সবুজ অর্থনীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা। পৃথিবীব্যাপী অর্থনীতির ধরন ও প্রকৃতি পরিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ছুটতে গিয়ে দেশগুলো পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানবসমাজ। যে কারণে আজ গতানুগতিক অর্থব্যবস্থার পরিবর্তন সময়ের দাবি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সবুজ অর্থনীতি এই দাবির কারণে উদ্ভাবিত রূপ। পরিবেশের ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কার্যক্রমই সবুজ অর্থনীতি। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় রাখা হয়। মেলবন্ধন ঘটে অর্থনীতি ও পরিবেশের। সবুজ অর্থনীতি হলো সেই অর্থনীতি, যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে; কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁঁকি কমাবে ও অভাব দূর করবে। এই অর্থনীতিতে সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার, সামাজিক কল্যাণ ও কার্বন নিঃসরণ হ্রাসকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সহজভাবে বলতে গেলে, সবুজ অর্থনীতি হলো সেই অর্থনীতি, যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, পরিবেশগত ঝুঁকি কমাবে ও পরিবেশগত অভাব দূর করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রায়ই বন্যা, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা সৃষ্টি হচ্ছে। অধিকন্তু ঋতু পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে ভিন্নতা দেখা দিচ্ছে। নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের জমি, বসতভিটা। কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের অবস্থান যেন আরও খারাপ। কৃষি, কেমিক্যাল ও ট্যানারিশিল্পে কোনো রকম সতর্কতা অবলম্বন না করেই শ্রমিকরা বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে কাজ করছেন। কল-কারখানার এসব বিষাক্ত বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে মাছের স্বাভাবিক উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজমিতেও সেই পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অসংখ্য পুরনো ও চলাচল অযোগ্য যানবাহন চলাচল করার কারণে ব্যাপক দূষণ ঘটছে। জ্বালানি তেল ব্যবহারের ফলে যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের মাত্রা বৃদ্ধি করে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগবালাই সৃষ্টি করে চলেছে। এ ছাড়া নির্বিচারে বনজঙ্গল উজাড় করে ঘরবাড়ি নির্মাণ, জ্বালানির জন্য গাছ কাটা, নদী ভরাট করাসহ প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত অত্যাচারের ফলে আজ প্রকৃতি বিরূপতার শিকার।

সরকার সবুজ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যা খুবই ইতিবাচক। ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষ আইন’ অনুমোদন করেছে। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনের ওপর থেকে পাঁচ বছরের জন্য মওকুফকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের কর্মসূচি দ্রুত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পৌর বর্জ্য থেকে কমপোস্ট জৈব সার তৈরির সিডিএম প্রকল্প চালু করা হয়েছে। ইটভাটা থেকে বায়ুদূষণ হ্রাসের লক্ষ্যে পুরনো ইটভাটাগুলোকে পরিবেশবান্ধব আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটার অর্থ এমন ইটভাটা, যা জ্বালানিসাশ্রয়ী, উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন, যেমনÑ হাইব্রিড হফম্যান কিলন, জিগজ্যাগ কিলন, ভারটিক্যাল, টানেল কিলন বা অনুরূপ কোনো ভাটা। ব্যাংকগুলো পুরনো ইটভাটা তৈরির জন্য এখন ঋণ বন্ধ করে দিয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি আইন অনুমোদন করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের দ্রুত সম্প্রসারণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সব জেলায় পরিবেশ আদালত স্থাপন করা হয়েছে। জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের আগ্রহী করতে সরকার এরই মধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির প্রকল্প চালু করে দেশ এরই মধ্যে কার্বন ক্রেডিট লাভ করেছে। ‘পলুটারস পে প্রিন্সিপাল’-এর আওতায় পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্তানুসারে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এনফোর্সমেন্ট ও মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমের মাধ্যমে হাইওয়ের পাশে তিন স্তরের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সামাজিক বনায়নের আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৪৪ হাজার ৪০৮ হেক্টর উডলট বাগান, ১০ হাজার ৬২৬ হেক্টর কৃষি বন বাগান, ৬১ হাজার ৭৩৯ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান সৃজন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিগত চার বছরে জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড আওতাভুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি, স্বল্পমেয়াদি ও নন-ম্যানগ্রোভ ২ হাজার ৯৫৫ হেক্টর ব্লক বনায়ন এবং সড়ক রেলপথ ও বাঁধ সংযোগ সড়কে ২ হাজার ৬৪১ কিলোমিটার স্ট্রিপ বনায়ন করা হয়েছে। সৃজিত বাগানে প্রায় পাঁচ লাখ উপকারভোগী সম্পৃক্ত আছে। সারা দেশে ব্যাপক বনায়নের লক্ষ্যে ৪ কোটি ৮৮ লাখ ৬৩ হাজার চারা বিক্রি ও বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ বনায়নের আওতায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ৩১ হাজার ১৫০ ঘনফুট কাঠ, ১ কোটি ৭৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫২১ ঘনফুট জ্বালানি কাঠ ও ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার ১৮৬টি বল্লি উৎপাদিত হয়েছে। উৎপাদিত কাঠ, জ্বালানি কাঠ ও বল্লি বিক্রি করে ৪৫৯ কোটি ৯৯ লাখ ৪৮ হাজার ২৩২ টাকা পাওয়া গেছে। ১ লাখ ৫ হাজার ৬৩৩ জন উপকারভোগীর প্রাপ্ত লভ্যাংশের পরিমাণ ২০৮ কোটি ৩ লাখ ২৮ হাজার ৩৩ টাকা। টিএফএফ হিসাবে প্রায় ৪৫ কোটি ১৯ লাখ ৪ হাজার ৬৫৬ টাকা জমা হয়েছে। সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে এ পর্যন্ত সরকারি রাজস্ব হয়েছে ২০৫ কোটি ৩৭ লাখ ৮৪ হাজার ৮৭০ টাকা।

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের যৌথ আয়োজনে অ্যাডিলেড কনভেনশন সেন্টারে ‘থ্রিআর’ ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। এই ফোরামে উৎপাদনমুখী কর্মকা-ে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ও পরিমিত ব্যবহারের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম মৌলিক ধারণা থ্রিআর, অর্থাৎ কল-কারখানায় বর্জ্য ও কঁাঁচামালের অপচয় হ্রাস, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রক্রিয়াকরণের কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। থ্রিআর বাস্তবায়নে উপযোগী অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের ওপর গুরুত্বারোপ করছে আমাদের সরকার। প্রয়োজন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন। মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও পরিবেশ সংরক্ষণ উভয়ই একটি দেশের জন্য অপরিহার্য। উন্নয়নের সঙ্গে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলতে হলে সবুজ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া উপায় নেই। যেহেতু আমরা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম দেশগুলোর একটি, তাই সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে যেসব সমস্যা রয়েছে তার দ্রুত সমাধান জরুরি। কারণ সবুজ অর্থনীতি ব্যতীত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।