পাঁচ বছরের মধ্যে দুই অঙ্কে যাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্ক ছাড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, মহামন্দায় নেতিবাচক ক্ষতি কাটিয়ে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ব্যাষ্টিক সমষ্টির বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৮ শতাংশ, উন্নত বিশ্বে ২.৩ ও অগ্রগামী উন্নয়নশীল দেশে প্রবৃদ্ধি ৫.৪ শতাংশ।

বাংলাদেশের বার্ষিক সামষ্টিক অগ্রগতি ৬.২ থেকে ৭.১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কে উঠে আসবে। আর আগামী ২৫ বছরের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ। ’
গতকাল শনিবার বিকেলে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক লাউঞ্জে ‘আগামী দিনের অর্থনীতি : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ সমিতি ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগ যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে।

বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি বদরুল মুনিরের সভাপতিত্বে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান অবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরে নানামুখী সম্ভাবনা ও বাংলাদেশকে নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যদ্বাণী ও বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিল্প-অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক অগ্রগতি, পোশাকশিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, রপ্তানি আয় ও চামড়াশিল্পের উন্নয়ন তুলে ধরেন। সেমিনারে আরো উপস্থিত ছিলেন পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারমান ড. খলীকুজ্জমান আহমদ, বিআইবিএমের মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শহীদুল হাসান, বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ কে এম কামরুল আহসান প্রমুখ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অর্থনীতিবিদরা।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন আরো বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি বাহাত্তরের চেয়ে বেড়েছে ১৭৪ গুণ। জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৮২ গুণ। ‘বিস্ময়কর’ এই প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতি সঠিক নীতি কৌশল ও সংশ্লিষ্টদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই অর্জিত হয়েছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলা করে বাংলাদেশ সামষ্টিক আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে অতীতের নিরাশাবাদী মূল্যায়নের পরিবর্তে ইতিবাচক ধারা উচ্চারিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক অগ্রগতির কারণ উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, বিশ্বনন্দিত এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে গৃহীত কৃষি খাতের অগ্রগতিতে ভর্তুতিসহ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, পরিকল্পিত জনসংখ্যা নীতি, নারী শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা ও গ্রামবাংলার প্রতি বিশেষ মনোযোগ। কিষান ও কিষানির অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসলে অগ্রগতিতে প্রচণ্ড গতি নিয়ে এসেছে।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, একানব্বই সালে গণতন্ত্রের প্রবর্তনের পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দুয়ার খুলে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত ছয় বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ। তবে বিনিয়োগ ও সামষ্টিক আয়ের অনুপাত এখনো তেমন বাড়েনি। সরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে তেমন কোনো উত্সাহ নেই। একটি সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি ও যথোপযুক্ত বিনিময়ে হার নীতিতে যেতে পারলে ভালো।

অর্থনীতিবিদ ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘প্রযুক্তিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। প্রযুক্তি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। অতি দরিদ্র মানুষেরা এখনো বৈষম্যের শিকার। তাদের দিকে নজর দিতে হবে। সব ক্ষেত্রে সুন্দর আইন আছে, কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। সে কারণে সফল হতে পারছি না। আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। তা না হলে জঙ্গিবাদ ছড়াবে। জঙ্গিবাদ শুধু মাদ্রাসায় নয়, সব ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় রয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। আবার রয়েছে অনেক চ্যালেঞ্জও। কিন্তু অনেকে অগ্রগতির কথা স্বীকার করতে চায় না। চলমান অর্থনীতিতে সমস্যা থাকবেই। পাশাপাশি সম্ভাবনাও থাকবে। কেউ কেউ শুধু সমস্যা আর দুর্নীতির কথা বলে, সম্ভাবনার কথা বলতে চায় না। তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি হচ্ছে না, তা বলব না। দুর্নীতি কমাতে পারলে বছরে ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে। ’