স্কুলে স্কুলে বই উত্সব : নতুন শিক্ষাবর্ষে নতুন বই পাচ্ছে সোয়া ৪ কোটি শিক্ষার্থী

শীতের সকালে কুয়াশায় মোড়ানো স্কুল ক্যাম্পাস। কিন্তু শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাসের কমতি ছিল না। কুয়াশা ভেঙে সকাল ৯টার আগেই স্কুলে জড়ো হয় শিক্ষার্থীরা। এর কারণ বই উত্সব। গতকাল রবিবার নতুন বছরের প্রথম দিনে সারাদেশে স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন বই বিতরণ করা হয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে উত্সবমুখর পরিবেশে শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন অতিবাহিত হয়। নতুন ক্লাসে ওঠে প্রথম দিনই হাতে বই পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ছিল উচ্ছ্বসিত।

 

প্রাথমিক স্তরের বেশিরভাগ শিশুই প্রথম দিন স্কুলে এসেছে বাবা-মায়ের সাথে। অনেকে বই পাওয়ার পরই বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেয়। ‘নতুন বইয়ের গন্ধ শুঁকতেই কেমন যেন ভালো লাগে’- জানাল রাজধানীর একটি সরকারি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে সায়লা শারমিন। গতকাল প্রথম দিনে ক্লাস না হলেও শিক্ষার্থীরা বই নিয়ে নতুন ক্লাসে যায়। তবে কোথাও ক্লাসে শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল না।

 

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ রাজধানীর আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ মাঠে কেন্দ্রীয়ভাবে পাঠ্যপুস্তক উত্সব-২০১৭ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এবার ৪ কোটি ২৬ লাখ ৩৫ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫টি বই বিতরণ করা হচ্ছে। আর এবারই প্রথমবারের মতো ৫টি ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর ভাষায় ৭৭ হাজার ২৮২টি বই বিতরণ করা হবে। প্রাক-প্রাথমিকের ২৪ হাজার ৬৪১ জন শিক্ষার্থীর মাঝে এ বইগুলো বিতরণ করা হবে। ৫টি জাতি-গোষ্ঠী হচ্ছে মারমা, চাকমা, গারো, সাদ্রি ও ত্রিপুরা। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য এবার ব্রেইল পদ্ধতিতেও বই ছাপা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এধরনের ৯ হাজার ৭০৩টি বই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ১২৩১ জন শিক্ষার্থীর মাঝে বিতরণ করছে।

 

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিই এখন চ্যালেঞ্জ। এ জন্য পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে নিয়ে যাবে। এজন্য তাদেরকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে।  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে কারিগরি ও মাদরাসা বিভাগের সচিব মো. আলমগীর, এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান প্রফেসর নারায়ণ চন্দ্র সাহা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান বক্তব্য রাখেন। পরে মন্ত্রী উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেন। এছাড়া মন্ত্রী আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক হাছিবুর রহমানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষক নির্দেশিকা তুলে দেন।

 

এদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে কেন্দ্রীয় বই উত্সব পালন করে। এ উত্সবে ছিলেন অভিনেতা ফেরদৌস ও অভিনেত্রী মম, আকাশে ছিল ড্রোন, ছিল সিসিমপুরের তিন চরিত্র। সকাল ১০টায় উদ্বোধন করা হয় উত্সবের। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিতি থেকে দু’জন প্রতিবন্ধী শিশুসহ শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে উত্সবের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, নতুন বইয়ের গন্ধটাই চমত্কার। বইয়ে মোটা হরফে নাম লিখবে, পড়াশোনা শেষ করে বই উত্সর্গ করে দেবে- তার আনন্দটা আরও বেশি।

 

বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মেস্তাফিজুর রহমান অনুষ্ঠানে বলেন, প্রতিবছর উত্সবের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ করা হয়। এবার বই উত্সবকে আনন্দপূর্ণ করার চেষ্টা করেছি ।

 

