দ্বিতীয় মেয়াদেও রাজনীতির চালকের আসনে শেখ হাসিনা

টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের তৃতীয় বর্ষপূর্তি আজ। একইসঙ্গে সরকার পরিচালনার টানা ৮ বছরও পূর্ণ হলো আজ। আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন বাংলাদেশের রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদের এই সরকারের সাফল্য শুধু উন্নয়নে নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথেও মাইলফলক। রাজনীতির এই বাঁক বদল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলোকে ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের পথে না গিয়ে গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতির শিক্ষা দেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনা প্রায় একক সিদ্ধান্তে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করেছেন। সরকার গঠনের পরে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেননি কেউ। বরং তার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কাছে রীতিমতো পর্যুদস্ত হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। জামায়াতে ইসলামি দেশব্যাপী ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েও শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় বন্ধ করতে পারেনি যুদ্ধাপরাধের বিচার। পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের চাপ-কৌশলের বিপরীতে বিশ্বরাজনীতির দ্বিতীয় ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততাও শেখ হাসিনার অনন্য রাজনৈতিক কৌশল। সব মিলিয়ে রাজনীতির মাঠে শেখ হাসিনা আছেন চালকের আসনে।

ভোটের মাধ্যমে পালাবদলের প্রক্রিয়ার নানা পদ্ধতির ভ্রান্তিকে অবলম্বন করে এক গভীর চক্রান্তের পথে এসেছিল ওয়ান ইলেভেন। বাংলাদেশের রাজনীতির সেই কালো অধ্যায় পেরিয়ে ২০০৮ সালের শেষ ভাগে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। কিন্তু এর পর ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সংবিধানের পথে না চলে নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে চাইছিল। কিন্তু তাদের চক্রান্ত শেখ হাসিনার সংবিধানের প্রতি অবিচল থাকার প্রত্যয়ের কাছে হার মানে। বিএনপি মনে করেছিল নির্বাচনে না গেলে এই সরকারকে অবৈধ আখ্যা দেওয়া সহজ হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলের সিদ্ধান্তের প্রতি দেশের মানুষ আস্থা রেখেছে। সেই উত্তপ্ত সময়ের অমানিশা কাটিয়ে আওয়ামী লীগের সরকার পরিচালনার টানা আট বছর পূর্তি হলো আজ। গণতন্ত্রের পথে এই ধারাবাহিকতা এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে সন্দেহ নেই।

সরকার পরিচালনায় বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়ে অনন্য ও ঈর্ষণীয় অবস্থান তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তা দিয়ে এক নতুন বাংলাদেশ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। তার হাত ধরে সফলতা এসেছে কূটনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের মতো সব ক্ষেত্রেই। বিশ্বের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধন দৃঢ় হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তার কারণেই একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বে স্থাপিত হয়েছে মাইলফলক। দেশের উন্নয়নের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বাংলাদেশের বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় উন্নয়নের এক ঈষর্ণীয় ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে এ সরকার। তবে উন্নয়নের জন্য সবার আগে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। আর এখনকার মতো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাংলাদেশে নিকট অতীতে দেখা যায়নি। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রায় পুরোটাই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে সব রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড।

গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১২ জানুয়ারি সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এর আগে ২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনেও বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে ২০১০ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ। সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকা এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বে এই ৮ বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। এ সময়ে সরকারকে ঘরে-বাইরে নানা সঙ্কট মোকাবিলা করতে হলেও শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজয়ের হাসি হেসেছে। বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের তালিকায় দশম স্থানের অধিকারী শেখ হাসিনার কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জঙ্গি দমন হলো শ্রেষ্ঠ অর্জন। সমূলে নির্মূল করতে না পারলেও এদেরকে যে দমন ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা বাংলাদেশ ২০০৯ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রমাণ করে আসছে। তা না হলে আমাদের এই রাষ্ট্রটি এতদিনে আরেকটি আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হতো। গুলশানের হলিআর্টিজান রেস্টুরেন্টের ঘটনাটি একেবারে ব্যতিক্রম, জঙ্গিদের নতুন কৌশল শুরুতেই হোঁচট খায়। প্রধানমন্ত্রীর কঠোরভাবে জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছেন। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে দেশ দ্রুত এ উগ্রবাদী ছোবল থেকে বের হয়ে আসছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা লক্ষ করা গেলেও সরকার সেগুলো সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি-জামায়াত জোট সারাদেশে যে ঘৃণ্য ও পৈশাচিক সন্ত্রাস চালায়, তা কোনোদিন বিস্মৃত হওয়ার নয়। তাদের এই নৃশংসতা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের দোসরদের নির্মমতার সঙ্গেই কেবল তুলনা করা যায়। বিএনপি-জামায়াত জোটের সন্ত্রাস, অগ্নিসংযোগ ও পেট্রোল বোমার শিকার হয়ে নিরীহ বাস ড্রাইভার, বাস-টেম্পো-সিএনজি যাত্রী, প্রিজাইডিং অফিসার, পুলিশ-বিজিবি-আনসার, সেনাবাহিনীর সদস্য, এমনকি স্কুলের শিক্ষক ও শিশুও নিহত হয়েছেন। অনেকে আগুনে দগ্ধ হয়েছেন, জীবনের তরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন। সরকারি অফিস, বিদ্যুেকন্দ্র, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ফুটপাতের দোকান এমনকি নিরীহ পশুও তাদের জিঘাংসার হাত থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে হাজার হাজার পবিত্র কোরান শরীফ পুড়িয়ে দিয়েছে। ট্রেনের লাইন উপড়ে ফেলে এবং ফিসপ্লেট খুলে শত শত বগি এবং রেলইঞ্জিন ধ্বংস করেছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে সেই অবস্থা থেকে দেশকে রক্ষা করেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বর্তমানে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়া পাঁচটি দেশের একটি- বাংলাদেশ।

বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের তালিকায় দশম স্থানে শেখ হাসিনা

বিশ্বের শীর্ষ ৫০ নেতার তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশম স্থানে আছেন। আর শুধু নারীদের মধ্যে শেখ হাসিনা আছেন পঞ্চম স্থানে। মার্কিন সাময়িকী ফরচুনের করা ‘ওয়ার্ল্ড গ্রেটেস্ট লিডার’ শিরোনামে ২০১৬ সালের এই তালিকায় শীর্ষ ৫০ জন নেতার মধ্যে ২৩ জনই নারী। ‘গেম-চেঞ্জিং’ ভূমিকার জন্য শীর্ষ ৫০ নেতার তালিকায় স্থান পেয়েছেন তারা। ব্যবসা, সরকার, মানবসেবা ও শিল্পকলা এবং সারা বিশ্বের নারী ও পুরুষদের অনুপ্রাণিত করতে অবদান রাখায় ফরচুন সাময়িকী প্রতি বছর এই তালিকা করে থাকে। ৫০ জনের এই তালিকায় মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাই রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তালিকায় স্থান দেওয়ার কারণ হিসেবে মার্কিন সাময়িকীতে বলা হয়েছে, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র নারী নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা দক্ষতার সঙ্গে ইসলামি ঐতিহ্য ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছেন। নারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা, শিক্ষায় আরও সহায়তা দেওয়া, আর্থিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করছেন তিনি। বাংলাদেশের নারীদের ৩০ শতাংশের কমপক্ষে মাধ্যমিক শিক্ষার সুযোগ লাভ এবং নারী-পুরুষ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার উপরে বাংলাদেশের উঠে আসার দিকটিও শেখ হাসিনার কৃতিত্ব হিসেবে দেখছে ফরচুন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শেখ হাসিনার সবেচেয়ে বড় সফলতা ও অর্জন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাহস সারাদেশে সমাদৃত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছেন। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়ও কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা শেখ হাসিনার সবেচেয়ে বড় সফলতা ও অর্জন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য শেখ হাসিনার উপর অনেক আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সকলেই শেখ হাসিনাকে নানাভাবে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে সবচেয়ে মহান করে দেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনাকে মর্যাদা দিয়েছেন তিনি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশের জনগণের দাবি। তিনি জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন।