স্বপ্ন দেখো’ যশোরের তরুণদের স্বপ্নই দেখাচ্ছে

যুবসমাজ যখন অবক্ষয়ের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে, অনৈতিক উপায়ে যখন অর্থ উপার্জনে হন্যে হয়ে উঠেছে সবাই, জ্ঞানচর্চা বাদ দিয়ে শিক্ষিতদের অধিকাংশই যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, চারিদিকের এসব চিত্র দেখলে যখন হতাশায় ভারাক্রান্ত হতে হয় তখন ভালো কিছু একটা দেখলে মনটা ভরে ওঠে। এই ভালো জিনিসের একটা হলো যশোর শহরের কয়েকজন শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ‘স্বপ্ন দেখো সমাজ কল্যাণ সংস্থা’। এটি একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক কর্মসূচি, যা ওই শিক্ষার্থীরা নিজেদের টাকায় পরিচালনা করেন। গত বছর আষ্টেক ধরে তারা সফলতার সঙ্গে এটি পরিচালনা করছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে জানা, ডিবেট, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, পাঠশালা, হস্তশিল্প, পাঠাগার প্রভৃতি খাতে কাজ করছেন। স্বল্পতম সময়ে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। ‘স্বপ্ন দেখো’ যশোরের তরুণদের সত্যিই স্বপ্ন দেখাচ্ছে।

স্বপ্ন দেখো সংস্থার স্বপ্নদ্রষ্টা জহির ইকবাল নান্নু সংস্থাটির গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। তিনি জানান, তারা সাত বন্ধু লেখাপড়ার ফাঁকে কিছু একটা ভালো কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে বাদাম বিক্রেতা, ফেরিওয়ালা, পথশিশু শ্রেণীর শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে হাত দেন। আর কাজটিই আজ তাদের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।

সাত বন্ধুর আর ছয়জন হলেন_ সানজিদা ইয়াসমিন অপি, স্বর্ণা, সউদ আল রশিদ, কারিমুজ্জামান কারিম, প্রীতম বিশ্বাস ও রাবেয়া খাতুন চামেলী। বিভিন্ন স্থানে তাদের বাড়ি। এর মধ্যে নান্নুর বাড়ি যশোর সদর উপজেলার হাসিমপুরে। মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন তার বাবা। তার বয়সও খুব একটা নয়। এসএসসি পাস করেছেন ২০০৬ সালে। তিনি ছোট থেকে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি এমএম কলেজে ভর্তি হয়ে সাংষ্কৃতিক সংগঠন বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হন। কলেজে বিভিন্ন সময় জেলা প্রশাসন বা কলেজের পক্ষ থেকে বিতর্ক প্রতিযোগিতা হলে তারা ওই সাত বন্ধু তাতে অংশ নিতেন।

অবহেলিত শিশু-কিশোরদের লেখাপড়া শেখানোর কাজে তারা অভূতপূর্ব সাড়া পান। ২০০৯ সালের দিকে শুরুতে কাজটি চলছিল অনেকটা অগোছালোভাবে। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে গেলে তারা খড়কিতে মাসিক তিন হাজার ৪০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে কাজ করতে থাকেন। তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০০ হয়ে যায়। কলেজের অনেক ছাত্রছাত্রী তাদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে আসেন এবং তারাও বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান কাজে অংশ নেন। শুধু তাই নয়। ঘর ভাড়ার টাকাও তারা চাঁদা দিয়ে পরিশোধ করতেন। এদিকে অবহেলিত এই শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা সন্তুষ্ট হয়ে মাসে ১০-২০ টাকা দিয়ে তাদের সহযোগিতা করতেন।

এই যখন অবস্থা তখন একটি বিশেষ শ্রেণীর লোক তাদের কাছে এসে বলে, এসব ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো যাবে না। তারা এসব শিশুদের অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করত। লেখাপড়া শিখতে শুরু করায় তারা আর কোনো অপরাধমূলক কাজে যেত না। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা খড়কি থেকে চলে এসে ৯ হাজার ২০০ টাকায় মাসিক ভাড়ায় ওয়াপদা সড়কে বর্তমান অফিসটি ভাড়া নেন।

নান্নুরা তাদের স্কুলের নাম দিয়েছেন ‘জোনাকির মেলা পাঠশালা’। জোনাকির যেমন ছোট্ট আলো আছে তেমনি পথশিশুদের মাঝেও আলো আছে। সেই আলোকে প্রজ্জ্বলিত করার জন্য তারা কাজ করছেন। আর এজন্য স্কুলের নাম দিয়েছেন জোনাকির মেলা পাঠশালা, জানালেন জহিরুল ইকবাল নান্নু।

এই জোনাকির মেলা পাঠশালার মাধ্যমে খড়কি এলাকার সুবিধাবঞ্চিত ৩৫০ শিশু-কিশোরকে বিনামূল্যে কম্পিউটার, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, বিতর্ক, নাচ ও গান শেখানো হচ্ছে এবং রচনা লেখাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকান্ড পরিচালনা করা হয়। তাদের নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এর ফলে ওই এলাকায় এখন স্কুলগামী শিশু-কিশোরের সংখ্যা আগের চেয়ে বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।