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আসিফ-উজ-জামান, শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রমুখ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। পরে সাংস্কৃতিক পর্বে শিশুদের সঙ্গে সিসিমপুরের তিন চরিত্র- হালুম, টুকটুকি ও ইকরির শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশিত হয় ।

 

এর আগে গত শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে শিশুদের হাতে নতুন বই তুলে দিয়ে বই উত্সবের উদ্বোধন করেন। গতকাল দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুলে বই বিতরণ করা হয়। তবে যে সব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি তাদের বই দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া সব বই, সব স্কুলে পৌঁছেনি- এমন তথ্যও দিয়েছেন অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধান। প্রসঙ্গত, ২০১০ সাল থেকেই বই উত্সব পালিত হচ্ছে স্কুলগুলোতে।

 

চট্টগ্রামে স্কুলে স্কুলে বই উত্সব

 

চট্টগ্রাম অফিস:চট্টগ্রামে বছরের প্রথম দিনে স্কুলগুলোতে বিতরণ হয়েছে নতুন বই। শিক্ষার্থীরা হাতে নতুন বই পেয়ে উত্সবে মেতে উঠে। নতুন পাঠ্যপুস্তক বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

 

মাধ্যমিক পর্যায়ের বই বিতরণ উত্সব গতকাল রবিবার উদ্বোধন করেন বিভাগীয় কমিশনার রুহুল আমিন। এ সময় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আজিজ উদ্দিন ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে আরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া নগরীর মিউনিসিপাল সরকারি মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই উত্সবের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক সামসুল আরেফিন।

 

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরিন সুলতানা জানান, চাহিদা অনুসারে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ প্রায় সব পাঠ্যপুস্তক স্ব-স্ব শিক্ষা থানায় পৌঁছে দিয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসনে জানান, এবার চট্টগ্রাম জেলার ১৫০০ মাধ্যমিক স্কুলের ১৭৫টি বিষয়ে এক কোটি ৩৪ লাখ ৩৫ ৩০০টি পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

 

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন শিক্ষা বিভাগ সিটি করপোরেশন মডেল হাইস্কুলে বই উত্সবের আয়োজন করে। করপোরেশনের ৪৭টি মাধ্যমিক স্কুল, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সাতটি কিন্ডারগার্ডেনে স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তক তুলে দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

 

রাঙ্গামাটিতে নিজ মাতৃভাষায় বই

 

পেলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশুরা

 

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি:অবশেষে নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার বই পেলো পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিশুরা। নতুন বছরের শুরুতে গতকাল রবিবার সকালে নতুন পাঠ্য বইয়ের সাথে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাভাষি সম্প্রদায়ের শিশুদের হাতে মাতৃভাষার বই তুলে দেওয়া হয়। তাদের হাতে বই তুলে দেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা।

 

এদিকে গতকাল সকালে শহরের নিউ রাঙ্গামাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বই বিতরণকালে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান, সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ত্রিরতন চাকমা, রাঙ্গামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াত্ হোসেন রুবেল, প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে, নিউ রাঙ্গামাটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি মনিরুজ্জামান মহসিন রানা উপস্থিত ছিলেন।

 

অপরদিকে শহীদ আবদুল আলী একাডেমিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ, প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। পরে বনরুপা মডেল সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেন স্থানীয় চেয়ারম্যান। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিজুল রহমান, স্কুলের প্রধান শিক্ষক অর্চনা চাকমা উপস্থিত ছিলেন। পরে রাণী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যান শিক্ষার্থীদের মাঝে বই বিতরণ করেন।

 

উল্লেখ্য, এবারে রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলার প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর মোট এক লাখ তিন হাজার আটশ ৮৯জন শিক্ষার্থীর মাঝে চার লাখ ৯৮হাজার সাতশ ৮৯টি বই ও প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা ভাষাভাষি তিন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের নিজ ভাষায় ১২ হাজার আটশ ৩১টি অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হয়।