কম সুদে ব্যাংকঋণ পাবেন পাট শিল্পের উদ্যোক্তারা

কম সুদে ব্যাংকঋণ পাবেন পাট শিল্পের উদ্যোক্তারাকম সুদে ব্যাংকঋণ পাবেন পাট শিল্পের উদ্যোক্তারা
উদ্যোক্তাদের জন্য হ্রাসকৃত সুদে ব্যাংকঋণের সুবিধা রেখে পাটনীতি ২০১৬-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। উদ্যোক্তাদের এ প্রণোদনার পাশাপাশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের কৌশলও নির্ধারণ করা হয়েছে খসড়ায়। নতুন এ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পাট শিল্পের সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশের সর্বশেষ পাটনীতিটি ২০১১ সালের। একে সময়োপযোগী করতে নতুন পাটনীতি প্রণয়নের কাজ শুরু করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি এ নীতির খসড়া চূড়ান্ত করেছে এ-সংক্রান্ত কমিটি।
নতুন পাটনীতির খসড়ায় এ খাতের উন্নয়নে নানা কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চফলনশীল পাটবীজ ও উচ্চমানসম্পন্ন পাট উৎপাদন। বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা ও কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে পাটনীতির খসড়ায়।
জানতে চাইলে পাট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোসলেহ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই রূপ দিতে রূপকল্প গ্রহণ করেছে সরকার। এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন পাটনীতি প্রণয়ন করা হবে। এ নীতির খসড়ার কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।
বিজেএমএ সূত্রে জানা গেছে, পাট শিল্প মালিকরা পাটজাত পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে কাঁচামাল সংগ্রহে অনেক সময়ই অর্থায়ন ঘাটতির মুখোমুখি হন। ফলে উৎপাদন মৌসুমে কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। এ সুযোগে অনেক মধ্যস্বত্বভোগী কৃষকদের কাছ থেকে কম মূল্যে কাঁচা পাট কিনে মজুদ করেন। পরে বেশি দামে তা বিক্রি করেন মিল মালিকদের কাছে। এতে মালিকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চাষীরাও বঞ্চিত হন ন্যায্যমূল্য থেকে। এ শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা চালু হয়। কিন্তু অপর্যাপ্ত অর্থ ও উচ্চ সুদহারের কারণে এটি খাত-সংশ্লিষ্টদের স্বার্থরক্ষায় যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছিল না। এ অবস্থায় পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি নীতির আলোকে ব্যাংক সুদহার কমানো হলে পাটকল মালিক ও কৃষক দুই পক্ষের স্বার্থই রক্ষা হবে। এ বিবেচনায় পাটনীতিতে কম সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা রাখার বিষয়টিকে তাই স্বাগত জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তবে এ সহায়তাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যাতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দেয়ার দাবি জানান তারা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি খাতের এক উদ্যোক্তা বলেন, সরকার পাট শিল্পের উন্নয়নে নীতি ও উদ্যোগ নিলেও বেশির ভাগ সময়ই তার কার্যকারিতা থাকে না। তবে নতুন নীতির ক্ষেত্রে এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও তদারকি আশা করছি।
পাট শিল্পের সম্ভাবনার বিষয়ে খসড়ায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম তন্তু আবিষ্কার, প্রসার ও বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের ফলে দেশে-বিদেশে পাটের ব্যবহার ও চাহিদা কমতে থাকে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে ধান চাষকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়ায় কৃষক পাটের আবাদ কমিয়ে দিতে থাকেন। কিন্তু বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় পরিবেশবান্ধব তন্তু হিসেবে আবার পাটের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
নীতি প্রণয়ন-সংশ্লিষ্টদের মতে, শিল্প খাতে এখনো পাট খাত বাংলাদেশের একক বৃহত্তম শিল্প। পাট উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন— প্রতিটি স্তর দেশেই সংঘটিত হওয়ায় পাট খাতে মূল্যসংযোজনের আনুপাতিক হার অন্য যেকোনো খাতের চেয়ে বেশি। দেশের অর্থনীতি ও সার্বিক প্রেক্ষাপটেই পাট শিল্প খাতকে চাঙ্গা করা প্রয়োজন। এজন্য এ খাতের উদ্যোক্তাদের কম সুদে ব্যাংকঋণের ব্যবস্থাসহ একাধিক কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার।
পাট শিল্পের উন্নয়নে পাঁচটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে নতুন পাটনীতির খসড়ায়। এগুলো হলো— মানসম্মত পাট উৎপাদন, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, পাটপণ্যের বহুমুখীকরণ, পাটকলের আধুনিকায়ন ও বাজার সম্প্রসারণ। এগুলো বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাও প্রণয়ন করা হবে। কমিটি ও উপকমিটি গঠনের মাধ্যমে নীতি বাস্তবায়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এসব কমিটি তিন মাস অন্তর বৈঠক করে পাটনীতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
পাট অধিদপ্তরের মাধ্যমে পাট ও পাটপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরো জোরদার করার কথা বলা হয়েছে নতুন পাটনীতির খসড়ায়। উচ্চফলনশীল পাট ও পাটবীজ উৎপাদনেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হবে। এজন্য সব ধরনের সহায়তাও দেয়া হবে তাদের। প্রয়োজনে পরিবর্তন আনা হবে পাট অধিদপ্তরের জনবল কাঠামোয়ও।