চারিদিকে যখন স্বার্থের টানাটানি স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যখন স্বার্থের গ-ি থেকে বের হতে পারছে না তখন কতিপয় শিক্ষার্থী যশোরে যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তার কোনো তুলনা নেই। কিন্তু হলে কি হবে। এমন একটি কাজের খবর সমাজপতি বা সরকারি বড় কর্তাদের ক’জন রাখেন। তাদের কাছে এ কাজ হয়তো ‘বাড়ির ভাত খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’র মতো ঠেকবে।

‘মুক্তিযুদ্ধ জানার যুদ্ধ’ নামে তাদের একটি ব্যতিক্রমী কর্মসূচি আছে। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলার লক্ষ্যে এই কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। এ কর্মসূচিতে মুক্তিযোদ্ধাদের এনে শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনানো হয়। যোদ্ধাদের মুখ থেকে সরাসরি যুদ্ধের কথা শুনে তারা যেমন রোমাঞ্চিত হচ্ছে তেমনি তাদের অন্তরে গেঁথে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ নামক বাঙালির গর্বের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় প্রজন্ম গড়ে তুলতে এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা দ্বিতীয়টি আর আছে কি? এতে বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা জানতে পারছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী ১০-১২ জন মুক্তিযেদ্ধার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছে।

স্বপ্ন দেখো’র একটি বড় কর্মসূচি হলো বিতর্ক শিক্ষা। মাইকেল মধুসূদন ডিবেট ফেডারেশন নামে এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিতর্ক চর্চা ও বিতার্কিক তৈরিতে কাজ করা হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে এ বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। এ পর্যন্ত ৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থীকে বিতর্ক শেখানো হয়েছে। এসব বিতার্কিকরা খুলনা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। শ্রেষ্ঠ বক্তা হয়েছেন। একজন বিতার্কিক এপেঙ্ ক্লাব আয়োজিত বিতর্ক প্রতিযোগিতায় দেশের শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হন। গত বছর (২০১৬) শ্রেষ্ঠ বিতার্কিক সংগঠনের পুরস্কারটিও তারা পান। বর্তমানে তারা জেলার সব উপজেলায় বিতর্ক নিয়ে কাজ করছে।

কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে স্বপ্ন দেখো ইতোমধ্যে প্রায় আড়াইশ’ তরুণকে কম্পিউটার শিক্ষা দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৯ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগও হয়েছে। বর্তমানে এই কর্মসূচিতে ৬৭ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অ্যাবাকাস কম্পিউটার অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার নামে এই কর্মসূচির মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।

স্বপ্ন বুনি হস্তশিল্প কর্মসূচিতে জোনাকির মেলা পাঠশালার শিক্ষার্থীদের মা ও বড় বোনদের স্বাবলম্বী করতে তাদের স্বল্পমূল্যে দর্জি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচিতে বিভিন্ন কলেজের ছাত্রীরা দর্জি, বস্নক-বাটিক এবং কারুশিল্পের কাজ শিখছেন। এ পর্যন্ত ৪২৩ জন এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যার মধ্যে ১৭ জন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন।

এই সংস্থা এক হাজার ৮০০ বইয়ের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছে স্বপ্ন দেখো গণপাঠাগার। নিয়মিত বই পড়া, কুইজ, রচনা লেখা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজ চলছে এই পাঠাগারের মাধ্যমে। পাঠাগারটি গণগ্রন্থাগার কর্তৃক অনুমোদিত। এখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বই পড়তে আসে। এ ছাড়া পাঠাগারে ই-বুকের সংখ্যা ১২ হাজারেরও বেশি।

স্বপ্ন দেখো সংস্থা ২০১৩ সাল থেকে শিশুদের মাঝে কম্পিউটারের ধারণা দেয়ার কাজ করছে। এ কর্মসূচির আওতায় সংস্থা যশোর সদর উপজেলার ইছালী ইউনিয়নের আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নয় শতাধিক শিক্ষার্থীকে কম্পিউটার শিক্ষার হাতেখড়ি দিয়েছে। ‘আমার স্বপ্নে বাংলাদেশ’ কর্মসূচির মাধ্যমে গুণীজনের স্বপ্নে বাংলাদেশ কেমন তা শিশু শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়। এতে শিশুরা দেশ সম্পর্কে ভালো কিছু ভাবতে শিখছে। সংস্থাটি বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য অবমুক্তকরণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে থাকে।

ব্যতিক্রমী ঘটনা হলো, স্বপ্ন দেখোর সঙ্গে যারা জড়িত তারা নিজেদের গাঁটের টাকায় এই সংস্থাটি পরিচালনা করছেন। এর সঙ্গে ৪৯ জন সদস্য যুক্ত আছেন। এর মধ্যে সাত সদস্যের একটি গভর্নিং বডি আছে। তারা প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে চাঁদাতো জমা দেনই তারপরও প্রাথমিকভাবে তাদের অভিভাবকদের টাকা দানে উদ্বুদ্ধ করে এক লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি তহবিল গড়ে তোলেন। সংস্থাটি গত বছর মে মাসে সমাজসেবা বিভাগের রেজিস্ট্রেশন লাভ করেছে।

জহির ইকবাল নান্নু জানান, সদস্যের বাইরে কারও কাছে তাদের হাত পাতার মানসিকতা নেই। তবে যদি সংস্থার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কেউ কিছু দিতে চান তাহলে তাদের নিরাশ করা হবে না। তারা সবাই একটি কথা বিশ্বাস করেন যে, নেয়ার মানসিকতায় কল্যাণকর কিছু করা যায় না। কল্যাণের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয়।