এবার ‘অপারেশন থান্ডারবার্ড’

সারা দেশে চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে সরকার শিগগিরই বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবার্ড’ শুরু করবে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৩৩টি দেশে ২০ দিনব্যাপী এই অভিযান আগামী ৩০ জানুয়ারি থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। রিজিওনাল ইন্টেলিজেন্স লিয়াজোঁ অফিস ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিকের (রাইলো-এপি) উদ্যোগে এই যৌথ অভিযানে মাঠে সক্রিয় থাকবে পুলিশ ও কাস্টমস। এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমাদের ‘অপারেশন থান্ডারবার্ড’ চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধের পাশাপাশি বাণিজ্য নিরাপত্তা, বাণিজ্য সহায়তা এবং আঞ্চলিক সহায়তা বাড়াতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। আমরা যেমন উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করে রাজস্ব আয় করছি তেমনি অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধেও আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বহাল আছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, চোরাচালান, শুল্ক ফাঁকি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে ২০ দিনের এই বিশেষ ও বিশাল অভিযান আমাদের জন্য বড় ভালো দিক। তার চেয়েও বড় কথা, চোরাচালান প্রতিরোধে বাংলাদেশসহ ৩৩টি দেশ একসঙ্গে কাজ করলে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে অবৈধ বাণিজ্য কমে যাবে, বৈধ বাণিজ্যে উৎসাহিত হবেন ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, বিশ্ব শুল্ক সংস্থার (ডব্লিউসিও) অধীনে রাইলো-এপি গত বছর ৪ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ‘অপারেশন আইরিন’ চালিয়েছে। ওই অভিযানের মতোই এবার অপারেশন থান্ডারবার্ড পরিচালনা করবে এনবিআর। আইরিনে কাস্টমসের সঙ্গে র‌্যাব যুক্ত থাকলেও এবার থাকবে পুলিশ। এই অপারেশন থান্ডারবার্ডে ন্যাশনাল কনটাক্ট পয়েন্ট-এনসিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী পরিচালক দীপা রানী হালদার। পুলিশ সদর দফতর গত ৫ জানুয়ারি শুল্ক গোয়েন্দাকে এই অভিযান সংক্রান্ত চিঠি দিয়েছে। দেশের তিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায়ই ধরা পড়ছে অবৈধভাবে আসা সোনা, সিগারেট, মুদ্রা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক। মানুষের শরীরের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে এবং অভ্যন্তরে লুকিয়ে আনা অবৈধ পণ্যও উদ্ধার হচ্ছে। এমনকি যাত্রীদের পাকস্থলীর ভিতরে করে আনা সোনা কিংবা ইয়াবাও উদ্ধার হয়েছে। এসব ঘটনাকে নিরাপত্তার জন্যে হুমকিস্বরূপ বিস্ফোরক বহনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে শুল্ক গোয়েন্দা। সব মিলিয়ে দেশের জল-স্থল ও আকাশপথে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বন্দরে বন্দরে শুল্ক ফাঁকির যে উৎসব চলছে, তা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখবে অপারেশন থান্ডারবার্ড। কারণ, দেশে বৈধ ও অবৈধ পথে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের সঙ্গে বাড়ছে চোরাচালানও। সব মিলিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা শুল্ক ফাঁকিতে বেপরোয়া। তবে জলে-স্থলে ও আকাশপথের বেপরোয়া চোরাকারবারিদের ঠেকাতে কাস্টমসসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কড়া নজরদারি রাখছে বলে জানা গেছে। এনবিআরের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে অর্থ পাচার হয়, তার ৮০ ভাগই হয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। সময়ের ধারাবাহিকতায় শুল্ক ফাঁকি দিতে চোরাচালানের নতুন নতুন ধারণা ও ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হচ্ছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চোরাচালানের মাধ্যমে হয়। এ ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কাস্টমস ও অন্যান্য দফতর বা সংস্থাসমূহ নিজ নিজ ভূমিকা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করে চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। এর আগে পুলিশের এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাবের সহায়তা নিয়ে গত বছর জুলাইয়ে পরিচালিত শুল্ক গোয়েন্দা অপারেশন আইরিনে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে দেশে আসা অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ ব্যাপক অবৈধ পণ্য উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের অবদান ও উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ধরে রাখতে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে অবৈধ হালকা অস্ত্র, বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য পাচার রোধে এই অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দুষ্কৃত ও পাচারকারী চক্রের কাছে এই অভিযান পুলিশ এবং কাস্টমসের পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা দেবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।