংশ অতিক্রম করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অব্যাহত হ্রাসের ধারা বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।
দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় সমানুপাতিক প্রতিফলন ঘটেছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের একটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, গত আট বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১ কোটি ৩৬ লাখেরও বেশি। এ সময়কালে গড়ে প্রতি বছর ৫ লাখ ২৫ হাজার লোক কর্মোদ্দেশ্যে বিদেশ গমন করেছে। এর পূর্ববর্তী আট বছরে এ গড় ছিল প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার। গত আট বছরে বাংলাদেশের গড় বার্ষিক প্রবাসী আয় ছিল ১৩ বিলিয়ন ডলার, আগের আট বছরে গড় ছিল মাত্র ৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাত্ এ সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। একই ধরনের পরিবর্তন এসেছে অর্থনীতির বহিঃস্থ খাতের অন্যান্য সূচকেও।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি আয় (৩৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার) ২০০৫-০৬-এর রফতানি আয়ের (১০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়কালে আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে তিন গুণের কাছাকাছি। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি ব্যবহার হয় ক্যাপিটাল মেশিনারি, শিল্প খাতের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য ক্রয়ে। বহিঃস্থ খাতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সূচিত হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিতে। ভিত্তি বছর ২০০৫-০৬ বছরের তুলনায় সাড়ে আট গুণ বেড়েছে স্থিতি; মাত্র ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারে। এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম নির্দেশক। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। অথচ ২০০৫-০৬-এ এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৭০০ মিলিয়ন (শূন্য দশমিক ৭ বিলিয়ন) ডলার। বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্তির পরিমাণ ধীরগতিতে বাড়তে থাকলেও জিডিপির অংশ হিসেবে তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। ১৯৯৫-৯৬ সালে জিডিপির অংশ হিসেবে বৈদেশিক সহায়তাপ্রাপ্তির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ; ২০০৫-০৬ সালে এর পরিমাণ হয় ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর হচ্ছে।
সরকারের উন্নয়ন অন্বেষার অন্যতম নিশ্চায়ক হলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার। ২০০৫-০৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ছিল ২৪৫ বিলিয়ন টাকা। ওই বছরের তুলনায় বর্তমানে প্রায় সাড়ে চার গুণ বেড়ে সরকারের উন্নয়ন বাজেটের মূল এ অংশের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১০৭ বিলিয়ন টাকা। শুধু সরকারি ব্যয়ই নয়, সরকারের আয়েও এসেছে গুণগত ও পরিমাণগত ব্যাপক পরিবর্তন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল ১ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকার বেশি; পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এ আয় ছিল জিডিপির ১০ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল মাত্র ৪৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থাত্ এক দশকের ব্যবধানে রাজস্ব আয় বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
অবশ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃষি খাতে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমির বিপরীতমুখী চাপ সত্ত্বেও বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্যশস্য উত্পাদন ১৯৭২-৭৩ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উত্পাদনে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয়। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সাফল্য ছিল অভাবনীয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ সুপেয় পানির মাছ উত্পাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান অর্জন করে এবং শিগগিরই অভ্যন্তরীণ মত্স্য চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণে সক্ষম হবে।
