নতুন বইয়ের গন্ধে শিক্ষার্থীদের বছর শুরু

‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম, সে কখনও করে না বঞ্চনা।’ একজন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে ছাত্রছাত্রীদের ২২ বছর যাবত্ শিখিয়েছি ‘সদা সত্য কথা বলিবে’। আর তাদের শিক্ষক হিসেবে বর্তমান সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্যের দুটো কথা, কিছু সত্য, লিখতে না পারলে নিজের বিবেকের কাছে ঋণী থাকব। তাই তো বিবেকের কারফিউ ভেঙে কিছু সত্য লেখার জন্য চিরসঙ্গী কলম ও দুটো কাগজের পাতা নিয়ে কয়েকটি পত্রিকার রিপোর্টের ভিত্তিতে লিখতে বসলাম।
আসলে রিপোর্ট হল তথ্যের নির্মোহ গাঁথুনি। যাতে থাকে না অনাহুত মন্তব্য, অপ্রয়োজনীয় বিশ্লেষণ, অযাচিত পক্ষপাতিত্ব; এতে শুধু থাকে তথ্যের সোজাসাপটা বর্ণনা। সে কারণে এটি হয়তো সুখপাঠ্য ঠিক নয়, তবে দেশ ও জাতির জন্য দরকারি। আজ ১ জানুয়ারি ২০১৭ সাল। সারা বিশ্বের মতো এদেশেও পালিত হচ্ছে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে হ্যাপি নিউ ইয়ার-২০১৭। এ বছর প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, এসএসসি ভোকেশনাল, ইবতেদায়ি, দাখিল ও দাখিল ভোকেশনালে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার ২৪৫টি পাঠ্যবই গত বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সকল জেলা, উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছানো হয়েছে। এবারই প্রথম প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ব্রেইল বই দিচ্ছে সরকার। এছাড়া ৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুদের নিজেদের মাতৃভাষায় বই দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে পাঠ্যপুস্তক উত্সব দিবস। এই উত্সবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীসহ নগর, বন্দর, গ্রাম, নিভৃত পল্লী, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চর, হাওর-বাঁওড়ের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এজন্য অবশ্যই অভিনন্দন জানাই বর্তমান সরকারকে। আকাশে ওই প্রকাণ্ড সূর্য যেভাবে ধনী, গরিব, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে সমানভাবে আলো ও তাপ বিলিয়ে দেয়; ঠিক যেভাবে বর্তমান সরকার বছরের প্রথম দিবসেই নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করে সবাইকে একাকার করে, একই নেটওয়ার্ক বা একটি বিনি সুতোর মালা দিয়ে সুন্দরভাবে গেঁথে সাজিয়ে দিয়েছে।
আমি গ্রামে শিক্ষকতা করি কিন্তু শহরে বাস করি। গ্রামের বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী মার্চ বা এপ্রিলের আগে তাদের পাঠ্যবই কিনতে পারত না। তারা আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বড় ভাই-বোনদের কাছে থেকে ছেঁড়া বা পুরাতন বই অর্ধমূল্য বা স্বল্প মূল্যে কিনে লেখাপড়া করত। সত্যি কথা হল ছাত্রছাত্রীদের নতুন বই না হলে উত্সাহ তৈরি হয় না। পাঠ্যবইয়ের অভাবে তাই ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষকরা শ্রেণিতে বছরের শুরুতে পরিপূর্ণ পাঠদান করতে পারতেন না। কিছু সংখ্যক অভিভাবক উপবৃত্তির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ চালাতেন এবং বই কিনে দিতে পারতেন না। পূর্বেও উপবৃত্তি চালু ছিল শুধু ছাত্রদের মধ্যে কিন্তু এখন উপবৃত্তি চালু আছে দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র ও ছাত্রীদের মাঝে, যাতে তারা লেখাপড়ায় উত্সাহ পায়।
সপ্তম বছরের মতো নতুন পাঠ্যবই পাওয়ায় বছরের প্রথম দিনটিতে শুরু হল পরিপূর্ণ কর্মদিবস। আজ বিদ্যালয়গুলো কানায় কানায় পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ছয় বছর যাবত্ (২ জানুয়ারি) কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে দেখেছি ছোট্ট সোনামণিরা গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠোপথে দৌড়ে (কি অনিন্দ্যসুন্দর দৃশ্য!) তাদের প্রাণপ্রিয় বিদ্যালয়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে, এ আশায় নতুন বই হাতে পাবে এবং সহপাঠীদের বলবে তোর আগে আমি স্যার বা ম্যাডাম বা অতিথির কাছ থেকে বই নিয়েছি, তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছি। তারা আমার ছবি তুলেছে, আরও কত কী? অবাক করা বিষয় হল, এত বিপুল সংখ্যক বই পৃথিবীতে কোথাও বিতরণ করা হয় না এবং শিক্ষায় ছেলেমেয়ে সমতা অর্জন বিশ্বের রোল মডেল।
