বঙ্গবন্ধু থেকে পদ্মা সেতু

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গত আট বছরের শাসনামলে দেশের অবকাঠামোগত ‘উন্নয়নচিত্র’ মূল্যায়ন করতে বলা হলে অনেকেই একশব্দে বলবেন ‘অভাবনীয়’। শুধু সরকারি দল-জোট বা তাদের সমর্থকরাই নন, সংসদের ভিতর-বাইরের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলোও এই আট বছরে অবকাঠামোগত দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা স্বীকার করেন। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি গ্রামে, আরেকটু ভিতরে গিয়ে বললে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত এই উন্নয়ন বিস্তৃত হয়েছে। বলতে গেলে অবকাঠামো উন্নয়নে এই আটবছরে মহাকর্মযজ্ঞ চলেছে, যা এখনো চলমান। শেখ হাসিনার গত আট বছরে অবকাঠামো নির্মাণের মূল ফোকাস স্বপ্নের পদ্মা সেতু। যা এখন আর স্বপ্ন নয়, অনস্বীকার্য এক বাস্তবতা।

শেখ হাসিনার সরকারের দশটি ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের শীর্ষে রয়েছে এই ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হচ্ছে দেশের দীর্ঘতম এই সেতু। যার দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। এই সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। সেতুটির নির্মাণ কাজ ২০১৮ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। পদ্মা সেতুর সর্বশেষ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় জানায়—জাজিরা প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোডের ৮৪ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তে অ্যাপ্রোচ রোড শতভাগ, তিনটি সার্ভিস এরিয়া শতভাগ, মূলসেতু ৩৩ শতাংশ ও নদী শাসন কাজ ২৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৩৮ শতাংশের বেশি।

বহুল প্রত্যাশিত ও স্বপ্নের এই পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক চ্যালেঞ্জ আর কষ্টের স্মৃতি। ‘দুর্নীতির চেষ্টা’র অভিযোগ তুলে ২০১২ সালের জুনে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ঋণ চুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিলের পর ওই বছরের ৪ জুলাই সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলছি, পদ্মা সেতু ইনশাল্লাহ আমরা নির্মাণ করবই। একটি পয়সাও ছাড় না দিয়ে বিশ্বব্যাংক আমাদের অপবাদ দিল। তারা আমাদের দেশকে ও জনগণকে অপমান করেছে। আমরা দরিদ্র হতে পারি। এদেশে ১৬ কোটি মানুষ আছে। বিদেশে ৮০ লাখ প্রবাসী বাঙালি রয়েছেন। আমাদের অর্থনীতি এত খারাপ নয়। আমাদের যে রেমিট্যান্স রয়েছে, সেখান থেকেও বছরে এক-দুই বিলিয়ন টাকা নিয়ে আমরা এই সেতু নির্মাণ করতে পারব।’

এই বক্তব্যের তিনদিন পর, অর্থাত্ ২০১২ সালের ৮ জুলাই সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘২০১২-১৩ অর্থবছরেই নিজ অর্থে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করব।’ বিশ্বব্যাংকের প্রতি ইঙ্গিত করে দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেন, ‘কারো কাছে মাথা নোয়ানো নয়, আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমরা পরনির্ভরশীল হব না, কারো মুখাপেক্ষী হব না। অনেক রক্ত ও বহু মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমাদের এ স্বাধীনতা। এটা কারো দানখয়রাত নয়। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা এ স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ১৯৭১ সালেও আমরা মাথা নত করিনি, এবারও করব না।’

বঙ্গবন্ধু থেকে পদ্মা সেতু

পদ্মা সেতুর স্বপ্ন-সাহস কোত্থেকে এলো? পিছনে গেলে এর উত্স মেলে। পদ্মার স্বপ্ন জেগেছে আসলে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু থেকে। পদ্মার আগে এটিই এখন পর্যন্ত দেশের দীর্ঘতম সেতু। বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু করতে পারার কারণেই সাহস জন্মেছে পদ্মা সেতু করার। প্রসঙ্গত, বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার পঞ্চম এবং বিশ্বের ৯২তম দীর্ঘ সেতু। ১৯৯৮ সালের জুনে এটি উদ্বোধন করা হয়। বাংলাদেশের ৩টি বড় নদীর মধ্যে বৃহত্তম এবং পানি নির্গমনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্ নদী যমুনার উপর এটি নির্মিত। বঙ্গবন্ধু সেতু বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দুই অংশকে একত্রিত করেছে।

ফাস্ট ট্র্যাকে আরও নয় প্রকল্প

পদ্মা সেতু ছাড়াও ফাস্ট ট্র্যাকে আরও নয়টি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। এগুলো হলো—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার (রামপাল), মাতারবাড়ি কোল পাওয়ার, ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (মেট্রোরেল), এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প ও দোহাজারী-রামু-মায়নমার-ঘুমধুম রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প। সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ এরমধ্যে ৯৩ দশমিক ৮২ শতাংশ শেষ হয়েছে, দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা। মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার (রামপাল) প্রকল্পে ২০১৯ সালে উত্পাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মাতারবাড়ি কোল পাওয়ার প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষ, এখন চলছে ভূমি উন্নয়ন কাজ। ঢাকা মাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট (মেট্রোরেল) প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতির পর এরমধ্যে নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ২০১৯ সালে চালু হওয়ার কথা। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ১৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পুনঃসম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়াধীন। পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর প্রকল্পে চলতি বছরের ১৩ আগস্ট প্রথম পণ্য খালাস শুরু হয়েছে, ২০২৩ সালে পূর্ণাঙ্গ বন্দর চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।

ঢাকাকে যানজটমুক্ত রাখতে মহাপরিকল্পনা

যানজটমুক্ত করে ঢাকাকে একটি অত্যাধুনিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার গত আট বছরে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে। যার মূল লক্ষ্য—যানজটের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, নদীদূষণ, আবাসন সমস্যা, বিদ্যুত্-গ্যাস-পানি সংকট নিরসন করে ঢাকাকে নাগরিক সুবিধা সংবলিত একটি পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার মাথায় রেখে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী প্রকল্প।

১৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত ও ভিআইপি সড়ক শাহবাগ-প্রাক্তন শেরাটন-বাংলামটর-সোনারগাঁও ইন্টারসেকশনে আন্ডারপাস নির্মাণ প্রকল্পের কাজ এরমধ্যে শুরু হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ ও যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজও শুরু হয়ে গেছে, এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভারের দুটি অংশে এরমধ্যে যান চলাচল করছে। জনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকার যানজট নিরসন ও উন্মুক্ত স্থানের সংস্থান করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে আরবান রিন্যুয়াল প্রকল্প। গাজীপুর থেকে শাহজাহাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাস রেপিড ট্রানজিট (বিআরটি) লেন নির্মাণের কাজ চলমান। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের সায়েদাবাদ প্রান্তে ৬২০ মিটার দীর্ঘ আরেকটি লুপ এরমধ্যে চালু হয়েছে।

সড়ক উন্নয়নে বিপ্লব

বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আমলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হয়েছে। দেশের অন্যান্য মহাসড়কেও লেন বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয়াধীন এলজিইডির মাধ্যমে সারাদেশে রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়। প্রত্যন্ত গ্রামেও এখন কাঁচা রাস্তার সংখ্যা তেমন নেই।