২৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব ॥ বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিট

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আয়োজিত শিল্প সম্মেলন ‘বেঙ্গল গ্লোবাল বিজনেস সামিটের প্রথম দিনে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।

এই বিনিয়োগকে দু’হাত বাড়িয়ে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, সরকার হিসেবে নয়, বাংলাকে বরং পরিবার হিসেবে গণ্য করুন বিনিয়োগকারীরা। তিনি বলেন, আমি আমার ভাই-বোনের কাছে লগ্নি চাইছি। গত বছর মমতা দাবি করেছিলেন, তার সরকার শিল্পপতিদের কর্মী হিসেবে কাজ করবে। এবার আর এক ধাপ এগিয়ে বিনিয়োগকারীদের ‘পরিবারের’ সদস্য হওয়ার আহ্বান জানালেন তিনি।

শুক্রবার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে শিল্প সম্মেলন। এবার তা তৃতীয় বছরে পা দিল। উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ও রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জাঁকজমক বাড়িয়ে শিল্পকর্তাদের সঙ্গে সংখ্যায় পাল্লা দিয়ে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদ। বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, দক্ষিণ কোরিয়ার ইঞ্চিয়নের মেয়র থেকে শুরু করে জার্মানি, চীন, পোল্যান্ড, জাপান, ইতালি, নেদারল্যান্ডসের প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছেন এ সম্মেলনে। শিল্পমহলের তরফে ছিলেন ভারতী এন্টারপ্রাইজের রাকেশ ভারতী মিত্তল, ফিউচার গোষ্ঠীর কিশোর বিয়ানি, টিসিজি গোষ্ঠীর পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, হিরো সাইকেলের পবন মুঞ্জল, আরপিএসজি গোষ্ঠীর সঞ্জীব গোয়েনকা, জেকে পেপারের হর্ষপতি সিঙ্ঘানিয়া, টিআইএলের সুমিত মজুমদারের মতো পরিচিত মুখ। কর্পোরেট জগতের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা গেছে আইটিসির সঞ্জীব পুরী, গোল্ডম্যান স্যাক্সের সঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়, ব্ল্যাকস্টোনের গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাক্তন ইনফোসিস কর্তা মোহনদাস পাই এবং আরও অনেককে।

সম্মেলনে গোয়েন?কা গোষ্ঠীর আর পি সঞ্জীব ১০,০০০ কোটি টাকা, গেইল ৬,৫০০ কোটি টাকা, গ্রেট ইস্টার্ন এনার্জি ৬,০০০ কোটি টাকা, ভারতী গোষ্ঠী ৩,০০০ কোটি টাকা, টিসিজি গোষ্ঠী ১,০০০ কোটি টাকা এবং হিরো সাইকেল ৪০০ কোটি টাকা। তবে লগ্নির প্রতিশ্রুতি দিলেও ফিউচার গোষ্ঠী জানায়নি বিনিয়োগের অঙ্ক।

অবশ্য উল্লেখযোগ্যভাবে রাজনৈতিক মহলের ভিড় এ বছর তেমন ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ রাজ্যের চার মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু তার বাইরে রাজনৈতিক মহলের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। আর রাজনৈতিক প্রসঙ্গও প্রায় টানেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং বিনিয়োগ টানতে তার শর্তই প্রাধান্য পেয়েছে বক্তব্যে। জমি, উন্নত পরিকাঠামো, উৎপাদিত পণ্যের বাজার, সহজে ব্যবসা করা, পর্যাপ্ত বিদ্যুত, দক্ষ শ্রমিক ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা লগ্নির এই প্রাথমিক শর্তগুলো উঠে এসেছে তার মুখে। তবে নোট বাতিলের কথা উঠেছে। তিনি বলেছেন, নোট নাকচের জেরে ঢিমেতালে চলছে অর্থনীতি। তবুও বলছি এখানে বিনিয়োগ করুন। কারণ ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিতে আমরা সব রকমভাবে প্রস্তুত।

পরিসংখ্যান দিয়ে এ দিন মমতা জানান, গত পাঁচ বছরে রাজ্যের অর্থনীতির মাপ ৪.৬ লাখ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.৫ লাখ কোটিতে। রাজ্যের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে সওয়াল করেছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, গত ৬-৭ বছরে রাজ্যের চেহারা বদলেছে। বাংলা সত্যিই বিনিয়োগের গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে। যার উপকরণ হিসেবে এখানকার উপযুক্ত পরিকাঠামো, বিদ্যুত, দক্ষ শ্রমিক ও রাজনৈতিক স্থিরতার কথা বলেছেন প্রণব বাবু।

লগ্নির প্রাথমিক শর্ত পূরণে রাজ্য যে সফল, তা জানিয়েছে শিল্পমহলও। পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীব গোয়েন্কা থেকে শুরু করে পবন মুঞ্জল, কিশোর বিয়ানিড় সকলেই বলেন ব্যবসা করতে গিয়ে রাজ্যের শিল্পবান্ধব মুখই দেখতে পেয়েছেন তারা। বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, সদস্য না হয়েও আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাংলাদেশ ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ থেকে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক যাত্রী এবং পণ্য পরিবহনের চমৎকার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, ভারতকে সব সময় কৌশলগত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে অগ্রাধিকার দেয় বাংলাদেশ। শিল্প ক্ষেত্রে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাণিজ্য বহুমুখীকরণের মাধ্যমে দুই দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে উভয় দেশের সরকার ইতোমধ্যে বেশকিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমানা চুক্তির বাস্তবায়ন, বর্ডার হাট চালু, ভারতীয় সেকেন্ড লাইন অব ক্রেডিট চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উন্নয়নে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রদান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপন, নতুন ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন, ল্যান্ড পোর্ট স্থাপন, ত্রিপুরা থেকে বাংলাদেশের কুমিল্লায় ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত এবং ১০ জিবি ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ সরবরাহ ইত্যাদির কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ একটি আকর্ষণীয় স্থান। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতোমধ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। দেশের বিনিয়োগনীতি এবং শিল্পনীতি আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় সেবা ও ইনসেনটিভ জোরদার করা হয়েছে।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, সড়ক, মহাসড়ক, বন্দরসহ যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০০টি ইকোনমিক জোন গড়ে তুলছে সরকার। বাংলাদেশে বিরাজমান স্থিতিশীল পরিবেশে ভারতীয় শিল্পোদ্যোক্তারা নিশ্চিন্তে বিনিয়োগ করতে পারে। বাংলাদেশে উৎপাদিত শিল্পপণ্য ভারতে পুনঃরফতানির সুযোগ রয়েছে। ভারতের উদ্যোক্তারা চাইলে তাদের জন্যও বিশেষায়িত শিল্পাঞ্চল বরাদ্দ দেয়া হবে।

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, সফ্টওয়্যার নির্মাণ, প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, জাহাজ নির্মাণ, হিমায়িত মৎস্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, ওষুধ, প্লাস্টিক, ফার্নিচার, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিভিত্তিক পণ্য, পর্যটন ও বিজনেস প্রসেস আউট সোর্সিং, অটোমোবাইল, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ গবেষণা, চা ও পর্যটন শিল্প খাতে বিনিয়োগের জন্যও ভারতের উদ্যোক্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।