পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা ‘নাফ ট্যুরিজম পার্ক’

[পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা ‘নাফ ট্যুরিজম পার্ক’ ] মনতোষ বেদজ্ঞ, কক্সবাজার: নাফ নদীর বুকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার সম্ভার নিয়ে জেগে রয়েছে বাংলাদেশের এক টুকরো ভূখণ্ড জালিয়ার দ্বীপ। অনন্য সুন্দর এই দ্বীপ ঘিরে সম্প্রতি উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। দ্বীপের ২৭১ দশমিক ৯৩ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘নাফ ট্যুরিজম পার্ক’। পর্যটনের আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধাই যুক্ত হবে এখানে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদূর ভবিষ্যতে পুরো দেশের পর্যটন খাতে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে চলেছে জালিয়ার দ্বীপ। একপাশে মিয়ানমার, অন্যপাশে বাংলাদেশের বিশাল নেটং পাহাড় দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করবে ছোট্ট এই ভূখণ্ডে। ফলে টেকনাফ ও আশপাশ এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের বাণিজ্যেও। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের নেটং পাহাড়ের কাছে নাফ নদীর মাঝখানে অবস্থিত দ্বীপটিতে এখন পর্যন্ত কোনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। টেকনাফের কিছু বাসিন্দা সেখানে অবৈধভাবে চিংড়ি ও লবণ চাষ করে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে। ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে ওই দ্বীপে যাতায়াত করে লোকজন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জালিয়ার দ্বীপে যাতায়াতের জন্য কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক সংলগ্ন স্থলবন্দরের পাশ দিয়ে একটি আকর্ষণীয় ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হবে। নদীর ওপর ও খোলা আকাশের নিচে ঝুলে থাকা সেতুটি হেঁটে পার হয়ে পর্যটকরা প্রকৃতির নয়াভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাবে জালিয়ার দ্বীপে। এ ছাড়াও দ্বীপে গড়ে তোলা হবে
রিসোর্ট, কেবল কার, ওশনেরিয়াম, ভাসমান রেস্টুরেন্ট, কনভেনশন সেন্টার, সুইমিংপুল, ফান লেক, অ্যাকুয়া পার্ক, ফিশিং জেটি, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, শিশুপার্ক, ওয়াটার স্পোর্টস, ক্রুজ লাইন প্রভৃতি। ইতোমধ্যে এই দ্বীপের উন্নয়নযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য ডেভেলপার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ডেভেলপার নিয়োগের জন্য রিকোয়েস্ট ফর প্রজেক্ট প্রপোজাল (আরএফপি) দাখিলের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২ মার্চ পর্যন্ত।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন জানান, নাফ ট্যুরিজম পার্ক স্থাপনের জন্য টেকনাফ ও দক্ষিণ হ্নীলা মৌজার নেটং পাহাড়ের নিকটবর্তী টেকনাফ স্থলবন্দর সংলগ্ন নাফ নদীর মধ্যখানে জালিয়ার দ্বীপের ২৭১ দশমিক ৯৩ একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখানে যাতায়াতের পথ ব্যবহারের জন্য বন বিভাগের ২১ দশমিক ১২ একর জমিও অনুমোদন পাওয়া গেছে। জার্মানিভিত্তিক একটি কোম্পানির সহায়তায় এই প্রকল্পে পর্যটকদের বিনোদনের জন্য কেবল কারসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে।
কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ আসনের সাংসদ আবদুর রহমান বদি জানান, সিঙ্গাপুরে ‘সেন্টুসা আইল্যান্ড’ নামে একটি দ্বীপ রয়েছে। ওই দ্বীপে ঘুরে আসার পর আমি টেকনাফের জালিয়ার দ্বীপে আধুনিক পর্যটন সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার জন্য জাতীয় সংসদে প্রস্তাব দিই। প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছেন। সাংসদ আবদুর রহমান বদি আরও জানান, সেন্টুসা আইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের জালিয়ার দ্বীপের পার্থক্য হচ্ছে, এখানে পর্যটকরা ঝুলন্ত সেতু বা কেবল কারে উঠে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং নিচে নাফ নদীর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। তবে এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে কথা বলছে পরিবেশবাদীদের একটি অংশ। কক্সবাজারে পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ.ন.ম মোয়াজ্জেম হোসেন রিয়াদ বলেন, নাফ নদীর এই এলাকাটি সাধারণত পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর অভয়াশ্রম। এই দ্বীপের ‘সয়েল লেভেল’ এখনও ভারি বর্ষণে অনেকখানি তলিয়ে যায়।
জানা গেছে, পবন চৌধুরী বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই জালিয়ার দ্বীপ ঘিরে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ২০১৫ সালের শেষদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, পরিবেশ ও বন সচিব কামাল উদ্দিন আহমদসহ ১১ জন সচিবকে তিনি জালিয়ার দ্বীপে নিয়ে যান। নদীবেষ্টিত দ্বীপের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন সবাই। দ্বীপটি নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা সচিবদের জানান পবন চৌধুরী। এরপর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে দ্বীপটিকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় সরকার।