অর্থনৈতিক সূচকগুলোর ধনাত্মক ছাপ পড়েছে সামাজিক সূচকগুলোয়ও। ১৯৯৫-৯৬ সালে মাথাগুনতি দারিদ্র্যের হার (উচ্চ দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী) ছিল ৫০ দশমিক ১ শতাংশ, অর্থাত্ মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি; ২০০৫ সালে তা মাত্র ১০ শতাংশ হ্রাস করে ৪০ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছরে তা প্রায় ১৭ শতাংশ হ্রাস করে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে আসা হয়েছে। এ এক অভূতপূর্ব সাফল্য। ২০১৫ সালে মোট প্রজনন হার নেমে এসেছে ২ দশমিক ১-এ। অর্থাত্ প্রায় প্রতিস্থাপন পর্যায়ে ২০০৫ সালে এ হার ছিল ২ দশমিক ৪৬। ২০০৫ সালে জন্মমুহূর্তে প্রত্যাশিত জীবনকাল ছিল ৬৫ দশমিক ২ বছর; ২০১৫ সালে তা ৭০ দশমিক ৯ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার ২০০৫ সালের ৬৮ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৬-এ, অর্থাত্ প্রায় অর্ধেকে। একই ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে মাতৃমৃত্যুর হারে। ২০০৫ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রতি এক লাখে ৩৪৮; ২০১৫ সালে তা ১৭০-এ নেমে এসেছে। শিক্ষার হার (১৫+) ২০০৫ সালের ৫৩ দশমিক ৫ থেকে ২০১৫-তে ৬৪ দশমিক ৬-এ উন্নীত হয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব পরিবর্তন আজ গ্রামগুলোয় খুবই দৃশ্যমান।
রূপকল্প ২০২১-এর সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে সরকার এখন রূপকল্প ২০৪১ নিয়ে কাজ করছে। রূপকল্প ২০৪১ ও সংশ্লিষ্ট দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনার স্বপ্নমূলে থাকবে উন্নত বাংলাদেশ। ২০৪১ সালের বাংলাদেশ হবে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। ৮-৯ শতাংশের প্রবৃদ্ধির দেশ। প্রতিটি মানুষ হবে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষার আলোয় আলোকিত। শতভাগ শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টিলাভে সক্ষম হবে। শতভাগ মানুষ স্যানিটেশন ও সুপেয় পানিপ্রাপ্তির অধিকারী হবে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সব ধরনের বৈষম্যের নিরসন হবে। শতভাগ মানুষ আসবে বিদ্যুত্ সুবিধার আওতায়। উন্নত সড়ক যোগাযোগ ও জলপথ ব্যবস্থার পাশাপাশি বিমান যোগাযোগেও আসবে অভূতপূর্ব পরিবর্তন; বাংলাদেশ হবে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের আকাশ যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র।
রূপকল্প ২০৪১ ও দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা প্রণয়নের আগেই বাংলাদেশ আরো দুটি রূপকল্পভিত্তিক কর্মযজ্ঞে পরিব্যাপ্ত হয়েছে। এর প্রথমটি আন্তর্জাতিক, যা টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য (এসডিজি) হিসেবে পরিচিত। জাতিসংঘের অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি অভীষ্ট লক্ষ্য ও ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বদ্ধপরিকর। মূলত প্রথম থেকেই এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ছিল অন্যতম স্বতঃপ্রণোদিত সক্রিয় রাষ্ট্র। এসডিজির প্রাথমিক প্রস্তাবনা প্রেরণে এটি ছিল প্রথম দেশগুলোর একটি। এরই মধ্যে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের আওতায় মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা নির্ণয় করা হয়েছে। চিহ্নিত করা হয়েছে তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থার ঘাটতিগুলো। সহস্রাব্দ উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যের বাস্তবায়ন সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যের সম্ভব সব লক্ষ্য অর্জনে আশাবাদী। বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এসডিজির লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রয়েছে— ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের চরম দারিদ্র্যের মূলোত্পাটন; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সবার জন্য স্থানীয়ভাবে উপযুক্ত সামাজিক নিরাপত্তা বাস্তবায়ন; ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা দূরীকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের অপুষ্টি দূরীকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই খাদ্য উত্পাদন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে নবজাতক এবং অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু নির্মূলকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে সব নারী ও পুরুষের জন্য সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চতর শিক্ষার (বিশ্ববিদ্যালয়সহ) সমতা নিশ্চিতকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে জেন্ডারবৈষম্য নির্মূলকরণ এবং ২০৩০ সালের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষায় নারী-পুরুষ সমতায়ন; ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য পর্যাপ্ত, ন্যায়সঙ্গত