মনোবিজ্ঞানী এরিকবার্ন বলেছেন মানুষের জন্ম হয় তিনবার। প্রথমত Cellular Birh (মাতৃগর্ভে), দ্বিতীয়ত Physical Brith (শারীরিকভাবে) এবং তৃতীয়ত Social Birth (সামাজিকভাবে)। সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হল Social Birth, যা শিশুর বয়স ৫+ হলে শুধু বিদ্যালয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। উন্নত বিশ্বে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বছরে ১২০০ ঘণ্টা এবং আমাদের দেশে মাত্র ৭০০ ঘণ্টা অবস্থান করে। এজন্য বর্তমান সরকার শিক্ষার্থীদের মেধা পরিপূর্ণ বিকাশের বা মুখস্থ নির্ভরতা সম্পূর্ণ কমিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি চালু করেছে। যাতে বিদ্যালয়ের পাঠ্যঘণ্টা বৃদ্ধি পায়। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী এদেশে ইতোমধ্যে চালু হয়েছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম। এর ফলে বিদ্যালয়ের প্রতি শিশুদের আগ্রহ সৃষ্টি, সুকুমার বৃত্তির অনুশীলন, অন্যদের প্রতি সহনশীলতা এবং আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে ধারণা জন্মাছে। ৩১টি মাদ্রাসাতে অনার্স কোর্স এবং স্বতন্ত্র ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় চালুর পাশাপাশি সরকার কারিগরি, ভোকেশনালসহ সর্বত্র মানসম্মত শিক্ষার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
এছাড়া পাঠ্যপুস্তকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ, ২৩৩৩১টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় স্নাতক পর্যায়ে বৃত্তি, শ্রেণিতে মানসম্পন্ন পাঠদানের সিডি প্রদান, সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ প্রতিযোগিতা, মাদ্রাসার মূলধারার সঙ্গে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা অন্তর্ভুক্তি বা আধুনিকায়ন, ১০ লাখ শিক্ষকের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ২৬,১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ২০১৩ সালে জাতীয়করণ করা হয়। সেকায়েপ প্রকল্পের মাধ্যমে তুলনামূলক পশ্চাত্পদ স্কুল বাছাই করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞানের ১১ লাখ অতিরিক্ত ক্লাস নেওয়া হয়েছে। আইসিটি এডুকেশন চালুর পাশাপাশি মেয়েদের জন্য ৭টি বিভাগে ৭টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করা হয়েছে, যা যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে ৬০ দিনে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণ। এই পরীক্ষায় বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণের ফলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে পরীক্ষাভীতি দূর হচ্ছে এবং প্রতিযোগিতা সম্পর্কে ধারণা জন্মাচ্ছে। অন্যদিকে মেধাবীরা বৃত্তি পাচ্ছে। পূর্বে প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে কিছু সংখ্যক মেধাবী ছাত্রছাত্রী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করত। কিন্তু বছরের শুরুতেই সরকার পাঠ্যবই প্রদান করায় এবং পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শহরের মতো গ্রামেও জিপিএ-৫ বা (অদম্য মেধাবী) বৃত্তি পাচ্ছে। শুধু এখানেই শেষ নয়, ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার কারণে অজ পাড়াগাঁ থেকে প্রতিভাবান ক্ষুদে কৃতী শিক্ষার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সারাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব একসঙ্গে জানতে পারছে। ইতিহাসে পড়েছি নবাব শায়েস্তা খাঁর আমলে টাকায় ৮ মণ চাল বা সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যেত কিন্তু বিনামূল্যে এ দেশে মাধ্যমিকে (সমমানসহ) পাঠ্যবই পাওয়া যেত কি না জানি না। কবি জন কিটসের Ode on a Grecian Urn কবিতার কালজয়ী উক্তি লিখে শেষ করছি-Beauty is Truth, Truth Beauty. – See more at: http://www.shokalerkhobor24.com/details.php?id=55186#sthash.WIuR9rEo.dpuf