দারিদ্র্য জয়ে বাংলাদেশ থেকে শেখা

দারিদ্র্য আপেক্ষিক বিষয়। বাংলাদেশের দারিদ্র্য নিশ্চয়ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দারিদ্র্যের চেয়ে মারাত্মক। তার অর্থ এ নয় যে, আমরা দরিদ্র আমেরিকানদের অগ্রাহ্য করব। তাদের সুন্দর জীবনযাপনের ব্যবস্থা করতে সর্বাগ্রে আমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের মতো ধনী দেশের পক্ষে এমন মানব দুর্ভোগের সমাধান সহজেই সম্ভব। একে কেবল দুর্ভাগ্য বলে চালিয়ে নেওয়া উচিত হবে না।

পাশাপাশি দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রচেষ্টার দিকেও আমাদের মনোযোগ দেওয়া দরকার। আর এ কাজ করতে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য রয়েছে, এটাই সবাই জানে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে অবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। সূত্র বলছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়ন সূচকের অগ্রগতির কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগের ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। বলা প্রয়োজন, মাথাপিছু আয়ের তুলনায় বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার অনেক বেশি। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে দরিদ্র শিশুও কম নয়। সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রীপুর চিলড্রেন’স ভিলেজ শিশুদের অবস্থার পরিবর্তনে কাজ করে। এটা কেবল খাদ্য ও বাসস্থানের বিষয় নয় বরং শিশুদের ভবিষ্যতের জন্য আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়াও তার অংশ।

শ্রীপুর ভিলেজ অনেক বড় কাজ করছে। তবে আরও কাজ করতে হবে। এর আশ্রয়কেন্দ্রে সীমিত আসন রয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এখন অনেক শিশুই আশ্রয়হীন, যাদের আশ্রয় প্রয়োজন। অনেক সময়ই এসব শিশুকে রাস্তার পাশে, রেলস্টেশনে দেখা যায়। তারা যেন অপরাধী চক্রের দয়ার ওপর বেঁচে আছে। অনেক সময় তারা না খেয়ে থাকে, তারা নির্যাতনেরও শিকার হয়। এমনকি তারা মারাত্মক অসুস্থ হওয়া ঝুঁকিতে থাকে।

এর শিকার হয় বিশেষ করে বাংলাদেশের শিশুরা। কারণ দরিদ্র শিশুদের সে রকম চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কিছু কিছু হাসপাতাল শিশুদের ব্যাপারে যত্নশীল নয়। তারা অনেক সময় অসুস্থ শিশুদের নিতে চায় না। হাসপাতালের বাইরে, গেটে, রুমের বাইরে রোগী দেখা যায়। এমনকি অনেক সময় শিশুদের মৃত্যুর মুখেও ফেলে দেবে। আমার সে অভিজ্ঞতা হয়েছে। ১৯৯৮ সালে যখন আমি বাংলাদেশ সফরে যাই, রাজধানী ঢাকায় এ রকম আহত এক শিশুকে দেখি। শিশুটি ভয়ানকভাবে আহত। এতটাই আহত যে, সে মারা যাবে।

যা হোক আশার বিষয় হলো, এ রকম অবহেলিতদের পাশে রয়েছে শ্রীপুর চিলড্রেন’স ভিলেজ। সেখানে একটি হেলপলাইন খোলা হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে আপাতত ৫ মাসের প্রকল্পটি শুরু হচ্ছে রাজধানী ঢাকায় ও নিকটস্থ শহর টঙ্গীতে। এটা জটিল বিষয় নয়। হেলপলাইনটি ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে। স্থানীয় শিশুবিশেষজ্ঞ ও খোদ শিশুদের সাহায্যে এটি পরিচালিত হবে। কেউ আহত হলে হেলপলাইনে কল দিতে পারবে, এতে তিনি জরুরি চিকিৎসা সেবা পাবেন। একজন সাহায্যকারী শিশুটিকে হাসপাতালে নিতে সাহায্য করবেন। এভাবে শিশুটির চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।

বলা বাহুল্য, তাদের কর্মসূচি কেবল কাজ করাই নয়, একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য গবেষণাও। প্রত্যেকটি ঘটনার বিস্তারিত তথ্য রেকর্ড করার একটি দল থাকবে। কোথায় ঘটনাটি ঘটল, কীভাবে, তার চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হলো। বাংলাদেশের সরকারও জানল কোথায় কীভাবে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে তাদের পরবর্তী প্রস্তুতিও সহজ হবে; একই সঙ্গে নিজেদের সমর্থন সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পারবে। দক্ষতা সবসময়ই দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর বাংলাদেশে যেখানে সম্পদ কম, সেখানে তো গুরুত্বের কথা বলার অপেক্ষাই রাখে না।

শ্রীপুর চিলড্রেন’স ভিলেজ শিশু-সংশ্লিষ্ট দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রক্রিয়ায়ও কাজ করবে। তারা শিশুদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করবে এবং একেবারে দরিদ্রদের প্রদান করবে। একটি সংস্থার জন্য এটি যে কষ্টসাধ্য কাজ তা শ্রীপুর চিলডেন’স ভিলেজ জানে। তবে কাজটি সুন্দরভাবে করতে এটি অন্যদের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে।

সংস্থাটি যা-ই করুক না কেন, এটি ঠিক যে, অনেক বাংলাদেশি শিশু অন্যের সহায়তা ছাড়াই বেঁচে আছে। কেউ হয়তো ভালো আছে কিংবা কেউ সমস্যায় রয়েছে। তবে ঠিক উদ্ভাবন ও স্পৃহা দিয়ে শ্রীপুর চিলড্রেন’স ভিলেজ ভালো কিছু করতে দৃঢ় প্রত্যয়ী। এর কাজের ধরন হবে তাৎক্ষণিক কাজ এবং ভবিষ্যতের তথ্য সংগ্রহ। এর মাধ্যমে সংস্থাটি বিশ্বের অন্যদের জন্য উদাহরণ হতে চায়।