দস্যুতা কমায় চট্টগ্রাম বন্দরে নৌ সীমানা অনেক নিরাপদ

চট্টগ্রাম বন্দর নৌ সীমানায় সাগরে দস্যুতার ঘটনা একেবারে কমে এসেছে। গত ২০১৫ সালে বাণিজ্যিক জাহাজে যেখানে দস্যুতা ঘটেছে ১০টি, ২০১৬ সালের পুরো বছরে সেটি নেমেছে মাত্র দুটিতে। এর মধ্যে একটি দস্যুতা ঘটেছে, আরেকটি ঘটার চেষ্টা হয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙর এলাকা বিদেশি জাহাজ চলাচলে অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে সংঘটিত সশস্ত্র ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরি প্রতিরোধে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংগঠন রিক্যাপের বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানা গেছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।

দস্যুতার ঘটনা একেবারে কমে আসায় চট্টগ্রাম বন্দরের নৌ সীমানা ও সীমানার বাইরে কুতুবদিয়া এলাকায় বিদেশি জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তিও বিশ্বে উজ্জ্বল হয়েছে।

কিভাবে এই সফলতা এসেছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালিদ ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্যাসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (ভিটিএমআইএস) পরিধি ১৬ কিলোমিটার বাড়িয়ে আরো বেশি নজরদারি করা হচ্ছে। আর নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড দস্যুতার কোনো অভিযোগ পেলে ১০ মিনিটের মধ্যে যাতে সরাসরি সাগরের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে সে জন্য ১৫ নম্বর ঘাটের কাছে একটি রেডি রেসপন্স বার্থ স্থাপন করা হয়েছে। বন্দরের জমি লিজ দিয়েই সেটি করা হয়েছে। এতে করে বহির্নোঙরে দস্যুতা কমে গেছে। ’

বন্দর চেয়ারম্যান আরো বলেন, দস্যুতার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে ভিটিএমআইএস সিস্টেমকে আপগ্রেড করার কাজ চলছে। আর নিজস্ব উদ্যোগে নজরদারির জন্য হাইস্পিড জাহাজ এবং হেলিকপ্টার কেনার প্রক্রিয়া চলছে। সেগুলো সম্পন্ন হলে একেবারে মাছ ধরার জাহাজও দিনে-রাতে নজরদারির মধ্যে থাকবে।

বহির্নোঙর ছাড়াও বন্দর নৌ সীমানার মধ্যে থাকা সব স্থাপনা, রিভার মুরিং, জেটি, টার্মিনালকে আরো বেশি নজরদারির মধ্যে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে বন্দর চেয়ারম্যান জানান।

রিক্যাপের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা আছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙর এলাকায় দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে শুধু একটি। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ‘সি স্টার’ নামের সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজে বহির্নোঙরের ‘বি অ্যাংকরেজে’ দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। সেটি ক্যাটাগরি-৪ টাইপের অর্থাত্ রশি চুরির ঘটনা। আর একটি ঘটনা ঘটার চেষ্টা হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতির কারণে দস্যুরা সফল হয়নি। রিক্যাপ প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তার উন্নতি হওয়ায় প্রশংসা করা হয়েছে।

রিক্যাপ তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, ২০১২ সালের পুরো বছরে দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ১১টি, ২০১৩ সালে ছয়টি, ২০১৪ সালে ১৬টি এবং ২০১৫ সালে ঘটেছে ১০টি। আর ২০১৬ সালে ঘটেছে মাত্র একটি।

রিক্যাপের ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনের চেয়ে বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। অবশ্য ২০১৬ সালে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে কোনো দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। ২০১৬ সালে ভারতে দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ১২টি। এই সময়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক ৩২টি ঘটনা ঘটেছে ইন্দোনেশিয়ায়। সেই হিসাবে ইন্দোনেশিয়া জাহাজ চলাচলে বিগত বছর অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

জাপানভিত্তিক শিপিং কম্পানি কে লাইনের নির্বাহী পরিচালক সাহেদ সারোয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাইবেরিয়ায় জাহাজ হাইজ্যাকের সঙ্গে বাংলাদেশের ছোট রশি চুরির ঘটনাকে দস্যুতা হিসেবে গণনা করায় বাংলাদেশ অনেক বেকায়দায় পড়ত। জাহাজ ভাড়া দিতে গড়িমসি করত, বেশি ভাড়া চাইত। এখন সেটি অনেক কমে এসেছে। ফলে বিশ্বে বন্দরের ভাবমূূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে। ’

দেশের বহির্নোঙরে সংঘটিত চুরি-ডাকাতির ঘটনার বাড়লে বিদেশি জাহাজের দেশে চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পণ্য পরিবহনে বাড়তি জাহাজ ভাড়া আরোপ করায় বিপাকে পড়তে হয় দেশীয় আমদানি-রপ্তানিকারকদের। বেশ কয়েক বছর আগে দস্যুতা বেড়ে যাওয়ায় একসময় ‘পাইরেসি বন্দর’ হিসেবে চট্টগ্রামকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রামের নির্বাহী সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘ধীরে ধীরে অনেক ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর সাফল্য অর্জন করছে, দস্যুতার ঘটনা একেবারে কমে আসা তার একটি কারণ। বন্দরকে এই অর্জন ধরে রেখে দস্যুতার ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এটি করা গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে এটি নতুন মাইলফলক হবে। ’

সাগরে দস্যুতা প্রতিরোধে কাজ করে মূলত তিনটি প্রতিষ্ঠান। কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রথম দুটি প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও মূলত ভাবমূর্তির সংকটে পড়তে হয় বন্দরকে। কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বাড়াতে ৯৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি জাহাজ কেনা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি জাহাজ কোস্ট গার্ডের বহরে যুক্ত হয়েছে। বাকি দুটি জাহাজও ছয় মাসের মধ্যে যুক্ত হবে।

এ বিষয়ে কোস্ট গার্ড পূর্বাঞ্চলের প্রধান ক্যাপ্টেন শহীদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, বেশি ক্ষমতার দুটি জাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ায় ২০০ নটিক্যাল মাইল সমুদ্রসীমায় দস্যুতা প্রতিরোধে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হচ্ছে।