সম্ভাবনার বাংলাদেশ : অর্থনীতি > অগ্রযাত্রার সব সূচকে ঈর্ষণীয় সাফল্য

উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ। এক সময়কার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এই দেশটি এখন বিশ্ব অর্থনীতির বিস্ময়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির শুরুটা হয়েছিল শূন্য থেকে। কিন্তু বাঙালি বীরের জাতি- এর প্রমাণ রেখেছে প্রতি পলে পলে। বাঙালির উদ্যম আর কঠোর পরিশ্রমে বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি অর্জনের পথে। সুষম উন্নয়ন পরিকল্পনায় দেশে একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলেছে। অর্থনীতি ও শিল্পায়নে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো এসব শিল্পাঞ্চলে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে। সর্বশেষ চীন বাংলাদেশে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে অনেক আগেই ছাড়িয়ে যাওয়া বাংলাদেশ অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক বেশির ভাগ সূচকেই ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। চলতি বছরের রেমিট্যান্স আহরণের সূচক কিছুটা নিম্নগতির হলেও রিজার্ভে অনন্য উচ্চতায় এখন বাংলাদেশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কমেছে অতিদরিদ্রতার হার। রপ্তানিতেও উচ্চতার শিখর স্পর্শ করতে চলেছে বাংলাদেশ। মানবসম্পদ রপ্তানিও বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি কমছে। অর্থনীতির সূচকগুলো এখন অনেক দেশের তুলনায় ওপরে অবস্থান করছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রশংসা করেছে। আইএমএফের মতে, প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বিশ্বব্যাংক মনে করে, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে একই সঙ্গে উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রীতিমতো বিস্ময়। সরকারও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের তালিকায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি বলেছেন, ২০২৪ সালের আগেই আমরা স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে আসার যোগ্যতা অর্জন করতে পারব।
মানবসম্পদ, মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা- এই প্রধান তিনটিসহ অর্থনীতির সব সূচকে আমরা এগিয়ে আছি। বর্তমানে শুধু সনদ পাওয়ার অপেক্ষা। সম্প্রতি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এলডিসি প্রতিবেদন-২০১৬-তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০১৮ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জন করবে। আর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১৬টি দেশের উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসবের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও আছে আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, ভুটান, জিবুতি, গিনি, কিরিবাতি, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, সাও তুমে, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, পূর্ব তিমুর, টুভালু, ভানুয়াতু ও ইয়েমেন। এর মধ্যে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, জিবুতি, লাওস, মিয়ানমার ও ইয়েমেন ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে ২০১৪ সালে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা পাওয়া ৮টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। ওই বছর আফগানিস্তান সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন (৩৯০ কোটি) ডলার উন্নয়ন সহায়তা পেয়েছে।
মূলত, বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির কারণেই দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে। এদিকে বিশ্বের দ্রুতগতিতে অগ্রসরমান দেশগুলোয় হাঙ্গেরি রপ্তানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভিক্টর অরবান। তাই বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও পূর্বের ব্যাপক সম্ভাবনার দেশগুলোতে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। বাংলাদেশ-হাঙ্গেরি বিজনেস ফোরামের সমাপনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন ভিক্টর অরবান।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪৫ শতাংশ বেড়েছে। ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ৬৭ শতাংশ, জার্মানির সঙ্গে ৫৭ শতাংশ ও ফ্রান্সের সঙ্গে ৬৯ শতাংশ বাণিজ্য বেড়েছে। তিনি বলেন, এই তথ্য থেকে ভালোভাবে বোঝা যায়, বাংলাদেশে যথাযথ পেশাগত ও প্রযুক্তিগত সুবিধা বিদ্যমান, যার মাধ্যমে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে যাচ্ছে।
গত অর্থবছরে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ ক্ষেত্রে সরকার ধারাবাহিকভাবে সাফল্যও লাভ করছে। তার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ চুক্তির ফলে। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাদের কথায় চীনের এ বিশাল বিনিয়োগ চুক্তির ফলে বিশ্বনেতারা বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে ভাববেন। এ ছাড়া সেই একই সময়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি।
এদিকে গত ৮ বছরের এক হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় আকাশচুম্বী সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আট বছর আগে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল চার হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে তা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ৫৫৯ ডলার থেকে আট বছরে ১ হাজার ৪৬৫ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দেশের কারিগরি শিক্ষার হার শতকরা এক ভাগ থেকে বেড়ে ১০ ভাগে উন্নীত হয়েছে। দেশের রপ্তানি আয় আট বছর আগে ছিল ১১ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অগ্রগতির এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ এবং আমাদের অর্থনীতি হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতিতে ২০তম আসনে অধিষ্ঠিত হবে। বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ৭ দশমিক ১১ ভাগ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
