পাকুন্দিয়ায় সবজি বিপ্লব

পাকুন্দিয়ায় ক্ষেতখামারে এখন সবুজ সবজির সমারোহ। মাঠের পর মাঠ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পরিণত হয়েছে সবুজ প্রান্তরে। সবজি চাষ এখানকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। নানা জাতের সবজি চাষের মোক্ষম স্থান হিসেবে পরিচিত পাকুন্দিয়া অনেকের কাছে তাই সবজি গ্রাম হিসেবেও পরিচিতি লাভ করছে। কুমড়া, শিম, করলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, চিচিংগা, শশা, আলু, লাউসহ সব ধরনের সবজি চাষের উত্তম ও উৎকৃষ্ট স্থান হলো পাকুন্দিয়ার বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সবজি চাষের মাধ্যমে অভাবকে দূর করে এখানকার চাষিরা নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতেই গড়ে চলেছেন। সবজি চাষ এ এলাকার লোকজনের সামনে খুলে দিয়েছে এক অপার সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। পাকুন্দিয়ার জাঙ্গালিয়া, সুখিয়া, চন্ডিপাশা, চরফরাদি, এগারসিন্দুর, মঙ্গলবাড়িয়া, হোসেন্দিসহ সর্বত্রই রকমারি সবজির চাষ হচেছ। এসব অঞ্চলে দিগন্ত বিস্তারি সবজির বাগান এবং সবুজের সমারোহ সকলের দৃষ্টি কাড়ে। বাগানের পর বাগান। কারো বাগানে বেগুন ফলেছে। আবার কারো বাগানে ধরেছে শিম অথবা টমেটো, ঢেড়শ। এছাড়া আলু, পটল, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক ও পিয়াজের মতো সবজি তো রয়েছেই। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এই উপজেলায় এবার শীতের সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। এছাড়া অনেক চাষিই আগাম আবাদ করা বিভিন্ন সবজি বিক্রি করে ভালো মুনাফা করেছেন। স্থানীয় চাষিরা জানান, বর্তমানে খুচরা বাজারে নতুন সবজির ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আর্থিকভাবে তারা বেশ লাভবান হচ্ছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় এখানকার সবজির বেশ কদর রয়েছে। জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা তাদের সবজি কিনে নিয়ে যান। ঢাকার কারওয়ান বাজারেও এসব সবজি চালান হয়। ট্রাক বোঝাই সবজি পাইকাররা নিয়ে যায়। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তাদের উৎপাদিত সবজি দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও যাচ্ছে। এখানে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন জাতের সবজির চাষ হয়। শীতকাল ছাড়াও এখানকার সবজি চাষিরা সারা বছর ধরেই সবজির চাষাবাদ করে থাকেন। অন্যান্য সময় তারা বাগান করেন প্রধানত কুমড়া, চিচিংগা, করলার।
পাইক লক্ষ্মীয়া গ্রামের চাষি আবদুল মালেক বলেন, শীতের আগেই শাকসবজি জমিতে লাগিয়ে ছিলাম। সেগুলো এখন বাজারে বিক্রি করছি। আগাম শীতকালীন সবজি বিক্রি করে ভালো লাভ হচ্ছে। সুখিয়ার চরপলাশ, বড়আজলদী গ্রামে আগাম ফুলকপির চাষ করেছিলেন বেশ কয়েকজন চাষি। চাষি আবদুর রহিম, আবদুল কদ্দুস, মেনু মিয়া ফুলকপির পাশাপাশি করেছেন বেগুন চাষ। তারা জানান, এবার ফলন ভালো হয়েছে। বেশ লাভবান হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানালেন তারা। চরফরাদির রোকন উদ্দিন, শাহজাহান, মইন উদ্দিন প্রত্যেকেই সারা বছর ধরেই নানা জাতের সবজির চাষ করেন। এতে করে তাদের আয় রোজগারও বেড়েছে। চরফরাদি ও জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নে শীতকালে প্রচুর শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন ও আলু চাষ করা হয়। এই এলাকার পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের পলিবাহিত অববাহিকার প্রায় ৬ কিলোমিটার জুড়ে চাষিরা শুধুই শিমের চাষ করেন। শিম চাষের আগে একই জমিতে তারা করলার চাষ করে থাকেন। করলা চাষের জন্য নির্মিত মাচান পরে শিম চাষের কাজে লাগে। এতে করে তাদের সবজি চাষে ব্যয়ও অনেকাংশে কমে যায়। তারাকান্দি গ্রামের পাইকার আবদুল কাইয়ুম জানান, প্রতি বছর এ সময়টাতে সবজি খেতেগুলো ঘিরে ব্যাপারিদের ভিড় থাকে। সবজি বাবদ কৃষকদের আগাম টাকাও দিয়ে রাখে তারা। কে কার আগে সবজি কিনবে এ নিয়েও চলে প্রতিযোগিতা। ফলে সবজি ফলিয়ে সুখেই আছেন এখানকার চাষিরা। এখানকার চাষিরা জানালেন, ২৫/৩০ বছর আগে এখানে সবজি তেমন একটা হতো না। তখন সাধারণত এই অঞ্চলে ধান, পাট ও ইক্ষুর চাষ করা হতো। এখন হয়েছে এর উল্টোটি। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও কৃষি কর্মীদের পরামর্শ ও সহায়তায় তারা সবজি চাষের প্রতি আকৃষ্ট ও উদ্বুদ্ধ হয়েছেন। এ জন্য তারা কৃষি বিভাগের কাছে ঋণি বলেও বেশ কয়েকজন চাষি জানান। কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতা ও এখানকার চাষিদের নিরলস চেষ্টায় চাষাবাদে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তন তাদের জীবন মানেও বেশ পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ফলে যাদের এক সময় ছনের ঘর ছিল এখন তাদের টিনের ঘর হয়েছে। এই সবজি চাষ করে অনেকেই আধা-পাকা ঘর তুলেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক জীবন ব্যবস্থার প্রতিও তাদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এছাড়া এখানকার রাস্তা-ঘাটের উন্নতি ও যাতায়াত ব্যবস্থার নানাবিধ সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কারণেও এখানকার চাষিরা সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। কারণ রাস্তা-ঘাটের উন্নয়নের ফলে তাদের উৎপাদিত সবজি বিভিন্ন স্থানে সহজেই পরিবহন করা যাচ্ছে। পাইকাররা গ্রামগুলো থেকে নানা জাতের সবজি কিনে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে এসব সবজি বিক্রি করার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় উভয়েই লাভবান হচেছন। তাছাড়া এলাকার চাষিদের ঋণ সহায়তায় বিভিন্ন ব্যাংক এগিয়ে আসায় তারা সময়মতো ও নির্বিঘ্নে চাষাবাদ করতে পারছেন। সহজ শর্তে এই ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি করা হলে উৎপাদন আরো সম্প্রসারিত হবে- অনেকেই এমন দাবিও করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, পাকুন্দিয়া সবজি উৎপাদনের দিক থেকে জেলার সেরা উপজেলা। সেখানে দেড় হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে সবজির চাষ করা হয়। কৃষি বিভাগ সেখানকার সবজি চাষিদের পরামর্শসহ কৃষি উপকরণ দিয়ে নানাভাবে সাহায্য করছে। জাতের পরিবর্তন ও সবুজ সারের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং সেক্সফেরোমন ফাঁদ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিষমুক্ত সবজি চাষের জন্যও কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে বলে জানালেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম।