বাংলাদেশ হতে পারে এশিয়ার খাদ্যের ঝুড়ি

ড. এজাজ মামুন প্রবাসী পলিসি বিজ্ঞানী

স্বাধীনতার পর থেকে এপর্যন্ত বাংলাদেশের সবচে বড় অর্জন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো যুক্তি কেউই জোড়ালোভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না। আমাদের কৃষক আর এর সঙ্গে যুক্ত কৃষিকর্মীরা দীর্ঘ ৪৫ বছর অনাধুনিক কৃষি ব্যবস্থা ও সীমিত কৃষি জমি এবং সম্পদ দিয়ে সাড়ে সাত থেকে ষোল কোটি মানুষের আহারের ব্যবস্থা করে সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ের প্রকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও বাংলাদেশের কৃষির শুধু উন্নতিই হয়নি, পেয়েছে নতুন গতি। দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো কোনো না কোনোভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। আধুনিক বিশ্বে শিল্পের প্রবৃদ্ধির মতো করে কোথাও কৃষির প্রবৃদ্ধি হয় না আর এ তুলনাও করা হয় না। স্বাধীনতার পর থেকে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.৬ গুণ। এখন কৃষির জিডিপি মূল্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার যা ১৯৭৩-৭৪-এ ছিল মাত্র ৫.২১ বিলিয়ন ডলার। শুধু ধান উত্পাদনই ১৯৭২-৭৩ সালের ৯.৯ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে এখন হয়েছে ৩৫ মিলিয়ন টনেরও বেশি। ফল, সবজি, মত্স উত্পাদনে সাফল্য গর্ব করার মতো। অথচ এই বাড়তি উত্পাদনের জন্য কৃষি জমির পরিমাণও বাড়েনি এবং উন্নত দেশগুলোতে যে আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা রয়েছে সেরকমও তেমন প্রসার হয়নি। এর সিংভাগ কৃষিত্বের দাবিদার নিশ্চিত করে আমাদের কৃষক আর তাঁদের বেঁচে থাকার জন্য নিরলস পরিশ্রম। কৃষি বিজ্ঞানী, সরকারি সংস্থা ও এনজিওতে নিয়োজিত কৃষিবিদ ও সম্প্রসারণ কর্মীরা কৃষির উন্নয়নকে নিশ্চিত ও বেগবান করেছেন।

 

মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আমাদের কৃষির অভাবনীয় অর্জন আমাদের স্বপ্ন দেখায় সামনের পথগুলোতে আরো ঈর্ষণীয় সাফল্যের। সারা পৃথিবীর অর্থনীতিতে আজ ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। আগামী ২০৩০ ও ২০৫০-এ বিশ্বের জনসংখ্যা হবে ৮.৩ ও ৯.১ বিলিয়ন। বাংলাদেশে যেমন খাদ্য চাহিদা বাড়বে তেমনি বিশ্বের খাদ্য চাহিদা ৫০ শতাংশ বেড়ে যাবে মাত্র ১৫ বছরের মাথায়, আর ৭০ শতাংশ বাড়বে মধ্য শতাব্দীতে। এশিয়ার দেশগুলো পাশ্চাত্যের অন্য দেশগুলোকে পিছনে ফেলে তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে এবং আরো শক্তিশালী হবে আগামী ১৫ ও ৩০ বছরে। আর ২০৩০ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩৬ শতাংশ অর্থাত্ ৩ বিলিয়ন এশিয়াবাসী মধ্যবিত্তের খাতায় নাম লেখাবে। তাদের খাদ্য অভ্যাস হবে উন্নত ও চাহিদাও হবে ভিন্ন রকম। বাংলাদেশের কৃষির অর্জনের ধারবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে, বাংলাদেশ এশিয়ার অন্য দেশগুলোকে উদ্বৃত্ত খাদ্য বিশেষত এশিয়ার মধ্যবিত্তদের জন্য হাই ভ্যেলু কৃষিপণ্য, যেমন-উঁচু মানের চাল-ডাল, সবজি, ফল ও প্রাণীজ আমিষ রপ্তানি করবে এমন একটা স্বপ্ন দেখা অমূলক হবে না। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে, সঙ্গে সঙ্গে যা কৃষকের ভাগ্য বদলাতে সহায়ক হবে। এভাবে বাংলাদেশেও হতে পারে এশিয়ার খাদ্যের ঝুড়ি বা ফুড বোল। তাছাড়া পাশ্চাত্যের দেশগুলো তো আছেই। বাংলাদেশ ইউরোপে আম রফতানি করছে। যা অন্যান্য ফল রফতানির ক্ষেত্রে একটা সূচক হিসেবে কাজ করছে। আমরা যদি আমাদের সুস্বাদু ফলগুলো চাষ, সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বিশ্বমানের করতে পারি তাহলে নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ ফল রফতানিতে সাফল্য অর্জন করতে পারবে। মিঠাপানির মাছ রফতানিতেও বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে নির্দ্বিধায়। আজ ভিয়েতনাম এমনকি কেনিয়া অনেক দেশেই মাছ রফতানি করছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিক-নির্দেশনা, আর একাগ্রতা। এখন সময় এসেছে উদ্বৃত্ত সফল ও কৃষি পণ্য রফতানির জন্য কৃষি ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করা। এ বিষয়গুলো অনেক আগেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় এনে সঠিক পরিকল্পনা এবং রোড ম্যাপ তৈরির প্রয়োজন ছিল; কিন্তু এই স্বপ্ন নিয়ে এগুবার জন্য অনেক বেশি দেরী হয়ে যায়নি।

