অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে সন্দ্বীপের চর

বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত সন্দ্বীপ উপজেলার একসময় সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ এলাকা ছিল সন্তোপুর, আমানুল্লাহ ও দীর্ঘাপার ইউনিয়ন। এসব এলাকার হাজার হাজার বাস্তুহারা মানুষ সন্দ্বীপ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। তবে সেই ভাঙন থেকে প্রায় তিন দশক আগে চরের দেখা মেলে সন্দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলটিতে। আর সেই জেগে ওঠা চরকে কেন্দ্র করে বিশেষ অথনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করছে সরকার। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় উদ্যোগী হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নকারী সংস্থা বেজা। ভূমি জরিপের জন্য জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যতের জন্য সন্দ্বীপ উপকূলে জেগে ওঠা জমি শিল্পায়নে ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হবে উল্লেখ করে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামে অর্থনৈতিক অঞ্চলের আরেকটি গন্তব্য হচ্ছে সন্দ্বীপ। এর উপকূলে যে বিশাল চর জেগে উঠেছে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে সন্দ্বীপকে ঘিরে। জেগে ওঠা চরটিতে যথাযথ সার্ভে করে বেজার আওতায় নিয়ে আসা হবে। জিওলজিক্যাল সার্ভে বিভাগকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা ইতিমধ্যে সার্ভে সম্পন্ন করেছে। আশা করছি খুব দ্রুত সেই রিপোর্ট পেয়ে যাব। ’

পবন চৌধুরী আরো বলেন, ‘আড়াই বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় যে জমি জেগে উঠবে তা জেলা প্রশাসন কাউকে বরাদ্দ দিতে পারবে না। সরকার নিজেই জেগে ওঠা ভূমির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। ’

সম্প্রতি সন্দ্বীপের সবুজ চরের সন্তোষপুর অংশে উপকূলীয় বাঁধে দাঁড়িয়ে যত দূর চোখ যায় শুধু বিস্তীর্ণ চর। জায়গায় জায়গায় খড়ের গাদা। চরজুড়ে গবাদি পশুর রাজত্ব। গরু, মহিষ চড়ে বেড়ালেও বিভিন্ন জায়গায় ঘেরাও দিয়ে ভেড়ার বাথান গড়ে তোলা হয়েছে। সন্তোষপুর, আমানুল্লাহ এবং দীর্ঘাপার ইউনিয়ন নিয়ে মূলত গড়ে উঠেছে এই সবুজ চর। সেখানে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক অজির আহমেদের সঙ্গে। ভাঙনে বাস্তুহারা হয়েছিলেন। কিন্তু জেগে ওঠা চরে আবার নতুন করে ঘর বেঁধেছেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সুবিশাল চরে ধান চাষ আর গবাদি পশু পালনই স্থানীয়দের একমাত্র পেশা। তবে সন্দ্বীপের অন্যান্য এলাকায় দুই থেকে তিনটি ফসল হলেও সবুজ চরে মূলত বোরো ধানের এক ফসল করা হয়। যেহেতু গবাদি পশু পালনও একটি লাভজনক পেশা, তাই বাকি সময়টা গবাদি পশু পালন করা হয়। ’ তবে সমুদ্র তীরবর্তী এমন আকর্ষণীয় একটি জায়গা গবাদি পশুর চারণভূমি কিংবা এক ফসলি চাষের জন্য ফেলে রাখা সম্ভাবনার বিশাল অপচয়।

চারদিকে সমুদ্রবেষ্টিত হওয়ায় সড়ক যোগাযোগের অভাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় কিছুটা পিছিয়েই আছে সন্দ্বীপ। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সুবিধা না থাকায় শিল্প-কারখানা এবং নগরায়ণের তেমন কোনো সুবিধা নেই এই দ্বীপটিতে। যদিও এই দ্বীপের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, উপজেলাভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রাপ্তিতে সন্দ্বীপের অবস্থান দ্বিতীয়। তবে বিদ্যুতের সেই বাধাও দূর হতে চলেছে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে সন্দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ১৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ২০১৮ সালে প্রকল্পটি শেষ হবে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সন্দ্বীপের মানুষ প্রথমবারের মতো জাতীয় গ্রিডের আওতায় বিদ্যুৎ সুবিধা পাবে।

সন্দ্বীপে অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মো. সামসুল আরেফিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সন্দ্বীপের ব্যাপারে আমাদের কাছে এখনো লিখিত নির্দেশনা আসেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যেহেতু সন্দ্বীপ একটি সম্ভাবনাময় জায়গা, তাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য কোন জায়গাটি সুবিধাজনক সেটা খুঁজে বের করব। ’

সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লোকমুখে শুনলেও এখনো এ ধরনের কোনো লিখিত নির্দেশনা আমার কাছে আসেনি। যদি এ ধরনের কোনো আদেশ আসে, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। ’

সবুজ চরের আয়তন প্রসঙ্গে মোহাম্মদ জাকারিয়া আরো বলেন, ‘চরটি যেভাবে জাগছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তা নোয়াখালীর স্বর্ণদ্বীপের সঙ্গে মিশে যাবে। শুনেছি এখনই গ্রীষ্ম মৌসুমে হেঁটে সবুজ চর থেকে স্বর্ণদ্বীপে যাওয়া যায়। সবুজ চরে এখনো কোনো ধরনের ভূমি জরিপ হয়নি। তবে আয়তন ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার একরের কম হবে না। এর পুরোটাই সরকারি খাস জমি। ’

সন্দ্বীপ পৌরসভার মেয়র জাফর উল্লাহ টিটু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছোট ছোট শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য সন্দ্বীপে বিসিক প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতি ছিল। এ জন্য বেশ কয়েকটি জায়গাও দেখা হয়েছিল। কিন্তু পরে আর বিষয়টি সেভাবে এগোয়নি। তবে এখন শুনেছি, প্রধানমন্ত্রী নিজেই সন্দ্বীপে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আগ্রহী। এটা যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে সন্দ্বীপবাসীর জন্য হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া। সন্দ্বীপে জেগে ওঠা চরে বিশাল জমি পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। এটা যদি শিল্পায়নের কাজে লাগানো হয় তাহলে পিছিয়ে থাকা সমুদ্রবেষ্টিত এই জনপদটির আর্থসামাজিক অবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। ’