স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা নিশ্চিতকরণ, জাতীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী মাথাপিছু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখা এবং বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ছাড়িয়ে ৮ শতাংশের ওপর জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন; সবার জন্য ব্যাংকিং, বীমা ও আর্থিক সেবার আওতা ও প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ২০৩০ সালের আগেই সব নাগরিককে স্বেচ্ছা পেনশনের আওতাভুক্ত করা; অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই শিল্পায়ন উত্সাহিতকরণ; ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মৌলিক সুবিধাসংবলিত পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিতকরণ ও বস্তির উন্নয়ন। প্রতীয়মান হয় যে, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের লক্ষ্যে অধিকাংশ লক্ষ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গতি রয়েছে এবং বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চ লক্ষ্য স্থির করেছে। এজন্য দেশের মূলধারার পরিকল্পনা অর্থাত্ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসডিজিকে অঙ্গীভূত করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে অষ্টম ও নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো বাস্তবায়ন হবে।
বাংলাদেশের রূপকল্পভিত্তিক অন্য পরিকল্পনাটি মূলত একটি মহাপরিকল্পনা, যা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা (ডেল্টা প্ল্যান) নামে খ্যাত। স্থানিক ও কালিক ব্যাপ্তিতে এটি ব্যাপক এবং দেশের ইতিহাসে প্রথম। দেশের আর্থসামাজিক ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের জন্য ২১০০ সাল পর্যন্ত এটি বাস্তবায়ন হবে। এ পরিকল্পনা প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস করে জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে কৃষি, পানিসম্পদ, ভূমি, শিল্প, বনায়ন, মত্স্যসম্পদ প্রভৃতিকে গুরুত্ব প্রদানপূর্বক সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুষ্ঠু পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি (৫০ থেকে ১০০ বছর) মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো হচ্ছে— ১. বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন-সম্পর্কিত বিপর্যয় থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ২. পানি ব্যবহারে অধিকতর দক্ষতা ও পানির পর্যাপ্ততা বৃদ্ধি করা ৩. সমন্বিত এবং টেকসই নদী ও নদীমোহনা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা ৪. জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং এগুলোর যথোপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করা ৫. অন্তঃ ও আন্তঃদেশীয় পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও ন্যায়সঙ্গত সুশাসন গড়ে তোলা এবং ৬. ভূমি ও পানিসম্পদের সর্বোত্তম সমন্বিত ব্যবহার নিশ্চিত করা। এ পরিকল্পনায় কৃত প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, যদি পরিকল্পনায় প্রস্তাবিত কৌশল অবলম্বন করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ খুব সহজেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভের জন্য প্রয়োজনীয় ৫ হাজার ৩৭২ ডলারের মাথাপিছু জিডিপি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে।
অবশ্য এসব রূপকল্পের বাস্তব রূপায়ণে প্রয়োজন সম্মিলিত আন্তরিক প্রচেষ্টা। জাতি হিসেবে ক্রমান্বয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে রাজস্ব আয় জিডিপির ২০ শতাংশের ওপর উন্নীত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন কর কাঠামোর সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস, প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং ভ্যাট আইন গ্রহণ করতে হবে। অর্থনীতিকে আরো বাজারমুখী করতে হবে। বাজার অর্থনীতিই পারে সর্বোচ্চ কর্মচঞ্চলতা সৃষ্টি করতে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য শিক্ষার সর্বোচ্চ মানোন্নয়ন ঘটাতে হবে। সর্বোপরি সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্নপূরণে আমাদের পরিকল্পিত কৌশলমালার কার্যকর ও দক্ষ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
(১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ব্যাংক শাখা আয়োজিত বর্তমান সরকারের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ও সম্ভাবনা শীর্ষক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রদত্ত ভাষণ।)

লেখক: সদস্য (সিনিয়র সচিব), পরিকল্পনা কমিশন