দশ হাজার কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া

বাজার খুলে দেয়ার এক সপ্তাহ পরেই মালয়েশিয়া সরকার প্লান্টেশন খাতে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে। অনলাইনে এই কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এবার কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও ইন্স্যুরেন্স সুবিধা থাকছে। দালালমুক্ত নিয়োগে খরচও অনেক কম হবে। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর গত ১২ জানুয়ারি মালয়েশিয়া বাজারটি খুলে দেয়। চাহিদাপত্র পাওয়ার মাধ্যমে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত হলো। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলর মোঃ সাইদুল ইসলাম চাহিদাপত্র হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের কিছু কাজ সত্যায়ন করা হয়েছে। অনলাইন সিস্টেম ঠিক থাকলে শিগগিরই বড় অংকের কর্মী বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া চাকরি নিয়ে আসবেন। এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান

মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ায় আমাদের হাইকমিশনে চাহিদাপত্র এসেছে। চাহিদাপত্র অনুযায়ী আগামী মাসেই শুরু হচ্ছে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাজারটি খুলে যাওয়ায় আমরা খুশি। প্রথম দফায় ৯ থেকে ১০ হাজার কর্মী প্লাটেশন খাতে নিয়োগ হবে। গত ১২ জানুয়ারি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে সব ধরনের কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে মালয়েশিয়া। মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়ার চিঠির জবাব দেয় ১৬ জানুয়ারি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানানো হয়। বলা হয়, বাংলাদেশও কর্মী পাঠাতে প্রস্তুত।

সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারীভাবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ রেখে উভয় দেশের মধ্যে ‘জিটুজি প্লাস’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির পরের দিনই মালয়েশিয়া সরকার বিদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ ঘোষণা করে। কয়েক মাস আগে বিদেশী কর্মী না নেয়ার ঘোষণাটি প্রত্যাহারের পর জিটুজি প্লাস চুক্তির আলোকে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি আবারও সামনে চলে আসে। প্লান্টেশন, এগ্রিকালচার, ম্যানুফাকচারিং, কনস্ট্রাকশনসহ মোট ৫টি খাতে বিপুলসংখ্যক কর্মী নেয়ার ঘোষণা দেয় মালয়েশিয়া সরকার।

মালয়েশিয়া সরকারের চাহিদাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনুকূলে যে চাহিদাপত্র ইস্যু হয়েছে তাতে ৩ বছর কাজের সুযোগ রাখা থাকবে। এখান থেকে কর্মীরা টানা ১০ বছর পর্যন্ত নবায়ন চাকরির পারমিট নবায়ন করতে পারবেন। কর্মীদের দৈনিক কর্মঘণ্টা হবে ৮ ঘণ্টা। কেউ চাইলে ওভারটাইম করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সরকারের শ্রম আইন প্রযোজ্য হবে। কর্মীদের মাসিক বেতন চুক্তিপত্রে যা উল্লেখ থাকবে তাই দেয়া হবে। এর কম হবে না। কর্মীদের বেতন যাবে ব্যাংক এ্যাকাউন্টে। কোন কোম্পানি যদি কর্মীদের বেতন ভাতা কম দিতে চায় তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্তা চলে যাবে দুই দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে। অনলাইন প্রক্রিয়ার কারণে একটি ধাপের সঙ্গে অন্যটি ম্যাচ না করলে অনলাইন সিস্টেম কাজ করবে না বলে দেশটির অনলাইন কোম্পানি বেস্টিনেট জানিয়েছে। জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে কর্মীদের বায়োমেট্রিকের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের পর কর্মীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা পর্যন্ত আসতে কোন প্রকার টাকা কাউকে দিতে হবে না। স্বাস্থ্য পরীক্ষা ‘ওকে’ হলে তখন নির্দিষ্ট এজেন্সির কাছে নির্ধারিত টাকা জমা দিতে হবে। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা প্রসেস হবে। বর্তমান ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একজন কর্মীর নিয়োগ পেতে ৩ থেকে ৯ মাস সময় লেগে যাচ্ছে। অনলাইনে নিয়োগ হবে দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে। নতুন পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগের কারিগরি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেট মালয়েশিয়ার দু’টি কোম্পানি।

সম্প্রতি মালয়েশিয়া সরকারের দুই সহযোগী সংস্থা সিনারফ্লাক্স ও বেস্টিনেট নামের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, মোট ১২টি ধাপ অনুসরণ করে বাংলাদেশ থেকে অনলাইন পদ্ধতিতে কর্মী নেয়া হবে। অনলাইন প্রক্রিয়ায় কর্মী নেয়া শুরু হলে প্রতারণা বন্ধ হবে। দালাল চক্রের হাত থেকে রেহাই পাবে নিরীহ দরিদ্র কর্মীরা। তখন অল্প খরচে একজন কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন। কম খরচে আসতে পারলে তাদের খরচের টাকা অল্পদিনের মধ্যে উঠে যাবে। পরে কর্মীরা যতদিন কাজ করবেন ততদিন তাদের ভাল একটা টাকা জমবে।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় দশ লাখের বেশি অবৈধ কর্মী দালাল চক্রের কাছে জিম্মি রয়েছে। দেশ থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া পর্যন্ত কোথাও মুক্তি নেই এই কর্মীদের। ঘাটে ঘাটে দালাল চক্র কর্মীদের শোষণ শাসন করছে। বৈধ হওয়া ও মালিকের কাছে কাজ পাওয়া, সব জায়গাতেই দালালকে টাকা দিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে কর্মীদের। দ্বিতীয় দফায় মালয়েশিয়ায় কর্মীদের বৈধ হওয়ার সুযোগ ঘোষণার কথা শুনেই ১০ হাজারের বেশি দালাল মিলে গড়ে তুলেছে ভয়ঙ্কর চক্র। তারা কর্মীদের বৈধ করে দেয়ার নামে ৫ থেকে ৮ হাজার রিংগিত জনপ্রতি নিচ্ছে। যদিও বৈধ হতে ১২শ’ রিংগিত জমা দিয়ে আবেদন করতে হয়। কিন্তু বৈধ হওয়ার শেষ সুযোগ চলে গেছে গত ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে কর্মীদের বৈধ হওয়ার জন্য আবার সুযোগ দেয়ার। কিন্তু এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার সরকার কোন ঘোষণা দেয়নি। তবে আবার সুযোগ দিতে পারে বলে হাইকমিশন জানিয়েছে।