শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্ব উচ্চতায় বাংলাদেশ

যে কালে তাঁর জীবনগতি প্রবাহিত সেই কালের চেতনা ও প্রকৃতি আপন চরিত্রে আত্মস্থ করে জনমানুষের সামষ্টিক আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন সার্বভৌম বাংলাদেশের বর্তমান কা-ারি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। বিপুল জনতার পক্ষে কালের চাহিদা পূরণে তাঁর অঙ্গীকার সমগ্র দেশবাসীর কাছে এমন এক আস্থা অর্জন করেছে যা এই ভূখ-ের নিরাপত্তা, পুনর্গঠন ও ধারাবাহিক সাফল্যের জন্য অনিবার্য। তাঁর এমন অতুলনীয় নেতৃত্ব এবং সুদক্ষ হাতের ধারাবাহিক সফলতায় তিনি যেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। যেমন আকর্ষণীয় তেমনি অধ্যবসায়, আত্মপ্রচেষ্টা ও প্রতিঘাতের উত্তেজনায় উন্মাতাল। আওয়ামী লীগ কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভানেত্রী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মোটা দাগে যার রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত তাঁর জন্য ছাত্র জীবনের পূর্ববর্তী প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও একটা সূচকরূপে কাজ করে থাকবে। আশির দশকে, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক অভিষেকের ঘটনায় নাটকীয়তা থাকলেও গণতান্ত্রিক অনুশীলনের দৃষ্টান্তই তাতে পুরোপুরি হাজির দেখা যায়। দল তো আর পরিবার নয়, দলে বহু মানুষের অন্তর্ভুক্তিই স্বাভাবিক পূর্বশর্ত এবং সেই বহুত্বের সমর্থনেই যে গণতন্ত্র নিহিত সেটাও আমাদের অজানা নয়। দলে তাঁর আনুষ্ঠানিক অভিষেকের বিষয়টি বিচার করলে দেখা যাবে দলের সদস্যদের সর্বসম্মতির ভিত্তিতে তাঁর এই উত্তরণের বিষয়টি পারিবারিক আনুকূল্যের প্রশ্নে তাঁর পক্ষে একটি প্রতিযুক্তি হিসেবেই কাজ করবে। এটা সত্য, একটি বিরাট পারিবারিক উত্তরাধিকার তাঁর পরবর্তী জীবনের প্রতিষ্ঠাকে সম্ভবপর করে তুলতে সহায়ক হয়েছে। তবে যে মাত্রায় তিনি প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তা যে উত্তরাধিকারের কারিশমা নয়, বরং তা মুখ্যত তাঁর নিজেরই অর্জন, সে কথা কোন পর্যবেক্ষণশীল মানুষের পক্ষে অস্বীকার করা সম্ভব নয়। নেতা শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সিদ্ধি লাভের প্রশ্নে যে বিবেচনাটি প্রথাগত সমালোচনা আকারে দেখতে পাই, সেটা শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় পরিবারিক উত্তরাধিকারের আনুকূল্য। এর মধ্য দিয়ে বিরোধী গোষ্ঠীর কূটতর্ক চলতে থাকে। বিবর্তনসূত্রে অর্জিত ক্ষমতার যে উচ্চতাকে তিনি স্পর্শ করেন তাতে কার্যকারণের উপস্থিতি খতিয়ে দেখাই আসল প্রয়োজন। কিন্তু এ ধরনের মূল্যায়ন সত্যের এক খ-িত রূপকেই উপস্থাপন করে মাত্র। একে অকাট্য মূল্যায়ন হিসেবে মানতে গেলে ইতিহাসের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয় এবং এতে এক প্রকার ঐতিহাসিক গলদকেই স্বাগত জানানো হয়। রাজনীতিতে শেখ হাসিনার অবতরণের পটভূমি বিচার করলে বোঝা যায় এ-জাতীয় একচক্ষু পর্যবেক্ষণ তাঁর ক্ষেত্রে আদৌ সমর্থনযোগ্য নয়।

