আট বছরে অর্থনীতির অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন মাথা পিছু জিডিপি ছিল ৭০১ দশমিক ১৭ (মার্কিন ডলার-২০০৮) আর ২০১৬ তে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯৭২ দশমিক ৮৮ মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন যে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এক বিস্ময়কর ঘটনা যা ১০ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। সরকার মানবকল্যাণের জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের ক্ষেত্রে সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে তার ধারাবাহিকতায় আগামী ২০৩০-এর মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বিবিধ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। অর্থনীতির সাফল্যের ক্ষেত্রে একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এ সাফল্য ধরে রাখা। অবশ্য সরকারপ্রধান যেভাবে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, মেলবন্ধন ও অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করছেন তা সত্যিকার অর্থে সুষম বণ্টন পদ্ধতি ও দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার চলতি বছরে ৭.১১% হতে পারে। বিশ্ব বাজার ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে সূক্ষ্ম ক্ষুরধার তরবারির উপর দাঁড়িয়ে অনেক দেশের অর্থনীতি। আর সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সবসময়েই অর্থনীতির নিয়ম হচ্ছে অর্থনীতির সূচকসহ অন্যান্য কারিগরি ও মানবীয় হিসাবগুলো ধারণ করে কিভাবে অর্থনীতিকে এগিয়ে আনা যায় সে জন্য বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার রপ্তানিমুখী আয়ের ক্ষেত্রেও লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রত্যক্ষ কর আদায় ব্যবস্থাপনা যথাযথ না করা গেলেও অপ্রত্যক্ষ কর বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেকাংশে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলা করা যাচ্ছে। দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকারপ্রধানের ইচ্ছায় একটি সময়ে সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিতে নানামুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়ন করেছিলেন। এর অন্যতম হচ্ছে ফাইন্যান্সিয়্যাল ইনক্লুশান। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক আমলানির্ভর হওয়ায় ফাইন্যান্সিয়্যাল ইনক্লুশান অনেকখানি বন্ধ হয়ে গেছে। এটিকে পুনরুজ্জীবিত করা দরকার। সরকারপ্রধান যেহেতু ‘পেটে ভাতের রাজনীতির’ দর্শনে বিশ্বাসী সে জন্য একটি খামার, একটি বাড়ি প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন। তবে যারা এ প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্তমানে জড়িত রয়েছেন তারা কিন্তু তেমন কর্মদক্ষতার পরিচয় দেননি। বরং ছিয়ানব্বই সালে ড. শোয়েব আহমেদের নেতৃত্বে অনেক দক্ষভাবে ‘একটি খামার একটি বাড়ি’ প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রীর দিক-নির্দেশনায় বাস্তবায়িত হচ্ছিল যা পরবর্তীকালে বিএনপি-জামায়াত সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল। সরকারপ্রধান বহু আশা নিয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ এ ব্যাংকটি বর্তমানে অথর্ব হয়ে পড়েছে। একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করে এর মূল্যায়ন করা দরকার।

ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদের নেতৃত্বে পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) জনকল্যাণে তাদের সহযোগী ১৯৫টি পার্টনার অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নে কাজ করে চলেছে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)কে ঢেলে সাজান উচিত। নচেত্ এটি মুখ থুবড়ে পড়া একটি সংস্থায় পরিণত হবে। জনকল্যাণের বিষয়টি উপেক্ষিত হবে। সর্বক্ষেত্রে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য ৬ষ্ঠ এবং ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকার নানামুখী ব্যবস্থা নিয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় ২৮,৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুত। দেশিবিদেশি সব বাধাকে নস্যাত্ করে দিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু তৈরির এ প্রয়াস সাধুবাদযোগ্য।

দেশে বিদ্যুত্ ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগের প্রশংসা করতে হয়। ১,১৮,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে যে, এ প্রকল্পটি সমাপ্ত হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদিত হবে। তবে সস্তায় বিদ্যুত্ উত্পাদনের উপর জোর দেওয়া দরকার।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেতৃত্বে বিশেষ অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে। প্রশাসনযন্ত্র পরিচালনায় ই-গভর্নেসের ব্যাপ্তি ঘটছে। এ পর্যন্ত ৫ হাজার ২শ ৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপিত হয়েছে। ডিজিটালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে এর ভালো দিকগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সাইবার ক্রাইম ঠেকানোর জন্য সাইবার পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সার্বিক কর্মকাণ্ড ঢেলে সাজানো দরকার। আশা করা যাচ্ছে, এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হবে— যা ২০২১ সাল নাগাদ কাজ শুরু করতে সক্ষম হবে।

মেট্রোরেল প্রজেক্টটি সরকার বহু আশা নিয়ে চালু করেছিল। তবে গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গিদের নৃশংসতার কারণে এটি সাময়িকভাবে থমকে দাঁড়িয়েছে। তবে অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠার সর্বাত্মক প্রয়াস অব্যাহত আছে। আবার গ্যাসের সংকট বাড়ছে। এজন্যে এলএনজি টার্মিনাল তৈরি করা হচ্ছে। পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা দরকার—যাতে তারা জলজ গ্যাস উত্তোলনে সহায়তা করতে পারে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট রয়েছে। অর্থনীতিতে নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে।

উল্লেখ্য যে, এ লেখকের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল Social Networking অর্থাত্ সামাজিক নেটওয়ার্কিং নামে একটি তত্ত্ব পরীক্ষা করে দেখছেন। প্রাথমিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর কথাই যথার্থ। ক্ষুদ্র ঋণ নয়, বরং ক্ষুদ্র সঞ্চয় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জনকল্যাণ করে থাকে। গবেষণার মাধ্যমে এটি পরস্ফুিট হয়েছে যে হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যে সামাজিক সম্পর্ক ও বন্ধন নানামুখী প্রতিকূলতার মধ্যেও মানুষের দারিদ্র্যসীমা অতিক্রমে সহায়তা করে থাকে। গ্রামীণ ব্যাংক এখন মান্ধাতার আমলের ধ্যান-ধারণায় কেবল মুনাফামুখী কর্মকাণ্ড করছে। ঋণগ্রহীতাদের ক্ষতি করছে। তবে সরকার বর্তমানে বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা, হিজড়া, দলিত ও বেদে, বয়স্কদের জন্যে নানামুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। সবচেয়ে বেশি হিতসাধনে ব্যাপৃত হয়েছেন সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। আসলে প্রতিবন্ধীদেরও যে অধিকার রয়েছে, সামাজিক মর্যাদা রয়েছে—এ ব্যাপারে আগে কেউ এভাবে ভাবেননি।

শিক্ষা সম্প্রসারণে সরকার সদা সচেষ্ট ছিলেন। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের বইগুলো বয়স অনুপাতে মোটেই শিশুদের উপযোগী নয়। এ ব্যাপারে অবশ্যই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রীকে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নচেত্ সরকারের সাধু প্রয়াস ব্যর্থ হতে পারে। শিক্ষা ক্ষেত্রে অসাধু ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। দেশে অনেক নৌ পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সেগুলো পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা করা দরকার। পায়রায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যায় যে, ২০২১ সাল নাগাদ এটি পূর্ণাঙ্গ বন্দরে রূপান্তরিত হবে। তবে রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নিয়ে একশ্রেণির বাম ও তাদের সহযোগী এক কাতারে শামিল হয়েছে। উন্নয়ন কাজে অনেক ক্ষেত্রেই বাধা আসে, কিন্তু লক্ষ্য স্থির থাকলে তা অবশ্যই অর্জিত হয়। অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নে সরকার দায়িত্বশীলতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন। গ্রামীণ ব্যাংকে দক্ষ ও সত্ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যান নিয়োগ করা দরকার।

সরকার বর্তমানে উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরিতে তত্পর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা স্কুল অব ইকোনোমিক্স উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরির জন্যে শিক্ষামূলক কাজ শুরু করেছে যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আশা করা যায়, সরকারের গৃহীত ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ (রূপরেখা ২০২১ ও রূপরেখা ২০৪১) বাস্তবায়িত হবে। আমরা যথাযথ সময়েই উচ্চ মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হব। পরিবেশ সম্পর্কে সরকারের সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াসের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। সুন্দরবন এলাকা ঘিরে যে ধরনের তত্পরতা দেখা যাচ্ছে এবং দখল চলছে এ ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে সামাজিক প্রতিরোধ বেশি দরকার। আর দরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স। সোনার বাংলায় অসাম্প্রদায়িক চেতনাপুষ্ট সবার জন্যে সমঅধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা দরকার। গত ৮ বছরে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে যে জোয়ার এসেছে তা ধরে রাখতে হলে দক্ষ, সত্ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিবর্গকে বিভিন্ন স্তরে স্ট্র্যাটেজিক লিডার হিসেবে কাজ করতে হবে।

n লেখক :অর্থনীতিবিদ