মৌমাছির ঘটকালিতে সরিষার বাড়বাড়ন্ত

মাঝখানের কয়েক বছর হারিয়ে যাওয়া রবি মৌসুমের নয়ন জুড়ানো ভালুকার প্রত্যন্ত এলাকার ফসলের মাঠে আবার শোভা পাচ্ছে সোনালী ফুলে মৌমাছির গুন গুনাগুন গুঞ্জন। দুপুর রোদে ফুটন্ত হলুদ সরিষা ফুলে চোখ পড়লে মনে হয় যেন নীল আকাশের নীচে সবুজ মাঠে সোনালী চাদরের বিছানা পাতা রয়েছে। চারিদিকে মৌ মৌ গন্ধ প্রকৃতিকে এক অজানা অনুভূতিতে শিহরন জাগায় কৃষান কৃষানীর মাঝে। শোভা বর্ধন করে কৃষকের আঙ্গিনায়। এক সময় গ্রামের প্রতিটি কোনায় কোনায় ফুটে থাকতো সরিষাফুল আর চারিদিক মুখরিত হতো মৌমাছির গুঞ্জনে। গ্রামাঞ্চলের প্রায় মহল্লাতেই কুলু বাড়ীতে ঘানি টেনে সরিষার তৈল তৈরী হতো যার স্বাদ ও গুনের কোন শেষ ছিলনা। যাকে বলা হতো ঘানিটানা ঘন খাটি সরিষার তেল। শুধু সরিষার তেল ঢেলে তরকারি ছাড়াই ভাত খাওয়া চলে যেতো। গৃহস্তরা খাদায় করে সরিষা নিয়ে কুলু বাড়ীতে গিয়ে তৈল ভাঙ্গিয়ে নিয়ে আসতেন। যা গোসলের পর শরীরে মাখানো আর রান্না বন্নার কাজে ব্যবহৃত হতো।
এক সময় যে কোন অদৃশ্য কারনে সরিষা আবাদে কৃষকের মাঝে অনিহা চলে আসে আর হারিয়ে যেতে বসে অনেক গুনের অধিকারী কৃষি উৎপাদনের অন্যতম ফসল সরিষা। প্রবীন ও সচেতন মহলের মধ্যে অনেকেই মনে করেন দেশ স্বাধীনের পর কয়েক বছরের মধ্যে বিভিন্ন জাতের ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী কোম্পানী বাংলাদেশের বাজার দখল করায় আস্তে আস্তে দেশীয় সরিষার তেল ব্যবহারে মানুষের মধ্যে অনিহা জন্মে। আর কুলুদের দেশীয় প্রযুক্তির ঘানি শিল্প বড় বড় যন্ত্রশিল্পের কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। হাড়িয়ে যায় কুলু বাড়ীর গরু টানা কেচ কেচানি শব্দের তৈল তৈরীর ঘানি শিল্প। আর পেশা বদলাতে বাধ্য হন এসব ঘানি টানা কুলু পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যরা। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চাষী পর্যায়ে উন্নত মানের ডাল,তেল ও পেয়াজের বীজ উৎপাদন সংরক্ষন ও বিতরণ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভালুকার ফসলি জমিতে আবার সরিষার ফুল ফুটতে শুরু করেছে। চাষী পর্যায়ে উন্নত মানের বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী হিসাবে কাচিনা ইউনিয়নের কাচিনা বস্নকে কাচিনা গ্রামে কৃষক মোজাম্মেল হকের ৫৬ শতক জমিতে বারি ১৪ জাত সরিষার আবাদ করা হয়েছে। যার ফলন অত্যন্ত ভাল হয়েছে। কৃষক মোজাম্মেল হক জানান জমি চাষ বাবদ ২১ শত টাকা, সেচ ও অন্যান্য ১২৫০ টাকা খরচ করেছেন। উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বারি ১৪ জাতের ২ কেজি সরিষা বীজ, টি এস পি, ইউরিয়া, এম ও পি ও জিংক সহ মোট সার ৭০ কেজি ও ভিটামিন পাউডার পেয়েছেন ১ কেজি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল আজম খান জানান গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে কৃষক পর্যায়ে হারিয়ে যাওয়া ফসল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করনের লক্ষে উন্নত জাতের ভোজ্য তেল বীজ আবাদে কৃষকদের মাঝে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক সরিষায় ২০ জন ও ভূট্ট্রায় ২০ জন চাষীকে প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা হয়। ভালুকা উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের জমি রবি শস্য আবাদের জন্য খুবই উপযোগী। উপজেলা উদ্ভিদ সংরক্ষন কর্মকর্তা এনামুল হক জানান উপজেলায় মোট ৬০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের লক্ষমাত্রা ধরা হলেও অর্জিত হয়েছে ৭০ হেক্টর। অধিক ফলনশীল ও আগাম মাড়াইয়ে উপযোগি বারি ১৪, বীনা ৪/৫ ও টরি ৭ জাতের সরিষার আবাদে কৃষকরা বেশী আকৃষ্ট হয়েছেন। এসব জাতের সরিষা মাড়াইয়ের পর ওইসব জমিতে বোরোর আবাদ সম্ভব হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক চাষী পর্যায়ে উন্নত মানের বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী ২০ টি ও রাজস্ব খাতে বারি ১৪ প্রদর্শনী ২০ টি। উপজেলার কাচিনা বস্নকের উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হক জানান কাচিনা গ্রামে চাষী পর্যায়ে উন্নত মানের বীজ উৎপাদন প্রদর্শনী চাষী মোজাম্মেল হকের ৫৬ শতক জমিতে বারি ১৪ জাতের সরিষার বাম্পার ফলন হয়েছে। তার বস্নকে বেশ কয়েকজন চাষী সরিষার ভাল ফলন পাবেন বলে তিনি আশাবাদী। অপরদিকে উপজেলার হবিরবাড়ী বস্নকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান হবিরবাড়ী এলাকায় সরিষার ভাল আবাদ হয়েছে। আঙ্গারগাড়া বস্নকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুৃল কাসেম জানান তার বস্নকে আড়াই একর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে যা দেখে অন্যান্য চাষীরা সরিষা আবাদে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন।