সাদা পোশাকে সাকিব-মুশফিকের ঐতিহাসিক অর্জন

বাংলাদেশ বরাবরই ক্রিকেটে ভালো করছে। কিন্তু আমরা বাঙালিরা একটু বেশি আবেগাপ্লুত জাতি। কোনো অর্জনই আমরা বেশিদিন স্মরণে রাখি না। পান থেকে চুন খসলেই আবার কঠোর সমালোচনা শুরু করে দেই। যেন ধৈর্যের বাঁধ মানে না। এটাই হলো আমাদের সমস্যা। এবারে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের নিউজিল্যান্ড সফরের প্রথম দুটি (একটি ওয়ানডে এবং অপরটি টি-টোয়েন্টি) সিরিজের পারফরমেন্স দেখে তাই বাঙালি ক্রিকেটপ্রেমীরা হতাশ হয়ে সমালোচনা শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু সাদা পোশাকে টেস্টে এসে টাইগাররা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কারণ আমরা জানি সিনেমাতে নায়কের উত্থানের কথা। শেষ হাসি তার। আর শত প্রতিকূলতা পিছনে ফেলে নায়ক ঠিকই দাঁড়িয়ে যায়। বাংলাদেশের টাইগাররা ঠিক সেরকমই। প্রত্যেকটি স্থানে তারা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, তারা এখন শুধু বাংলাদেশের টাইগার নয়, বরং সারাবিশ্বের টাইগার হয়ে উঠতে চলেছে। নিউজিল্যান্ডে আবহাওয়ায় এখন বাতাস-বৃষ্টি নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাতাস এমন যে, রাস্তায় মানুষ হেঁটে চলতে পারে না। খেলোয়াড়দের মাথার ক্যাপ পর্যন্ত উড়িয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। যেন ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে এমন মনে হয়। তারপর বৃষ্টি তো রয়েছেই। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টির জন্য খেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা আমরা দর্শক হিসেবে বার বারই দেখতে পেয়েছি। এমন প্রতিকূল পরিবেশে টাইগাররা অভ্যস্ত নয় বলে ওয়ান ডে এবং টি-টোয়েন্টিতে হোয়াইট ওয়াশের মত দুর্ঘটনা ঘটেছে। এখানে এমন কথা বলা যেতেই পারে যে, ‘নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা’। কিন্তু বাস্তবে আসলে তা নয়, যা প্রমাণ করেছে টাইগাররা। তারা ইতিহাসের কিছু সেরা পারফরমেন্স করে দেখিয়ে দিয়েছে তারাও পারে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্টের শুরুটাও খুব ভালো ছিল না। খেলার শুরুতেই মাত্র দলীয় ১৬ রানে আউট হলো একজন। তার পরের ইতিহাস শুধু স্মরণ রাখার। প্রথম দিন শেষে তিন উইকেটে বৃষ্টির জন্য ৪০.২ ওভারে দলীয় ১৫৪ রানের স্কোর নিয়ে সাজঘরে ফিরেছিলেন টাইগাররা। দ্বিতীয় দিনেই গড়লেন সব ইতিহাস। সাকিব-মুশফিক জুটি ৩৫৯ রানের স্কোর করে ৪৩ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন। তার মধ্যে বাঁ-হাতি বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান করেছেন ডাবল সেঞ্চুরির মাধ্যমে ২১৭ রানের বিশাল ব্যক্তিগত সংগ্রহ। অপরদিকে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটের দলীয় অধিনায়ক ব্যক্তিগত ১৫৯ রান তুলে তিনিও ইতিহাস সৃষ্টি করলেন। দ্বিতীয় দিন শেষে ৭ উইকেটে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৪২ রান, যা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বোচ্চ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল এটি যে টাইগাররা এত বেশি কনফিডেন্ট ছিল, তারা বিশাল একটি স্কোর করা সত্ত্বেও তিন উইকেট হাতে রেখে দ্বিতীয় দিনে এসেও তাদের ইনিংস ঘোষণা করেনি। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তৃতীয় দিনের খেলায় ৮ উইকেটে দলীয় ৫৯৫ রানে বাংলাদেশ তাদের ইনিংস ঘোষণা করেছে। জবাবে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড তিন উইকেট হারিয়ে দলীয় ২৯১ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের হাতে রইল আরো দুই উইকেট এবং সামনে আরো অনেক সম্ভাবনার সময়। বাংলাদেশ ২০০০ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করলেও মূলত এ ফরমেটে সাফল্য খুব কমই এসেছে। টেস্টে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল চট্টগ্রাম টেস্টে বাংলাদেশ সফরকারী ইংল্যান্ড দলকে পরাজিত করা। কারণ যেহেতু ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং একের পর এক টেস্টেও ভালো করছে, কাজেই আমাদেরও ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া শুধু উচ্ছ্বাস দিয়ে কিছু অর্জন করা যাবে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে ওয়ানডে এবং টেস্ট স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে আইসিসিকেও অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ক্রিকেট বিশ্বের বড় বড় সব দলের সঙ্গে শুধু জিতেই নয়, হোয়াইট ওয়াশ করে টাইগাররা তাদের সমালোচনার জবাব দিয়েছে। টেস্টেও এমনটি খুব কাছাকাছি বলে মনে করছেন ক্রিকেট বোদ্ধাগণ। কারণ ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে নিয়ে অনেকে ভাবতে শুরু করে দিয়েছেন এবং ভালো ভালো মন্তব্যও করছে, যা গণমাধ্যমে অহরহ প্রকাশিত হয়ে আমাদের মর্যাদা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এভাবেই যেন মর্যাদার দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারি সে বিশ্বাস আমাদের দামাল ছেলেদের উপর রাখতে হবে। যে-কোনো পরিস্থিতিতে টাইগারদের পাশে থাকতে হবে আমাদের। তাহলেই তারা আরো শক্তি ও সাহস পাবে।