আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরেক ধাপ এগোল দেশ

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে যে সাত খুনের ঘটনা ঘটেছিল, তা ছিল এক বর্বর হত্যাকাণ্ড। এই ঘটনায় র‌্যাব সদস্যদের জড়িত হওয়া ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। হত্যাকাণ্ডের পর জনমনে একটি অদৃশ্য আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হওয়ার পর বিভিন্নভাবে তার ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বিচার বিভাগ যে স্বাধীনভাবে কাজ করছে, এই বিচারের মাধ্যমে তা সঠিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা কারো নেই।

গত সোমবার নারায়ণগঞ্জের ওই রায়ের পর জনমনে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হলো যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অন্যায় করলে তার সাজা এ দেশের মাটিতে হবেই। যেমন সাজা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের, সাজা হয়েছে একাত্তরে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারীদের। এসব বিচারের ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় র‌্যাব সদস্যদের আইনের আওতায় এনে বিচার করে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয়েছে। এই রায়ের পর দেশের সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির সঞ্চার হয়েছে। আমিও ব্যক্তিগতভাবে আনন্দিত হয়েছি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ এই সাত খুনের বিচার।

নারায়ণগঞ্জে হত্যার শিকার হওয়া সাতজনের মধ্যে একজন আইনজীবীও ছিলেন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর আমি নারায়ণগঞ্জে গেছি। সেখানে আইনজীবীসহ সাধারণ মানুষ ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন করেছে, তাদের সঙ্গে শরিক হয়েছি এবং একাত্মতা ঘোষণা করেছি। বিশেষ করে আইনজীবীরা সে সময় যে আন্দোলন করেছেন, তা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা পালন করেছে। নিহত আইনজীবীর বাড়িতে গেছি তাঁর পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে। ওই পরিবারের পিতৃহারা শিশুদের আর্তনাদ শুনেছি, যা আমার মনে আজও দাগ কাটে। স্বামীহারা স্ত্রী আর পিতৃহারা সন্তানদের আর্তনাদ পুরো নারায়ণগঞ্জের আকাশ স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আমি শুধু সান্ত্বনাই দিয়েছি। পাশাপাশি আইনজীবীর পরিবারকে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজ আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত খুশি হয়েছি যে খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা হয়েছে। ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর সদস্যরাও আনন্দিত হয়েছেন।

সরকারের কোনো পক্ষ থেকে এই বিচারকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়নি। শুধু এই বিচারই নয়, অন্য কোনো বিচারেও সরকার কোনো রকম প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার চায়, এ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক এবং প্রতিটি অন্যায়ের সুবিচার হোক। এটি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন।

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশ কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগও রয়েছে। এই বাহিনীগুলোর কিছু সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে অপরাধ করে থাকেন। এই বিচারের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা হুঁশিয়ার ও সতর্ক হবেন। তাঁদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং ভবিষ্যতে সত্যিকারভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থাকবেন। কোনো অপরাধ করলে কোনোভাবেই কেউ ক্ষমা পাবে না এবং ছাড়ও পাবে না। এ রায়টি সেই বার্তাই বহন করে।

রায়ে দণ্ডিত কয়েকজন প্রভাবশালী র‌্যাব কর্মকর্তাও আছেন। তাঁরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও সেগুলো কোনো কাজ দেয়নি। শেষ পর্যন্ত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই বিচার এটি আবারও স্পষ্ট করল, যে যত শক্তিশালীই হোক, অপরাধ করলে আইনের আওতায় আসতেই হবে। কোনোভাবেই পার পাওয়া যাবে না।

এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকেই অনেকভাবে ভূমিকা পালন করেছেন। নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা সব সময় এই মামলাটিতে ন্যায়বিচারের জন্য সচেষ্ট ছিলেন। বেশ কয়েকজন আইনজীবী এই মামলায় নিরলসভাবে কাজ করেছেন। আমি তাঁদের প্রতি আইনজীবীদের অভিভাবক হিসেবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এ ছাড়া এই মামলার তদন্তকাজে যাঁরা নিয়োজিত ছিলেন, তাঁরাও খুব দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করেছেন এবং আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। ফলে দ্রুতই মামলার বিচারকাজ শুরু করতে পেরেছেন আদালত। আমাদের আদালতগুলোতে বেশির ভাগ ফৌজদারি মামলায় তদন্তে ধীরগতির কারণেই বিচার শুরু করতে বিলম্ব হয়। কিন্তু এই মামলায় সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হয়ে ঠিকভাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন সব ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে। ফলে মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। বেশির ভাগ হত্যা মামলায় সাক্ষীরা আদালতে না আসায় বিচারকাজে বিলম্ব হয়, এখানে সেই সুযোগ দেননি সাক্ষীরা। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন আদালত।

নারায়ণগঞ্জের ওই মামলাটি নিয়ে হাইকোর্টে এসেছিল বাদীপক্ষ। সেখানে আমি একজন বাদীর পক্ষে আদালতে উপস্থিত হয়েছি এবং মামলা পরিচালনা করি। হাইকোর্ট একটি রায় দিয়ে মামলাটির সুষ্ঠু তদন্তের পথ সুগম করে দেন।

এখন এই রায় কার্যকরের পালা। কিন্তু কার্যকর হওয়ার আগে এই মামলাসংক্রান্ত রায়সহ যাবতীয় নথি হাইকোর্টে রেফার করতে হবে। হাইকোর্ট রেফারেন্সের ওপর শুনানির পর মৃত্যুর দণ্ডাদেশ কনফার্ম (নিশ্চিত) করেন। তারপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পালা। হাইকোর্ট কনফার্ম না করা পর্যন্ত রায়টি কার্যকর হবে না। আমাদের সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আমাদের দেশের আদালতগুলো মামলাজটে জরাজীর্ণ। নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার বিচার একটি দৃষ্টান্ত। এ রকম একটি স্পর্শকাতর মামলার বিচারকাজ যে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে, অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রে এই বিচার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এ রকম দ্রুত অন্যান্য মামলাও নিষ্পত্তি করা যায়।

পরিশেষে বলতে চাই, অনেক জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার রায় হয়েছে। এটি ঐতিহাসিক রায়। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো, অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আসতে হবে, শাস্তি পেতে হবে। এ রায়ে দেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরো এক ধাপ এগিয়েছে। রায়ের ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কড়া বার্তা পৌঁছল; ভবিষ্যতে আর কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না।