এক গবেষণার ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপারস (পিডব্লিউপি) বলেছে, ২০৫০ সালে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। সংস্থাটির মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি চীনের প্রবৃদ্ধি ২০২০ সালের পর কমবে। এর ফলে বহুজাতিক পশ্চিমা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোকে তাদের পণ্য উৎপাদনের জন্য বেছে নেবে। এতে রপ্তানিনির্ভর অনেক শিল্প এ দেশগুলোতে চলে আসবে এবং উচ্চ বেতনের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে রিজার্ভ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যনুযায়ী, রিজার্ভের পরিমাণ ১৫ ডিসেম্বর বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বর শেষে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দাঁড়াবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ। গত ১ সেপ্টেম্বর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়ায়। গত ৪ নভেম্বর দিন শেষে রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। তবে এর পরের সপ্তাহেই এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ৭৯ কোটি ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ফের ৩২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসে। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন ১০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে এলে ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বলে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো আকুর আমদানি বিল বকেয়া রাখতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশ। ১৬ বছরের মাথায় সেই রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। এই হিসাবে গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের রিজার্ভ বেড়েছে ৩২ গুণ।
শ্রমশক্তি রপ্তানি : স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কৃৃষিজ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ রপ্তানির পথ খুঁজে নেয় বাঙালি জাতি। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় মানবসম্পদ রপ্তানি। সে বছরে বিশ্বের সাতটি দেশে চাকরির জন্য যান ৪ হাজার ৬৯১ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে ২১৭, আরব আমিরাতে ১ হাজার ৯৮৯, কুয়েতে ৬৪৩, ওমানে ১১৩, কাতারে ১ হাজার ২২১, বাহরাইনে ৩৩৫ ও লিবিয়ায় ১৭৩ জন শ্রমিক পাঠানো হয়। সে বছর প্রবাসী ওই বাংলাদেশিরা বিদেশের মাটিতে ঘাম ঝরিয়ে ৩৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে ভূমিকা রাখেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলারে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, জানুয়ারি-২০১৬ থেকে ডিসেম্বর-২০১৬ (৬ তারিখ পর্যন্ত) ৭ লাখেরও বেশি শ্রমিককে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ কোটি বাংলাদেশি কর্মরত, যাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে গড়ে উঠছে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। এর ৮০ ভাগেরও বেশি শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। বাকি অর্থ এসেছে অন্যান্য পণ্য রপ্তানি খাত থেকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণমান এখন অনেক উন্নত ও শক্তিশালী। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ গড়তে শক্তিশালী এ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও অনন্য ভূমিকা রাখছে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি : অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি একদিকে যেমন সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্বস্তি দিয়েছে, অন্যদিকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হয়েছে। বিদায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের (২০১৪-১৫) চেয়ে ১৪ দশমিক ০৬ শতাংশ বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে মোট ৬৯ হাজার ৫৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫৪ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। এই সময়ে গত অর্থবছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
পণ্য রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি : দেশের পণ্য রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক আছে। তার মানে রপ্তানি আয় বাড়ছে। সে জন্য প্রবাসী আয়ে মন্দাভাব থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রা আয় নিয়ে হাঁস-ফাঁস তৈরি হয়নি। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) পণ্য রপ্তানিতে ১ হাজার ৩৬৯ কোটি মার্কিন ডলার আয় হয়। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের ১ হাজার ২৮৮ কোটি ডলারের রপ্তানির চেয়ে ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। গত জুলাই বাদ দিলে বাকি চার মাসে পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। জাতিসংঘ সংস্থা এসকাপের এশিয়া প্যাসিফিক ট্রেড এন্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর রপ্তানি আয়ে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। তবে বাংলাদেশের বেলায় এ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশ। পোশাক রপ্তানি বাড়ার কারণেই এমনটা সম্ভব হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পোশাকের ওপর ভর করেই চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের পণ্য রপ্তানি আয় সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। আলোচ্য সময়ে মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশ বা ১ হাজার ১১৩ কোটি ডলার এসেছে পোশাক রপ্তানি থেকে। চলতি অর্থবছর পোশাক খাতে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৩৮ কোটি ডলার। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ৫ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে বিজিএমইএ। সেটি অর্জন করতে হলে বছরে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে। গত নভেম্বর মাসে পণ্য রপ্তানিতে ২৮৯ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের আয় হয়। এটি গত নভেম্বরের চেয়ে ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যে গত মাসেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি হয়। আগস্টে হয়েছিল সর্বোচ্চ ৩৩০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : বছরজুড়েই মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মতে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সাধারণ মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। আগস্টে কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ; সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সর্বশেষ হিসাবে নভেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যমতে, গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট হারে কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। গ্রামের খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। পাশাপাশি শহরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট হারে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যেও মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ এ সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা গেছে।
দরিদ্রতার হার দ্রুত কমছে : লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও দ্রুত কমছে দরিদ্রতার হার। জাতিসংঘের এমডিজি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার কমে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ২০১০ সালেই চরম দারিদ্র্যে লক্ষ্য পূরণ করেছে। ২০১৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ৮ শতাংশের বিপরীতে এই হার সাড়ে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
প্রত্যাশার অধিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার : বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো চূড়ান্ত হিসাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাত দশমিক ১১ শতাংশ, যা অতীতের সব অর্জনকে ¤øান করে দিয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলনের সীমাকেও অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছিল, এবারের প্রবৃদ্ধির হার বড় জোর ছয় দশমিক সাত শতাংশ অর্জিত হবে। কিন্তু এর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রমাণ করে বাংলাদেশ সত্যিই এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে, যা বিশ্বের অনেক দেশের কাছে চমক সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। জিডিপি বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০১৫-২০১৬ সালে ১৭ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকায়। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা। এই হিসাবে দেখা যায়, ২০১৪-২০১৫ সালে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ছয় দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে ছিল ছয় দশমিক ছয় শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি এবং প্রবৃদ্ধির হারের ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত আছে।
মাথাপিছু আয় ১৪৬৫ ডলার : সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৪৬৬ ডলার। বর্তমানে মাথাপিছু গড় আয় হয়েছে ১ হাজার ১৯০ ডলার। বর্তমানে প্রতিবছর দেশের একজন নাগরিকের আয়ের পরিমাণ (১ ডলার সমান ৮২ টাকা ধরে) ১ লাখ ২০ হাজার ১৩০ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ৩১৪ ডলার। এক অর্থবছরের ব্যবধানে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৫১ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় বছরের ব্যবধানে প্রায় ১২ হাজার টাকা বেড়েছে। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল ১ হাজার ১৯০ ডলার। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, মানবসম্পদ সূচকে কমপেক্ষ ৬৬ স্কোর অর্জন করতে হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ৬৩ দশমিক ৮। মাথাপিছু আয় বাড়ানো ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সঠিক পথে আছে। জাতিসংঘের নিজস্ব হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু গড় আয় ১ হাজার ১৯০ ডলার। এলডিসি থেকে বের হতে এ আয়সীমা ১ হাজার ২৪২ ডলার ছাড়িয়ে যেতে হবে। আর অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থা মোকাবেলার সূচকে স্কোর ৩২-এর বেশি হওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ২৫, যা ইতিবাচক। মন্ত্রী বলেন, এসব সূচকে বর্তমানে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে পেছানোর সুযোগ নেই। বরং আরও ভাল করতে হবে। এটি করতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যেই আমরা এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারব।
কৃষি ও শিল্পে অর্জন : বিগত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৩ হাজার ২৮৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫টি খাতের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কম অর্জিত হয়েছে। তবে কৃষি খাতে জিডিপি অর্জন ভালো হয়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি জিডিপি অর্জিত হয়েছে শিল্প খাতে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। অন্যদিকে হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট খাতে ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ অর্জন হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা খাতে ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ, প্রশাসন খাতে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ জিডিপি অর্জন সম্ভব হয়েছে। বর্তমান অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স ও পোশাক শিল্পের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে বিপুল সাফল্য এবং উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিপুল অভ্যন্তরীণ বহুমুখী বাজার চাহিদা ইত্যাদি অনুক‚ল উপাদানগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির পুরনো দরিদ্র অভিধাকে বদলে দিয়েছে। এসব কিছু দেখে বিশ্ব অর্থনীতির চালকরা বাংলাদেশকে বর্তমানে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির একটি উদাহরণ হিসেবে গণ্য করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সস্তা শ্রমশক্তি অবাধ বিনিয়োগের সুযোগ আর সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এসব মিলে বিশ্বায়নের যুগে বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে চলছে তাতে মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
এগিয়ে চলছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজ : পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিভিন্ন অংশের কাজ বাস্তবায়নে সন্তোষজনক অগ্রগতি হচ্ছে। ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। মূল সেতুর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৯ শতাংশ। নদী শাসন কাজের ভৌত অগ্রগতি ২৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। মাওয়া সংযোগ সড়ক নির্মাণে ভৌত অগ্রগতি ৯৯ শতাংশ এবং জাজিরা সংযোগ সড়কের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৭৭ শতাংশ। এ ছাড়া সার্ভিস এরিয়া-২-এর ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৯৯ শতাংশ। সব মিলিয়ে প্রকল্পের সার্বিক ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৩৬ শতাংশ।
প্রকল্প অনুমোদন : চলতি অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ১০১টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এসব প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ২৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। প্রকল্পের ব্যয় বিবেচনায় এটি যে কোন সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। এবছর একনেকের আরও একটি সভা হওয়ার কথা রয়েছে।