 

গত দশ বছরে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে অনেক দূর। যে স্বপ্নকে লালন করে বাংলাদেশ এগোচ্ছে কৃষির আধুনিকীকরণ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে সামনে রেখে অন্য দেশে কৃষি পণ্যের বাজার তৈরিও এই স্বপ্নের অংশ হতে পারে।

 

আমরা জানি, আমাদের কৃষিতে চ্যালেঞ্জগুলো কী? অবস্থানের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি প্রধানতম চ্যালেঞ্জ। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে আমরা অসংখ্যবার মোকাবিলা করেছি কিন্তু এই দুর্যোগের কিছুটা হলেও পূর্বাভাস দেওয়া ও সঠিক কন্টিজেন্সি পরিকল্পনা আমরা এখনো করতে পারিনি। এল-নিনো, লা-নিনা, মৌসুমি জলবায়ু ও অন্যান্য জলবায়ু সূচককে এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে বৃষ্টি, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস কিছুটা হলেও দেওয়া সম্ভব। আমাদের জলবায়ুর ঐতিহাসিক ডাটা সঠিকভাবে বিশ্লেষণও আমাদের চাষাবাদের পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। কৃষিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও কৃষককে সচেতন করতে এসবের সঠিক গবেষণা ও ব্যবহার একান্ত জরুরি। যা আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ফসল উত্পাদনের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমিয়ে আনবে।

 

রোগবালাই আমাদের কষ্টার্জিত ফসল উত্পাদনে মারাত্মক ক্ষতি করছে যা সর্বজন স্বীকৃত। তারপর অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে উত্পাদন ফারাক (yield gap) অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে বোরো, আউশ, আমন ধানের উত্পাদন ফারাক যথাক্রমে ২২, ৪৪ ও ৬০ শতাংশেরও বেশি। গম, তেলবীজ, কন্দ ফসল, ডাল ও সবজির গড় উত্পাদন ফারাক যথাক্রমে ২৭, ৩০, ৫০, ৩২ ও ৩৮ শতাংশেরও বেশি। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে আমরা যাতে রোগবালাই দমন ও এই উত্পাদন ফারাক যতটুকু পারা যায় কমিয়ে আনতে পারি। আর এর মাধ্যমে আমরা আমাদের উত্পাদন অনেকাংশে বাড়াতে পারব।

 

বাংলাদেশের কৃষির ও কৃষকের সত্যিকার উন্নতির জন্য বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার কৃষিকে আরো একধাপ এগিয়ে নেওয়ার যথাযথ পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ ও কর্মসূচি নেবে এ প্রত্যাশা আমাদের সবার। সরকারের সঠিক কর্ম প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে এশিয়ার খাদ্যের ঝুড়ি ও সারা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তায় একজন সক্রিয় অংশীদার হিসেবে পরিণত করবে এ আশাবাদ করি।