নেতা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে রাজতন্ত্রের পটভূমি অনুপস্থিত, এর সঙ্গে ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অপঘাত যুক্ত ছিল, যা বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠত্বকে রক্তাক্তভাবে অপসারিত করে অপ্রত্যাশিত শূন্যতা সৃষ্টি করেছিল। শূন্যতাকে রাজতান্ত্রিক বা পারিবারিক অভিষেকের মধ্য দিয়ে পূর্ণ করা হয়নি। একটি অনগ্রসর ভিন্ন আদর্শের পুনর্বাসন ঘটিয়ে সদ্য-আবির্ভূত নতুন অগণতান্ত্রিক শক্তিটি মুজিবী-উদারতন্ত্রের শেকড়-বাঁকড় উপড়ে ফেলার নীলনক্শা প্রস্তুত করে তা বাস্তবায়ন করে। ঐ অবস্থায় শেখ হাসিনা ইতিহাসের কোন বিশেষ অবস্থার অধীনন্থ ছিলেন সেটা পর্যবেক্ষণ করলে তাঁর বিরুদ্ধে পরিস্থিতির সুফল ভোগের অভিযোগ কতটা সত্য তা নির্ণয় সহজ হবে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য প্রবাসজনিত বিচ্ছিন্নতার যে পর্বটি তিনি অতিক্রম করেন তার আগে নিজ মাতৃভূমি বাংলাদেশে শিক্ষার্জনের সময় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার একটি প্রাথমিক পাঠ তিনি গ্রহণ করেছিলেন। অনুশীলন ও পরিগঠনের নাতিদীর্ঘ সময়ে তিনি যুক্ত হয়েছেন রাজনৈতিক কর্মকা- ও বিভিন্ন সমাজ-সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির সঙ্গে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রচলিত ছাত্ররাজনীতির দরকারি পাঠ সে সময়ে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে আজিমপুর গার্লস স্কুলের চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার ইডেন কলেজে যখন পড়ছিলেন তখন তিনি ছাত্রী-সংসদের সহসভাপতি নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অনার্স পড়ার সময় ছাত্রলীগ রোকেয়া হল শাখার সাধারণ সম্পাদকের পদে দায়িত্ব পালন করেন।

পরবর্তীতে নিরন্তর ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে তাঁকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নিজস্ব ভিত্তি নির্মাণ করেই বিজয়মুকুট পরতে হয়েছে। এক্ষেত্রে কোন বিশেষ অনুগ্রহ বা অনুকম্পা তাঁকে সাফল্যের শিরোপা এনে দেয়নি। দলীয় সর্বসম্মতির ভিত্তিতেই তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক আরোহণ গণতান্ত্রিক অনুবর্তিতায়ই যে ঘটেছে, তার উদাহরণ হিসেবে এ বিষয়টি উল্লিখিত হতে পারে। শাসনক্ষমতা অর্জনের আগে প্রথমবার দলীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণে পৈত্রিক পরিচয় একটি ভূমিকা রেখেছে সেটা সত্য। তবে গণতান্ত্রিক বিধিমালা পুরোপুরি অবলম্বন করা সম্ভব না হলেও তখন তাঁর বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠতা ও পরিমিতিজ্ঞান ছিল উঁচু পর্যায়ের। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন; সে সময়ে নেতা হিসেবে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষ হিসেবে যাকে তাঁর মোকাবিলা করতে হয়েছে পারিবারিক উত্তরাধিকারের আনুকূল্য তিনিও লাভ করেছিলেন। পরিবারতন্ত্রের প্রশ্নে তাঁকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। এক্ষেত্রে ডারউইনের ‘সারভাইভ্যাল অব দ্য ফিটেস্ট’ তত্ত্বের আলোকে বিষয়টিকে গ্রহণ করলে শেখ হাসিনার বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক অগ্রগামিতা সহজেই ধরা পড়ে। শেখ হাসিনার ব্যক্তিমূল্য নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্য একটি বিব্রতকর উদ্যোগ অনেক সময় গৃহীত হতে দেখা যায়। শেখ হাসিনা ও তাঁর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে তুলনার প্রচেষ্টা আমার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। ‘তুলনা’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্ক থেকে একটি বৈষম্যেও অনুভূতি ¯œায়ুতন্ত্রী বেয়ে অগ্রসর হতে থাকে। ভিন্ন ইতিহাস ও কালের বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত দুই স্বতন্ত্র ব্যক্তির পারস্পরিক তুলনা দুয়ের বা যে কোন একজনের গুরুত্ব খাটো করে দেখার প্রয়াস মনে হতে পারে।

একটি নতুন জাতির প্রতিষ্ঠার যে একক কীর্তি তা বঙ্গবন্ধুর জন্য ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। সমপর্যায়ের একটি দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে চাইলে তাত্ত্বিকভাবে আরেকটি স্বাধীনতা যুদ্ধের আয়োজন করতে হবে। বাস্তবে তা সম্ভব না। তবে ভৌগোলিক স্বাধিকার প্রসারিত করে এমন এক ভিন্ন ধরনের বিপ্লব ঘটানো সম্ভব যাতে অর্জিত স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার জন্য ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচী চালিত হয়। এখানেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সংস্কারের প্রসঙ্গটি চলে আসে। এক্ষেত্রে এ যাবৎকালে তাঁর উন্নয়ন কার্যক্রম, অগ্রাভিযান এবং করণকৌশলের দিকে তাকালে তাঁর স্বকীয়তার স্থানটি চেনা যায়। উন্নয়ন-আন্দোলন-বিপ্লবের রাস্তা সর্বদাই একটি অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ। রাস্তার শুরু চূড়ান্ত বিন্দুর সঙ্গে বিরোধসূত্রে সম্পর্কিত নয়। তেমনি উন্নয়ন-কীর্তি দুটি সত্তার প্রভাবে সম্ভবপর হলেও তা কার্যত পরস্পর সংযুক্ত যাত্রাপথ মাত্র। এদিক থেকে দেখলে শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর নিজ নিজ অবস্থান চিহ্নিত হয়ে যায়। সেইসঙ্গে প্রমাণযোগ্য হয় তাঁরা দু’জনেই নিজ নিজ দীপ্তিতে উজ্জ্বল। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজ সিংহভাগ সম্পন্নকরণ, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলকরণ, যমুনা সেতু নির্মাণকাজ সমাপ্তি ও উদ্বোধন, পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর, বিধবা-ভাতা ও বয়স্ক-ভাতা প্রবর্তন, মেঘনা নদীতে ভৈরব সেতু নির্মাণ, সমুদ্রসীমা সম্প্রসারণ, পদ্মা সেতুর কাজে অবিশ্বাস্য অগ্রগতি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারসহ অসংখ্য উন্নয়নকর্মে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়া যায়। চেতনা সংস্কারের বেলায় নেতা শেখ হাসিনা যে কাজটি করেছেন তা হলো ‘শত্রু-মিত্র চিহ্নিতকরণ’। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি একাত্তরের ভূমিকার আলোকে জনগোষ্ঠীর একটি চেতনাগত বিভাজন ঘটিয়েছেন। বিভাজনের পক্ষ দুইটি : স্বাধীনতার পক্ষশক্তি ও বিপক্ষশক্তি। স্বাভাবিকভাবে প্রথম পক্ষই পৃষ্ঠপোষিত হয়েছে তাঁর নেতৃত্ব-কাঠামোর পরিসরে। এই চেতনাগত দ্বি-বিভাজন প্রক্রিয়াটি জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার পক্ষে কাজ করছে। ভবিষ্যতে তা আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এটাও বলা যায়, তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা সংশ্লেষণবাদী। নারীবাদের কথিত নীতিকাঠামোর সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেও নারীবিশ্বের সুষম ন্যায্যাধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর সরকার সাধ্যানুগ সংবেদনার পরিচয় দিয়ে চলেছে। যার অন্যান্য স্বাক্ষরের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নাগরিক সনদপত্র ও অন্যান্য দলিল-দস্তাবেজে মাতৃনাম সংযোজন। তাছাড়া লিঙ্গ-ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নারীর ন্যায্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও তাঁর সরকার ইতোমধ্যে গ্রহণ করেছে। ঢাকা শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়নও সহজেই যে কাউকে আকৃষ্ট করে।

কুখ্যাত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ চাপিয়ে দেয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে দেশে ফেরার পক্ষে তিনি দৃঢ় সঙ্কল্প ব্যক্ত করেন। তাতে নিজ দেশের প্রতি তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রকাশ ঘটে। বিপুল জনসমর্থনে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত শেখ হাসিনার সরকার ‘দিনবদলের অঙ্গীকার’ ঘোষণা করে, যা জাতীয় প্রগতির সূচকে দেশকে কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। গতিই যে জীবনের প্রধান ধর্ম এ বার্তা ধারণ করে ২০৪১ সাল পর্যন্ত উন্নয়নের রোডম্যাপ তৈরি করেছেন, যার লক্ষ্য সমৃদ্ধতর সোনার বাংলাদেশ, যাকে একালের ভাষায় আমরা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বলে অভিহিত করছি।

স্বাধীনতা-উত্তর দেশ পরিচালন পর্বে পাক শাসক শ্রেণী, মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের রক্ষণশীল অংশ মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর একটি বড় শত্রু বলয় সৃষ্টি হয়। ফলে তিনি জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। তারা তখন তাঁর নামে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘র‌্যাডিক্যাল’, ‘হঠকারী’, ‘বামপন্থী’সহ বিভিন্ন বিশেষণ জুড়ে দিয়ে তাঁর চরিত্র হননের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। অন্যপক্ষে যারা সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি হিসেবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল তারা তাঁকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ চিহ্নিত করে ফায়দা লোটার ফন্দি করে। যদিও সত্য এই, উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনি শুদ্ধ সেকুলারিজমের ভিত্তি তৈরি করে তাকে বিকশিত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও জঙ্গীবিরোধী, উদার মানবতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হচ্ছেন। একাত্তরের চেতনাগত প্রত্যয়ে তাঁর রাষ্ট্রনীতি আধুনিক চিন্তা-প্রবণতার সাক্ষ্যবাহী। তিনি তাঁর শাসন-চিন্তার কেন্দ্রে সংস্কারমুক্তি, সৃজনশীলতা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক বিবর্তনশীলতাকে মূল্যবান মনে করেন।

শোককে শক্তির সমার্থক মনে করেন শেখ হাসিনা। এ এক ট্র্যাজিক শিল্পকৌশল। এটা জানা আছে বলেই এত অপঘাত উপেক্ষা করে ‘আর্টিস্ট অব লাইফ এ্যান্ড পলিটিক্স’ রূপে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছেন। বঙ্গবন্ধুর জীবনের বৈভব ও অভিযোজ্যতা ঠিক এভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য নয়। হত্যা নামক ক্ষণস্থায়ী বিনাশের শিকার হন তিনি। তবু তিনি আছেন, তিনি আছেন অন্যভাবে, তাঁর সন্তানের মধ্য দিয়ে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে জাতি মানুষের স্মৃতিসূত্রে অম্লান। শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু দুই পৃথক সত্তা; কিন্তু তাঁরা একাত্ম। আসলে তিনি একই সঙ্গে সময়ের সন্তান ও পিতা। এটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে; কিন্তু তাঁর বেলায় এটাই খাটে। পরস্পরবিরোধী এবং বহুবিভক্ত সত্যের দ্যুতি বাঙালী ইতিহাসে একমাত্র তাঁর মধ্যেই উপস্থিত পাওয়া যায়। অভাবনীয় জন-আবেশন-ক্ষমতা ছিল তাঁর। সেটা কাজে লাগিয়ে ঘটনার গতি ও সময়ের উপযোগ মুষ্ঠিবদ্ধ করেই নিজের অনুকূলে ইতিহাসের পথ গড়ে নিতে পেরেছেন তিনি। তাঁর বিজ্ঞতা ছিল, তবে পা-িত্যের জনবিচ্ছিন্নতাকে প্রাধান্য দেয়া মেহনতি মানুষের নেতার পক্ষে স্বাভাবিক নয় বলেই লোক-সম্পর্কের সৃজনবৈশিষ্ট্যে তাঁরা মহিমান্বিত।

সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের দেশী-বিদেশী নানা কলকাঠি তাঁর কালে পর্দার অন্তরালে ক্রিয়াশীল থেকেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর নতুন রাষ্ট্রে আকস্মিক পরিস্থিতি সামাল দিয়ে এগিয়েছেন। যুদ্ধলব্ধ স্বাধীনতা তখনও জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্কৃতির মিথস্ক্রিয়ায় সংশোধিত ও বিধিবদ্ধ হয়নি। সে পরিস্থিতিতে ভারসাম্যের অভাবজনিত একটি বড় ধাক্কা তাঁকে কুলিয়ে ওঠার চেষ্টা চালাতে হয়েছে। বহুস্তর জটিলতা অতিক্রম করে সমাধানে চেষ্টায় তাঁর কোন ত্রুটি ছিল না। যুদ্ধকালে কোন জাতি পরিস্থিতির অগ্নিগর্ভ থেকে প্রসব করে বীর সন্তান। সেইসঙ্গে উগলে দেয় অসংখ্য বাই-প্রোডাক্ট। তারা অর্জিত ভূখ-ে অপশক্তির ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। এরাই নতুন রাষ্ট্রের প্রশাসন ঘিরে নির্মাণ করে অভেদ্য স্বার্থপ্রাচীর। কাঠামোর সংহতি ভেঙে দিয়ে ফায়দা লোটে তারা। বঙ্গবন্ধুকন্যা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও তেমনি অজস্র প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে নিজের পথ কেটে এগিয়ে যাচ্ছেন। অতিসাম্প্রতিক বিমানের ঘটনাসহ ১৯ বার তাঁকে হত্যা করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের কক্ষপথ থেকে কেউ তাঁকে সরাতে পারেনি।

পুরো জনগোষ্ঠীকে তাঁর হিতচিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে রাষ্ট্রপ্রশাসনের এক নতুন অগ্রাভিযান শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, যাকে বলা যায় দ্বিতীয় বিপ্লব। তার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেননি বলে প্রশাসক হিসেবে তাঁর ভূমিকার চেয়ে গৌরবময় মুক্তি-আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ধসনামা বাস্তবতাসহ আন্তর্জাতিক চক্রান্তে তিনি সর্বদা সংগ্রাম করে গেছেন। গণমানুষের মুক্তি আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। সমগ্র বাস্তবতার বিচারে তাঁর জীবনকালের কীর্তি তাঁকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর সম্মান এনে দিয়েছে। তাঁর অনুবর্তী কন্যা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকারের মহিমায় নয়, নিজ শ্রেষ্ঠত্বের বলে একটি উজ্জ্বল আত্মপরিচয় নির্মাণ করেছেন।